Search

Monday, October 17, 2022

ভোট ডাকাতদের ঠেকাতে পারলো না ইসি দায় কার?

— আমিরুল ইসলাম কাগজী

ভোট ডাকাতদের ঠেকাতো পারলো না নখ-দন্তহীন অসহায় নির্বাচন কমিশন।

আওয়ামী পেটোয়া বাহীনিকে নিয়ন্ত্রনে ব্যর্থ হয়ে  কমিশন জাতীয় সংসদের গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণ স্থগিত করে দিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার-সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বুধবার, অক্টোবর ১২, ২০২২,  দুপুর দুইটার দিকে উপনির্বাচন বাতিলের এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। সে সময় তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে অনেকটা। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আপনারাও দেখতে পাচ্ছেন। গোপন কক্ষে অন্যরা ঢুকছে, ভোট সুশৃঙ্খলভাবে হচ্ছে না। তবে কেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, তা আমরা এখনো বলতে পারব না।

সিইসি আরও বলেছেন, নির্বাচনে তিনি ব্যাপক অনিয়ম দেখেছেন। যেখানে অনিয়ম বেশি, সেখানে ভোট গ্রহণ স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে তিনটি, এরপর ৪৪টি-এভাবে ক্রমাগতভাবে ৫৫টি, ১০০টি এরপর সব কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে।

ইভিএম নিয়ে অভিযোগ এসেছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে সিইসি বলেন, ‘ইভিএমের  কোনো দোষত্রুটি দেখতে পাচ্ছি না। মানবিক আচরণের ত্রুটির কারণে এমনটা হচ্ছে।’ একই ধরনের প্রতীক দেওয়া গেঞ্জি পরে অনেককে ভোট দিতে দেখেছেন বলে জানান সিইসি। আচরণবিধি লঙ্ঘন করে এসব কাজ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তাঁরাই ভোটকেন্দ্রের ডাকাত কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে সিইসি বলেন, ‘এরাই ডাকাত। এরাই দুর্বৃত্ত। যাঁরা আইন মানেন না, তাঁদেরই আমরা ডাকাত বলতে পারি, দুর্বৃত্ত বলতে পারি।’

গাইবান্ধা-৫, সাঘাটা-ফুলছড়ি,  আসনের উপনির্বাচনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৮ জন। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী মাহমুদ হাসান, জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনীত এ এইচ এম গোলাম শহীদসহ উপনির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।  ইভিএমের মাধ্যমে ১৪৫টি কেন্দ্রে ৯৫২টি বুথে ভোট গ্রহণ করা হয়।

একটিমাত্র আসনে উপনির্বাচন করতে গিয়ে আওয়ামী ডাকাত বাহিনীর নিকট নির্বাচন কমিশনকে কেমন   হেনস্থা হতে হলো সেটাতো দেশবাসী দেখলো। সিইসি ঢাকায় বসে দেখলেন একই রঙের গেঞ্জি পরে ওই ডাকাত বাহিনী বুথে ঢুকে ইভিএম মেশিনের নিয়ন্ত্রন নিয়ে ভোট দিচ্ছে। অথচ কেন্দ্রে বসে পোলিং অফিসার কিংবা প্রিজাইডিং অফিসার কেউ সেটা দেখতে পেলো না। এমনকি রিটার্নিং অফিসার/জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপার কিংবা ওসি কারও নজরে এলো না। একটি মাত্র আসনে উপনির্বাচন হওয়ার কারণে সিইসি স্বয়ং নিজেই ঢাকায় বসে মনিটরিং করে অনিয়মটা ধরতে সক্ষম হলেন। কিন্তু যখন জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ আসনে ভোট গ্রহণ হবে তখন ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াবে? সে সময় এই গুরু দায়িত্ব থাকবে কাদের ওপর?  নিশ্চিত ভাবে বলতে হবে ডিসি ও এসপিদের ওপর।

তাদের ব্যাপারে সিইসির মন্তব্য হচ্ছে, "আপনারা দলীয় কর্মী হয়ে যাবেন না।"এ কথা তিনি কেন বলেছেন? তাহলে শুনুন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদে আওয়ামীলীগ প্রার্থীর মনোনয়ন পত্র জমাদানকালে ডিসির মোনাজাতঃ ‘আমি মনে করি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে যদি থাকে, তাহলে আমাদের দেশে আওয়ামী লীগ বলি, বিএনপি বলি, জামায়াত বলি—সবাই নিরাপদ থাকবে। আমি মনে করি, বিএনপি-জামায়াতেরও এখন দোয়া করা উচিত শেখ হাসিনা যেন আবার ক্ষমতায় আসেন।’ এই মোনাজাত করার পর যদি প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাকে দলীয় কর্মী না হওয়ার নসিয়ত করেন তাহলে সেটা কি কোনো গরহিত কাজ হবে?

কিন্তু হ্যাঁ, ডিসি এসপিরা ওই এসপির পক্ষ নিয়ে গত শনিবার নির্বাচন কমিশন অফিসে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়েছে। মারমুখী আচরণ করে তারা নির্বাচন কমিশনার আনিসুর রহমানকে বক্তৃতা মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিয়েছে। ডিসি এসপিদের এমন আচরণে হতভম্ব নির্বাচন কমিশন, বিব্রত নির্বাচন কমিশন। যে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন কালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা পালন করবে তারা কীনা ডিসি এসপিদের তোপের মুখে আলোচনা বৈঠক বন্ধ করে দিয়ে নানা ব্যাখ্যা দিচ্ছে। বলছে তারা ডিসি এসপিদের আচরণে বিব্রত তবে ক্ষুব্ধ নয়।.বাহ! কি চমৎকার কথা। যে নির্বাচন কমিশন এসব ডিসি এসপিদের কিছু করার ক্ষমতা রাখে না,  তাদের দিয়ে পরিচালনা করবে জাতীয় নির্বাচন? নির্বাচন কমিশনে গত শনিবার ডিসি এসপিরা যে আচরণ করেছে  সেটা কার্পেটের নিচে ঢেকে রাখার ফল ভালো হতে পারে না। তারা যে নির্বাচন কমিশনকে থোড়াই কেয়ার করে তার একটা নমুনা তারা সেদিন দেখিয়ে দিয়েছে।... কমিশন যে, এসব ডিসি এসপিকে যে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারবে না  তার একটা মহড়া হয়ে গেল গাইবান্ধা উপনির্বাচনে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে ২০২৩ সালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেটাও এদেশের জনগণকে মেনে নিতে হবে। ইতিপূর্বে ২০১৪ সালে এমন নখদন্তহীন নির্বাচন কমিশন করেছিল ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং ২০১৮ সালে করেছিল আগের রাতে ভোট গ্রহন। বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত থেকে দেখা যায় আগের রাতে ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলো সে সময়কার ডিসি এসপিরা। তাদের প্রত্যক্ষ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রনে সেই রাতে ভোটের বাক্স ভরা হয়েছিলো। তারা সে সময় আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ কিংবা যুবলীগ কর্মীদের কাজে না লাগিয়ে নিজেরাই কর্ম সম্পাদন করেছিলো। যে কারণে তারা বিভিন্ন সময় দম্ভভরে বলে বেড়াতো "আমরাই আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় এনেছি, আমরাই সরকারকে টিকিয়ে রাখবো।"

এমন মাইন্ডসেট প্রশাসন বজায় রেখে নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু আশা করা যায় সেটা ভেবে দেখতে হবে।



  • লেখক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক