Search

Sunday, March 31, 2024

মেজর জিয়ার ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিল বাঙালি সৈনিকেরা

সাক্ষাৎকার:  মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম 




১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান। তার স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে অনুপ্রাণীত করেছে, উজ্জীবিত করেছে। এমন একটি ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগের ঈর্ষাভাজন হয়েছেন; এই ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা আওয়ামী লীগের ছিল না। জিয়াউর রহমানকে নানান ধরনের মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়। এই মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইপিআরের বাঙালি সৈনিকেরা।

৫৪তম মহান স্বাধীনতা দিবসে বাংলা আউটলুককে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাংলা আউটলুকের ঢাকা প্রতিনিধি।

হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, পড়াশোনা শেষ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ১৯৬৮ সালে কমিশন পান। প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অফিসার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের মার্চে হাফিজ উদ্দিন তার ইউনিটের সঙ্গে যশোরের প্রত্যন্ত এলাকা জগদীশপুরে শীতকালীন প্রশিক্ষণে ছিলেন। ২৫ মার্চের পর তাদের ডেকে পাঠানো হয় এবং ২৯ মার্চ তারা সেনানিবাসে ফেরেন। পরে যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রথম অফিসার হিসেবে বিদ্রোহ করে যোগ দেন যুদ্ধে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ শেষ করে ভারতে যান। যুদ্ধকালে তিনি কামালপুর, ধলই বিওপি, কানাইঘাট ও সিলেটের এমসি কলেজের যুদ্ধে বেশ ভূমিকা রাখেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তিনি বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত হন।

বাংলা আউটলুক: প্রথম কারা অস্ত্র হাতে ধরেছিলেন?

মেজর হাফিজ: ১৯৭১ সাল জাতির জন্য গর্ব। অদ্ভূত এক সময়, একাত্তর সালে এই জাতিকে যারা দেখেনি, তারা এই জাতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকবে। পাকিস্তানিরা আমাদেরকে ঘৃণা করতো। তারা বলতো, ‘এরাতো মাছ খায়, নন মার্শল রেস্, এটা কোনো জাতিই না’। কিন্ত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রমাণ করেছে আমরা সাহসী জাতি। প্রথমে আমি প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ২০০ সৈনিক নিয়ে যশোর ক্যন্টনমেন্টে বিদ্রোহ করি। আমিই একমাত্র বিদ্রোহী অফিসার ছিলাম। ক্যান্টনমেন্ট থেকে বাইরে আসার পর দেখি হাজার হাজার ছাত্র-যুবক দৌঁড়ে আসছে আমাদের কাছে, এদের অধিকাংশই স্কুল কলেজের সাধারণ ছাত্ররা, সাধারণ মানুষ। এরা কেউই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না। আমাদের কাছে এসে বলছে, ‘স্যার আমাদেরকে অস্ত্র দেন, আমরা যুদ্ধ করব’।

বাংলা আউটলুক: মূলত কারা এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন?

মেজর হাফিজ: মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকেরা। যার সূচনা করেছিলেন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান। তার স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে অনুপ্রাণীত করেছে, উজ্জীবিত করেছে। আওয়ামী লীগের জন্য ঈর্ষার কারণ হয়েছেন তিনি। তারা ঘোষণা দিতে পারেননি। ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা তাদের ছিল না। সৈনিকদের পক্ষ থেকে মেজর জিয়া এ ধরনের একটি ঘোষণা দিয়ে তাদের (আওয়ামী লীগের) ঈর্ষাভাজন হয়েছেন। নানান ধরনের মিথ্যা অপবাদ তাকে দেওয়া হয়। মূলত যুদ্ধ শুরু করেছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইপিআরের বাঙালি সৈনিকেরা। এদের সাথে যোগ দিয়েছে হাজার হাজার ছাত্র, যুবক। সুতরাং এই স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা কেউ আলাদাভাবে দেখতে পারবে না।


বাংলা আউটলুক: কোন প্রেক্ষাপটে মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন?

মেজর হাফিজ: মুক্তিযুদ্ধের অনেকগুলো ফেইস বা ধাপ ছিল। এর প্রথম উন্মেষ ঘটে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। তার পর দীর্ঘ দিন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে ছাত্ররা। অবশেষে এসেছে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ৭০ সালের ভোটে যিনি জিতেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমান, তিনি অবশ্যই বড় মাপের নেতা। কিন্তু তার সংগ্রাম ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসনের আন্দোলন। বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব, ফর্টিয়ার প্রভিঞ্জ, সিন্ধু এদের সমান ভাগ তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানি কাঠামোয়। পূর্ব পাকিস্তানকে যেন বঞ্চিত করা না হয়, এটিই ছিল ২৪ বছরের আওয়ামী লীগের আন্দোলন। কিন্তু ২৫ মার্চ ভয়াবহ গণহত্যার পর বাঙালিরা তখন নামে এক দফার আন্দোলনে এবং এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর’র সৈনিকেরা, হাজার হাজার ছাত্র যুবকেরা, গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষ এসে এই যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব পাকিস্তানের ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। সাধারণ মানুষ তাদেরকে ভোট দিয়েছিলেন, এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু তারা স্বাধীনতার কথা কখনো চিন্তা করেনি। ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর বাঙালিদের স্বাধীনতার কথা ভাবতে বাধ্য করা হয়েছে। একটি ঘুমন্ত জাতি জেগে উঠেছিল। আমরা যদি সৈনিকেরা সশস্ত্র নেতৃত্ব না দিতাম, এ দেশ আজও স্বাধীন হতো না, আজও পাকিস্তান থাকতো। আমরা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা অপেক্ষায় ছিলাম, শেখ মুজিব হয়তো স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন, সেটি যখন তিনি দেননি এবং তার কাছে স্বাধীনতার ঘোষণার জন্য যখন তাজউদ্দিন আহম্মেদ টেপ রেকর্ডার নিয়ে গিয়েছিলেন ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার দিকে, তখন তিনি (শেখ মুজিব) বলেছিলেন, ‘আমি কোনো স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারব না, তাহলে আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত হব’। সুতরাং পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব তিনি নিতে চাননি। কিন্তু জনতা তখন পাগল-পাড়া, পাক বাহিনীর এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বাঙালি সৈনিকেরা। ১৯৭১ সালের এই যুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, সাধারণ মানুষের যুদ্ধ। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ নয়।

বাংলা আউটলুক: কোন ধরনের মানুষ সেদিন সাথে পেয়েছিলেন যুদ্ধে?

মেজর হাফিজ: বিভিন্ন পেশার লোক ছিল। আমি বেনাপোল অঞ্চলে যুদ্ধ করেছি। সেখানে বাসের ড্রাইভার, হেলপার, কৃষক, মুদি দোকানদার এমনকি ওই এলাকায় যারা স্মাগলার ছিল, সেই সমস্ত যুবকরাও এসে আমাদের সাথে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। কারণ জাতির তখন মহা দুর্দিন। এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে হয়েছে।

বাংলা আউটলুক: স্বাধীনতার এত বছর পরও কে ঘোষণা দিয়েছে, কে দেয়নি- এই বিতর্ক করে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হচ্ছে কি-না?

মেজর হাফিজ: অবশ্যই অপমান করা হচ্ছে। এটি হচ্ছে বর্তমান শাসক দল যে ইতিহাস বিকৃত করেছে তারই একটি প্রমাণ। সবাই জানে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু তারা প্রচার করে, শেখ মুজিবুর রহমান রাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই একটি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, টেলিফোনে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন ইপিআর’র সিগনাল সেন্টারে। ইপিআর’র সিগনাল সেন্টার থেকে বর্হিঃবিশ্বে এটি ইথারের মাধ্যমে ছড়িয়ে গেছে। এই মেসেজটি ধরেছে চট্টগ্রামের বহিঃনোঙ্গরে নোঙ্গর করা একটি বিদেশি জাহাজ। সেই জাহাজ থেকে ফোন করে নাকি জানিয়েছে চট্টগ্রামের কোন এক নেতাকে। প্রকৃতপক্ষে ২৩ মার্চ থেকেই পিলখানায় বাঙালি অফিসারদেরকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে পাকিস্তানিরা নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। ২৫ মার্চ রাতে প্রথমেই ইপিআরের শত শত সৈনিককে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু এই মেসেজ পাঠানো, রিসিভ করা এসব মিথ্যাচারের কোনো প্রয়োজন নেইতো। এমনিতেই শেখ মুজিব অনেক বড় নেতা। তার ডাকে অসহযোগ আন্দোলন হয়েছিল। আমরাতো স্বীকার করি, এমনকি জিয়াউর রহমান সাহেবও তো সেটা স্বীকার করেন। কিন্তু যেহেতু তারা স্বাধীনতা নিয়ে চিন্তা করেনি, স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণ ছিল না, সে জন্যই সাধারণ সৈনিকদের, সাধারণ মানুষের কৃতিত্বকে ম্লান করে দেবার জন্যই এই কল্প কাহিনীর অবতারণা করেছেন তারা।

বাংলা আউটলুক: আওয়ামী লীগ কেন এই বিষয়টি নিয়ে এমন করে, আপনার কী মনে হয়?

মেজর হাফিজ: আওয়ামী লীগ ঘটনাচক্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে। মুক্তিযুদ্ধতো সাধারণ মানুষ করেছে। তার পর উদার হৃদয়ে দেশের মানুষ তাদেরকেই ক্ষমতায় মেনে নিয়েছে। প্রথম দিন থেকেই মানে ১৯৭২ সাল থেকেই তারা গণতন্ত্র হত্যার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। ১৯৭২ সালে ডাকসুর ব্যালট পেপার তারা হাইজ্যাক করেছে। ১৯৭৩ সালে যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল, সেটি ছিল কারচুপিতে ভরপুর। প্রার্থী হাইজ্যাক, ব্যলটবাক্স ছিনতাই এসব দিয়েই তাদের আসল চরিত্র প্রকাশিত হয়েছে। তাদের চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পেয়েছে ৭৫ সালে, বাকশাল ঘোষণার মধ্য দিয়ে। সুতরাং, গণতন্ত্রে যে তারা বিশ্বাস করে না, সেটি আমরা আগেই দেখতে পেয়েছি। বর্তমানে এই যে ১৬ বছর ধরে দেশ শাসন করছে, দুর্নীতিতে তারা সিদ্ধহস্ত। সাধারণ মানুষের কোনো অধিকার নেই। যেই গণতন্ত্রের জন্য ৭১ সালে লড়াই হয়েছে, সেই গণতন্ত্রকেই তারা নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছে। মানুষের ভোটাধিকার নেই, বাক স্বাধীনতা নেই, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নেই। একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র শাসনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েছেন এবং তার দল বিএনপি সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের দল, তারাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে আসছে।

বাংলা আউটলুক: এমন পরিস্থিতিতে এই স্বাধীনতা দিবসে সাধারণ মানুষের প্রতি কী আহ্বান?

মেজর হাফিজ: আমরা বয়সে যখন তরুণ ছিলাম, আরো যারা শহীদ হয়ে গেছেন তাদের রক্তের বিনিময়ে, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা ও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মোটেই বাস্তবায়িত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান চেতনা ছিল- গণতন্ত্র। আজ সেই গণতন্ত্রই দেশ থেকে নির্বাসিত। সুতরাং, জনগণের প্রতি আমাদের উদাত্ত্ব আহ্বান, রাজপথে নেমে এসে কঠিন আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আবারো বাস্তবায়িত করে গণতন্ত্রকে আবারো দেখতে চাই। রাষ্ট্র শাসনের মধ্যেই মানুষের মতামত এবং অধিকার প্রতিফলিত হচ্ছে এটি দেখতে চাই। মহান মুক্তিযুদ্ধের যে লক্ষ্য ছিল, সাম্য-মানবিক মর্যাদা-গণতন্ত্র এই লক্ষ্যগুলো প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানাই। বর্তমান দুঃশাসনের অবসান ঘটাতে রাজপথে নেমে আসুন।

বাংলা আউটলুক: আপনারা যারা মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, তারা কী পারবেন এই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়ে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে আনতে?

মেজর হাফিজ: আমার বিশ্বাস আছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন সততা এবং দেশপ্রেমের, সেটি অবলম্বন করে বিএনপি দেশে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এই সংগ্রামে অবশ্যই আমরা বিজয়ী হবো। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যসমূহ বিএনপির নেতৃত্বেই একদিন বাস্তবায়িত হবে। এই দেশের লড়াকু জনগণ নিশ্চয়ই তাদের অধিকার ফিরে পাবে।

  • ২৬ মার্চ, ২০২৪

সাবেক আইজিপির অপকর্ম — বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ



ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ভাঙ্গা চৌরাস্তা থেকে টেকেরহাট হয়ে সামনে এগোলেই গোপালগঞ্জের সাহাপুর ইউনিয়নের বৈরাগীটোল গ্রাম। নিভৃত এই পল্লীর মাঝে গড়ে তোলা হয়েছে সাভানা ইকো রিসোর্ট নামের এক অভিজাত ও দৃষ্টিনন্দন পর্যটনকেন্দ্র, যেখানে এক রাত থাকতে গেলে গুনতে হয় অন্তত ১৫ হাজার টাকা। রিসোর্টের ভেতরে ঘুরে দেখা গেছে একই সঙ্গে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর হাতে গড়া আভিজাত্যের অপরূপ মিশেল। বিশাল আকৃতির ১৫টি পুকুরের চারপাশে গার্ড ওয়াল, দৃষ্টিনন্দন ঘাট, পানির কৃত্রিম ঝরনা ও আলোর ঝলকানি।


পার ঘেঁষে রয়েছে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স কটেজ। বিদেশি শিল্পীদের নিপুণ হাতে তৈরি হয় এসব স্থাপত্য নকশা। কটেজের ভেতর থেকে পুকুর পর্যন্ত এমন পথ নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে মাটিতে পা ফেলার প্রয়োজন নেই; সরাসরি কটেজ থেকে কাচে ঘেরা আবরণ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় শান-বাঁধানো ঘাটে। সাভানা ইকো রিসোর্টের পরিধি এতটাই বড় যে সাহাপুর গ্রামের নাম লিখে গুগলে সার্চ দিলে এই রিসোর্টটিই আগে ভেসে ওঠে পর্দায়।


প্রায় এক হাজার ৪০০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই ইকো রিসোর্টের বিভিন্ন জায়গায় মাটি ভরাট করে বানানো হয়েছে কৃত্রিম পাহাড়। সাগরের কৃত্রিম ঢেউ খেলানো সুইমিং পুলও রয়েছে এখানে। আছে হাজারের বেশি ভিয়েতনামি নারকেলগাছসহ বিভিন্ন ফলফলাদির গাছ। রয়েছে উন্নতমানের সাউন্ড সিস্টেমসহ বিশাল আকৃতির কনসার্ট হল।


দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একক পরিবারের জন্য বানানো এসব কটেজের পেছনে ব্যয় হয়েছে অর্ধকোটি টাকারও বেশি। যুগলদের কাছে কটেজের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রিসোর্টের ভেতরে এখন আরো ৫০টি কটেজ নির্মাণ করা হয়েছে। এত সব আয়োজন যেখানে, সেই রিসোর্টের নিরাপত্তায় পাশেই বসানো হয়েছে ‘বিশেষ’ পুলিশ ফাঁড়ি। যাতায়াতের জন্য সরকারি খরচে বানানো হয়েছে সাত কিলোমিটারের বেশি পাকা সড়ক।


দেশে এ রকম নজিরবিহীন আভিজাত্যে ঘেরা পর্যটন স্পটটির মালিকপক্ষ কারা জানেন? অবিশাস্য হলেও সত্য যে রাষ্ট্রীয় শুদ্ধাচার পুরস্কারপ্রাপ্ত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদের পরিবার।


সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদের স্ত্রী জীশান মীর্জা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বেনজীরের বড় মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীর এবং পরিচালক ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীর।


শুধু এই এক ইকো রিসোর্টই নয়, পুলিশের সাবেক এই প্রভাবশালী শীর্ষ কর্মকর্তা তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের নামে অন্তত ছয়টি কম্পানির খোঁজ পাওয়া গেছে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে। এর পাঁচটিই নিজ জেলা গোপালগঞ্জে। জেলা সদরের সাহাপুর ইউনিয়নের বৈরাগীটোল এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকার বেশি বলে ধারণা পাওয়া গেছে।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে রয়েছে বেনজীর আহমেদের অঢেল সম্পদ। দামি ফ্ল্যাট, বাড়ি আর ঢাকার কাছেই দামি এলাকায় বিঘার পর বিঘা জমি। দুই মেয়ের নামে বেস্ট হোল্ডিংস ও পাঁচতারা হোটেল লা মেরিডিয়ানের রয়েছে দুই লাখ শেয়ার। পূর্বাচলে রয়েছে ৪০ কাঠার সুবিশাল জায়গাজুড়ে ডুপ্লেক্স বাড়ি, যার আনুমানিক মূল্য কমপক্ষে ৪৫ কোটি টাকা। একই এলাকায় আছে ২২ কোটি টাকা মূল্যের আরো ১০ বিঘা জমি।


এই বিপুল সম্পদের মালিক পরিবারের কর্তা পুলিশের সাবেক আইজি ও র‌্যাবের সাবেক ডিজি বেনজীর আহমেদ সরকারি বেতন-ভাতা থেকে কত টাকা উপার্জন করেছেন, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, ৩৪ বছর সাত মাসের দীর্ঘ চাকরিজীবনে বেনজীর আহমেদ বেতন-ভাতা বাবদ মোট আয় করেছেন এক কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার ২০০ টাকা। এর বাইরে পদবি অনুযায়ী পেয়েছেন আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা। বাংলাদেশ পুলিশের ৩০তম মহাপরিদর্শক ছিলেন তিনি। ২০১১, ২০১২, ২০১৪ এবং ২০১৬ সালে পেয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম)। অবসরে যাওয়ার আগে ২০২১ সালে ভূষিত হন শুদ্ধাচার পুরস্কারেও। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরে যাওয়ার পর বেরিয়ে আসে সাবেক এই পুলিশকর্তার থলের বিড়াল।


সম্পদের মালিকানায় স্ত্রী ও দুই মেয়ে


অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সুকৌশলী বেনজীর আহমেদ নিজের নামে কোনো সম্পদ করেননি, করেছেন তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে। গোপালগঞ্জে সাভানা ফার্ম প্রডাক্টস, সাভানা অ্যাগ্রো লিমিটেড, সাভানা ন্যাচারাল পার্ক, সাভানা ইকো রিসোর্ট, সাভানা কান্ট্রি ক্লাব বানিয়েছেন বেনজীর আহমেদ। বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেড নামের একটি কম্পানিতে বড় মেয়ে ফারহিনের নামে এক লাখ, আর ছেটে মেয়ে তাহসিনের জন্য কেনা হয়েছে আরো এক লাখ শেয়ার। এম/এস একটি শিশির বিন্দু (রেজি. পি-৪৩০৩৬) নামের ফার্মের ৫ শতাংশের মালিকানায় নাম রয়েছে বড় মেয়ের। আরো ৫ শতাংশের মালিকানা রয়েছে ছোট মেয়ের। একই প্রতিষ্ঠানে বেনজীরের স্ত্রী জীশান মীর্জার রয়েছে ১৫ শতাংশ অংশীদারি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ২৫ শতাংশের মালিকানা রয়েছে বেনজীর আহমেদের স্ত্রী ও মেয়েদের।


যৌথ মূলধনী ফার্মসমূহের পরিদপ্তর থেকে একটি নথি কালের কণ্ঠ’র হাতে এসেছে। সেটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাবেক পুলিশ ও র‌্যাব কর্তা বেনজীর আহমেদ তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে গোপালগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেছেন সাভানা অ্যাগ্রো। ২০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনধারী সাভানা অ্যাগ্রো লিমিটেডের পরিচালক তিনজন। ১০টি শেয়ারধারী স্ত্রী জীশান মীর্জা চেয়ারম্যান, সমপরিমাণ শেয়ারের অধিকারী ২৯ বছর বয়সী বড় মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীর এমডি। আর মাত্র ২৪ বছর বয়সী ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীর আছেন পরিচালক হিসেবে। প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে সরেজমিনে যায় কালের কণ্ঠ। সেখানে দেখা গেছে, ২০ কোটি নয়, সাভানা অ্যাগ্রোর রয়েছে কয়েক শ কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা।


বেনজীর আহমেদের পরিবারের আরেকটি প্রতিষ্ঠান হলো সাভানা ন্যাচারাল পার্ক প্রাইভেট লিমিটেড। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কম্পানির (আরজেএসসি) তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই কম্পানির অনুমোদিত মূলধন পাঁচ কোটি টাকা। সাভানা অ্যাগ্রোর মতো এই কম্পানির মালিকানায়ও আছেন স্ত্রী ও দুই মেয়ে। যথারীতি এখানেও স্ত্রী চেয়ারম্যান এবং মেয়েদের একজন এমডি, অন্যজন পরিচালক। প্রত্যেকের হাতে রয়েছে এক লাখ করে মোট তিন লাখ শেয়ার। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এই পার্কের আয়তন প্রায় ৬০০ বিঘা। পার্কটি বড় করতে পাশে আরো ৮০০ বিঘা জমি কেনা হয়েছে। এখন ভরাট করা হচ্ছে।


যৌথ মূলধনী কম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর থেকে পাওয়া নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাভানা অ্যাগ্রোর নিবন্ধনে ঠিকানা হিসেবে দেওয়া হয়েছে ২২৮/৩, শেখপাড়া রোড, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী, ঢাকা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ঠিকানাটি বেনজীরের শ্বশুরবাড়ি। বেনজীরের শ্বশুরের নাম মীর্জা মনসুর উল হক ও শাশুড়ির নাম লুত্ফুন নেসা মনসুর।


নথির তথ্য মতে, বেনজীরের স্ত্রী জীশান মীর্জার জন্ম ১৯৭৩ সালের ১০ জুলাই। বড় মেয়ের জন্ম ১৯৯৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। ছোট মেয়ে জন্মেছেন ২০০০ সালের ১২ এপ্রিল। দুই মেয়ে মাত্র ২৯ ও ২৪ বছর বয়সেই কয়েক শ কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন প্রভাবশালী পুলিশকর্তা বাবার অবৈধ আয়ের ওপর ভর করে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। স্ত্রী জীশান মীর্জারও তেমন কোনো বৈধ আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও বিপুল বিনিয়োগে গড়ে তোলা ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান তিনি। জীশান মীর্জার পৈতৃক সূত্রে এত পরিমাণ সম্পদ পাওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে বড় মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীরের ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর বিয়ে হলেও ছোট মেয়ের এখনো বিয়েই হয়নি। বড় মেয়ের বিয়ের প্রায় ১২ বছর আগে থেকেই বেনজীর কম্পানিগুলোর জন্য জমি কেনা শুরু করেন এবং মেয়েকে কম্পানির এমডি বানান।


সরেজমিনে বেনজীরের রিসোর্ট


বেনজীরের সম্পদের খোঁজে সরেজমিন অনুসন্ধানে গোপালগঞ্জ যায় কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানী দল। বৈরাগীটোল এলাকায় সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কটিকে স্থানীয়রা ‘বেনজীরের চক’ নামে চেনে। পুলিশের মহাপরিদর্শক ও র‌্যাবের ডিজি থাকাকালে এলাকাটিতে স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে প্রায় এক হাজার ৪০০ বিঘা জমি কেনেন তিনি। এসব জমির বিঘাপ্রতি ক্রয়মূল্য ছিল তিন থেকে আট লাখ টাকা।


এলাকাবাসী জানায়, বেনজীর জমিগুলো কেনার পর অন্ততপক্ষে ১৫ ফুট ভরাট করে রিসোর্ট বানিয়েছেন। কারণ এগুলো ছিল বদ্ধ জলাশয়। নিচু হওয়ায় বেনজীরের রিসোর্টটি আগে ছিল মাছের অভয়ারণ্য।


সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সাভানা রিসোর্টে ১৫টি কটেজ বানানো শেষ করে পর্যটকদের কাছে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। এগুলো কাপলদের কাছে শুধু দিন হিসাবে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা, রাত হিসাবে সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত একই দামে, দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়। রিসোর্টে চাকরিরত দায়িত্বশীলরা জানান, যেকোনো বয়সী ছেলেমেয়ে কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই এসব কটেজে থাকতে পারে। চাইলে রাত যাপন করতে পারে। বেনজীর বিলাসবহুল এই রিসোর্ট চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন থাইল্যান্ডসহ পশ্চিমা বিশ্বের আদলে।


রিসোর্টটির আলোকসজ্জা করতে কোনো মিটার ছাড়াই কিলোমিটারের পর কিলোমিটার বিদ্যুতের সরকারি তার সরবরাহ করা হয়েছে কোনো খুঁটি ছাড়াই। মাটির ওপর দিয়ে নেওয়া এসব বৈদ্যুতিক তার যে কারো জন্যই প্রাণনাশের হুমকিস্বরূপ। সাগরের কৃত্রিম ঢেউ খেলানো সুইমিং পুলও রয়েছে এখানে। আছে হাজারের বেশি ভিয়েতনামি নারকেলগাছসহ বিভিন্ন ফলফলাদির গাছ।


শুধু তাই নয়, রিসোর্টটির নিরাপত্তায় পাশেই বসানো হয়েছে পুলিশ ফাঁড়ি। আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থায় উন্নতি না হলেও এই রিসোর্টে প্রবেশ স্বাচ্ছন্দ্য করতে সাত কিলোমিটার সড়ক পাকা করা হয়েছে সরকারি খরচে। রিসোর্টের ভেতরেও সর্বত্র করা হয়েছে ঢালাইয়ের রাস্তা। রিসোর্টের সব রাস্তার হিসাব করলে দেখা যায়, প্রায় ৩০ কিলোমিটার সড়ক পিচ ঢালাই করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, বেনজীরের নিজ প্রতিষ্ঠানের এসব রাস্তাও করা হয়েছে সরকারি খরচে।


জানতে চাইলে রিসোর্টের ব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানী টিমকে বলেন, ‘বেনজীর আহমেদ এটিকে সাজাচ্ছেন দেশের সবচেয়ে বড় ইকোপার্ক ও বিলাসবহুল রিসোর্টের পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে। এ জন্য যা যা দরকার, তা-ই করা হচ্ছে।’


বেনজীরের কেনা জমির কয়েকজন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ক্রমাগত চাপ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁদের জমি বিক্রি করতে বাধ্য করেন বেনজীর। ভয়ভীতিতে কাজ না হলে ভেকু দিয়ে জমির মাটি নিয়ে যেতেন। গভীর গর্ত করে শেষ পর্যন্ত জমি বিক্রি করতে বাধ্য করতেন। পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন পদে থাকায় তাঁর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি জমির মালিকরা।


ঢাকা ও পূর্বাচলে বিপুল টাকার সম্পদ


অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর গুলশানে সুবিশাল অভিজাত একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে বেনজীর আহমেদের। গুলশান ১ নম্বরের ১৩০ নম্বর সড়কের ১ নম্বর বাড়িটির নাম ‘র‌্যাংকন আইকন টাওয়ার লেক ভিউ’। ভবনের ১২ ও ১৩তম তলায় আট হাজার ৬০০ বর্গফুটের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে তাঁর। সূত্র জানায়, আট হাজার ৬০০ বর্গফুটের এই অ্যাপার্টমেন্টের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।


ভবনটি নির্মাণ করে র‌্যাংকন ডেভেলপমেন্টস। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ১৯.৭৫ কাঠা জমিতে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টের আয়তন দুই হাজার ১৫০ বর্গফুট। এখানে রয়েছে ১৩টি ফ্লোর এবং দুটি বেইসমেন্ট। সত্যতা নিশ্চিত করতে সরেজমিনে গেলে ভবনের নিরাপত্তাকর্মী মো. সবুজ কালের কণ্ঠকে জানান, ১২ ও ১৩তম তলায় রয়েছে বেনজীরের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট।


এ ছাড়া রাজধানীর মগবাজার আদ-দ্বীন হাসপাতাল সংলগ্ন ইস্টার্ন প্রপ্রার্টিজের একটি বহুতল ভবনে চার হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট কিনেছেন বেনজীর আহমেদ।


পূর্বাচলে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ি করেছেন বেনজীর আহমেদ। আনন্দ হাউজিং সোসাইটির দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় পোড়া মোড়ের পাশের এলাকায় অন্তত ৪০ কাঠা জমির ওপর গড়েছেন বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি। জমি ও বাড়ির মূল্য কমপক্ষে ৪৫ কোটি টাকা বলে ধারণা স্থানীয়দের।


ওই এলাকার বাসিন্দা মো. শাহাদাত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই এলাকা ডোবা ও বিল হিসেবে আমরা দেখেছি। কিছুদিন আগেও এসব এলাকায় আমরা মাছ ধরেছি। পুলিশের কর্মকর্তারা আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার পরপরই বেনজীর আহমেদ এই জায়গায় মাটি ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ করেছেন।’


দীর্ঘদিন ধরেই আনন্দ হাউজিং সংলগ্ন এলাকায় অটো চালান মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, সোসাইটির ভেতরে সবচেয়ে দামি বাড়ি এটি। আনন্দ হাউজিং এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তবে বেনজীরের ডুপ্লেক্স বাড়িটি দেখার জন্য মাঝেমধ্যে ভিড় জমায় সাধারণ মানুষ।


রাজধানীর পূর্বাচলের ফারুক মার্কেটের পেছনের দিকে ১৭ নম্বর সেক্টরের ৩০১ নম্বর রোডের জি ব্লকে ১০ নম্বর প্লটের মালিক পুলিশের সাবেক এই আইজি। স্থানীয়রা বলছেন, ১০ কাঠা পরিমাণের এই প্লটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২২ কোটি টাকা। বেনজীর আহমেদ পুলিশের আইজি থাকাকালে এই প্লট কেনেন। তবে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, পুলিশের এই সাবেক আইজি তাঁর ১০ কাঠার প্লটটি বিক্রির পরিকল্পনা করছেন। এরই মধ্যে বেশ কিছু ক্রেতার সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। ওই এলাকার মোহাম্মদ নাঈম, আব্দুল কাদের ও মোহাম্মদ মোহসিন নামের তিন ব্যক্তি পুলিশের সাবেক এই আইজির ১০ কাঠার প্লটটির বিষয়ে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।


নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের নাওড়ায় বেনজীর আহমেদের রয়েছে দুই বিঘা জমি, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।


বেনজীরের দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আলী ইমাম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইন সবার জন্য সমান। কেউ যদি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেন, দুদক তদন্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।’


বেনজীর আহমেদ পুলিশের একজন প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন, এ ক্ষেত্রে দুদক কতটুকু কী করতে পারবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আইনে প্রভাবশালী নিয়ে কিছু বলা নেই। সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রীরও দুর্নীতির বিচার হয়েছে। সুতরাং যে কারো দুর্নীতির বিষয়ে দুদক চাইলে অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নিতে পারে।


জানতে চাইলে দুদক কমিশনার (তদন্ত) মো. জহুরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, “বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই অনুসন্ধান করা হবে। তবে এখানে বলে রাখা ভালো, কারো বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হলে পর্যাপ্ত ‘সাপোর্টিং পেপারস’ আমাদের কাছে থাকতে হয়।”


তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট ও সঠিক তথ্য পেলে দুদক বেনজীর কেন, যে কারো বিরুদ্ধেই অনুসন্ধান করবে। আর সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পরও যদি অনুসন্ধান না করা হয়, তাহলে দুদকের বিরুদ্ধেই তো রিপোর্ট হবে।


অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে কালের কণ্ঠ’র পরিচয় দিয়ে খুদে বার্তা পাঠিয়ে নিউজের বিষয়ে বক্তব্য প্রয়োজন বলে জানানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।


দুই মেয়ের নামে বেস্ট হোল্ডিংস ও লা মেরিডিয়ানে ২ লাখ শেয়ার

মেয়ের বিশ্রামের জন্য সাড়ে ৩ কোটি টাকার ফ্ল্যাট

-----

বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মেয়ে ক্লাসের ফাঁকে একটু সময় কাটাবেন, এ জন্য সাড়ে তিন কোটি টাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনেন পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৭ সালে র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এই ফ্ল্যাট কেনেন তিনি। সি ব্লকের ৪০৭ নম্বর প্লটে সাত কাঠা জমির ওপর নির্মিত আটতলা ভবনের পঞ্চম তলায় তাঁর কেনা ফ্ল্যাটের আয়তন সাড়ে তিন হাজার বর্গফুট।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেনজীর আহমেদের বড় মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।


ক্লাসের বিরতির সময় তিনি যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে বিশ্রাম নিতে পারেন, সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনেই এই ফ্ল্যাট কেনা হয়েছিল। তাঁর এই ফ্ল্যাট নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে।

সরেজমিনে খোঁজ নিতে গিয়ে কথা হয় ভবনের নিরাপত্তাকর্মী তমিজ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি প্রায় ১৪ বছর ধরে এখানে কাজ করছেন।


তমিজ জানান, প্রস্তুত হওয়ার তিন বছর পর্যন্ত বেনজীর আহমেদের মেয়ে ফ্ল্যাটটি ব্যবহার করতেন। মাঝেমধ্যে বেনজীর তাঁর স্ত্রীসহ ফ্ল্যাটটিতে আসতেন। বছরখানেক আগে খোকন নামের গোপালগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর কাছে ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দেন বেনজীর।

ভবনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বেনজীর আহমেদ ফ্ল্যাটটি ডেকোরেশনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছিলেন।


কয়েকটি দরজারই মূল্য ছিল ৫০ লাখ টাকার বেশি। ভেতরের আসবাবও ছিল চোখ-ধাঁধানো। এ নিয়ে ওই ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দাদের মনেও কৌতূহলের অন্ত নেই।

 


দুই মেয়ের নামে পাঁচতারা হোটেলের মালিকানা


প্রাথমিক গণপ্রস্তাব প্রক্রিয়া (আইপিও) শেষে সম্প্রতি পুঁজিবাজারের ভ্রমণ ও আবাসন খাতে তালিকাভুক্ত হয় বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেড। এই বেস্ট হোল্ডিংসের অন্যতম প্রকল্প হলো বৈশ্বিক ব্যান্ড হিসেবে খ্যাত পাঁচতারা হোটেল ‘লা মেরিডিয়ান’।


তালিকাভুক্তির আগ থেকেই কম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন ও প্রসপেক্টাসে তথ্যের ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ থাকলেও একজনের ক্ষমতায় শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় কম্পানিটি। অভিযোগ রয়েছে, নামে-বেনামে এই কম্পানির বড় অঙ্কের শেয়ার ছিল বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের হাতে। তাই মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়েই পুঁজিবাজারে আসে কম্পানিটি।

পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগের সত্যতা খুঁজতে অনুসন্ধানে নামে কালের কণ্ঠ। বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডের দেওয়া প্রসপেক্টাস অনুসন্ধানে বের হয়েছে চমকপ্রদ তথ্য। জানা যায়, কম্পানিটির দুই লাখ শেয়ারের মালিক সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দুই মেয়ে। দুই মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের নামে রয়েছে সমানসংখ্যক শেয়ার। ৫৫ টাকা অধিমূল্যে ৬৫ টাকা প্রতিটি শেয়ারের দর হিসাবে এই কম্পানিতে সাবেক আইজিপির দুই মেয়ের বিনিয়োগ রয়েছে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা।


অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৯ সালে বেস্ট হোল্ডিংসের দুই লাখ শেয়ার দুই মেয়ের জন্য কেনেন বেনজীর আহমেদ। ওই সময় র‌্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।


তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বেস্ট হোল্ডিংসের শেয়ার কিনতে ফারহিন ব্যবহার করেছেন সার্কিট হাউসের ঠিকানা। বেস্ট হোল্ডিংসের প্রসপেক্টাসের ১৮৯ নম্বর পৃষ্ঠায় এই ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। ঠিকানার স্থলে লেখা হয়েছে : হাউস-১০, সার্কিট হাউস, শান্তিনগর, রমনা, ঢাকা। ঠিকানার পাশাপাশি উভয়ের বিও অ্যাকাউন্ট নম্বরও জানা গেছে।


বিও অ্যাকাউন্ট হচ্ছে বেনিফিশিয়ারি ওনার অ্যাকাউন্ট। এর মাধ্যমে ইস্যুয়ার কম্পানি তার শেয়ারহোল্ডার বা বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বা কম্পানির মালিকানা হস্তান্তর করে। বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীরের দেওয়া বিও অ্যাকাউন্ট নম্বর ১২০৬৩৫০০৭৫৬৮৫১৩২ এবং তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিও অ্যাকাউন্ট নম্বর ১২০৬৩৫০০৭৫৬৮৫২৫৮।


কত ছিল বেনজীরের বৈধ আয়?

--------

অবসরের আগে পুলিশের সর্বোচ্চ পদে আসীন ছিলেন বেনজীর আহমেদ। ৩৪ বছর সাত মাসের দীর্ঘ চাকরিজীবন তাঁর। ১৯৮৮ সালে মাসিক এক হাজার ৪৭০ টাকা বেতনে চাকরি শুরু। আর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে চাকরিজীবন শেষ করেন ৭৮ হাজার টাকা বেতনে।


সব মিলিয়ে তিনি বেতন-ভাতা বাবদ আয় করেন এক কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার ২০০ টাকা।

বেনজীর আহমেদ বাংলাদেশ পুলিশের ৩০তম মহাপরিদর্শক ছিলেন। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি অবসরে যান। এর আগে ২০১১, ২০১২, ২০১৪ ও ২০১৬ সালে পেয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম)।


অবসরে যাওয়ার আগে ২০২১ সালে ভূষিত হন শুদ্ধাচার পুরস্কারেও। তবে অবসরে যাওয়ার পর বেরিয়ে আসে, শুদ্ধাচার পুরস্কারে ভূষিত এই প্রভাবশালী কর্মকর্তার দুর্নীতির ফিরিস্তি দীর্ঘ। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধান বলছে, স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে তিনি দেশের নানা প্রান্তে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ।


জাতীয় বেতন স্কেল ১৯৭৭ অনুযায়ী বেনজীর আহমেদ ১৯৮৮ সালে চাকরিতে যোগদানের পর নবম গ্রেড হিসেবে সর্বসাকল্যে প্রতি মাসে বেতন পান এক হাজার ৪৭০ টাকা।


সে অনুযায়ী প্রথম তিন বছরে সর্বসাকল্যে বেতন পান ৫২ হাজার ৯২০ টাকা।

পরবর্তীকালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে পদোন্নতির পর জাতীয় পে স্কেল ১৯৯৭ হিসাবে সপ্তম গ্রেড অনুসারে প্রতি মাসে ৯ হাজার ৭৫০ টাকা বেতন পান। এই পদে দায়িত্বকালে চার বছরে সর্বসাকল্যে তাঁর বেতনের অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় চার লাখ ৬৮ হাজার টাকা।


২০০১ সালে এআইজি হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত ছয় বছরে জাতীয় পে স্কেল ১৯৯৭ হিসাবে ষষ্ঠ গ্রেড অনুসারে প্রতি মাসে ১০ হাজার ৮৪০ টাকা মাসিক বেতনে সর্বসাকল্যে তাঁর বেতনের অর্থ দাঁড়ায় সাত লাখ ৮০ হাজার ৪৮০ টাকা।


এআইজি হিসেবে পঞ্চম গ্রেড অনুযায়ী জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৫ অনুসারে ২০০৭ সাল পর্যন্ত মাসে ১৭ হাজার ৩২৫ টাকা বেতন পান।


সে হিসাবে ওই সময়কালে সর্বসাকল্যে তাঁর বেতনের মোট অর্থ দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৬৩ হাজার ২০০ টাকা।

২০০৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৯ অনুযায়ী অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে দ্বিতীয় গ্রেডে পুলিশের সাবেক এই আইজির আট বছরে প্রতি মাসে ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা হারে সর্বসাকল্যে বেতনের অর্থ দাঁড়ায় ৩৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা।


পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সাল থেকে তাঁর চাকরিজীবনের শেষ ধাপ ২০২২ সাল পর্যন্ত গ্রেড-১ হিসাবে জাতীয় বেতন কাঠামো ২০১৫ অনুযায়ী সাত বছরে প্রতি মাসে ৭৮ হাজার টাকা হারে সর্বসাকল্যে তাঁর বেতনের অর্থ দাঁড়ায় ৭৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা।


সেই হিসাবে এই কর্মকর্তা চাকরিজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মোট বেতন বাবদ উপার্জন করেছেন এক কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার ২০০ টাকা।


এর সঙ্গে পুলিশের সাবেক এই আইজি বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মিশনে অংশগ্রহণ করে বৈধ পন্থায় অর্জন করেছেন কিছু আর্থিক সুবিধা।


বেনজীরের দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আলী ইমাম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, আইন সবার জন্য সমান। কেউ যদি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে, দুদক তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।


জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, বেনজীর আহমেদ যেহেতু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি ছিলেন, সে কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির তথ্য উঠে এলে অবশ্যই সরকারকে গুরুত্বসহকারে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। দুদকসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের এ বিষয়ে বিশদভাবে অনুসন্ধানে নামা উচিত।


ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের যেকোনো পর্যায়েই চাকরি করুন না কেন বৈধ উপায়ে কোনোভাবেই এত সম্পদ অর্জন করা সম্ভব নয়। বেনজীর আহমেদ যদি সত্যিই এত সম্পদের মালিক হয়ে থাকেন, সেটি বিস্ময়কর। বেনজীর দুর্নীতি করে থাকলে সেটি চিহ্নিত করা উচিত জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের উৎস ও সূত্রগুলো চিহ্নিত করতে হবে। তাঁর দুর্নীতির পুরো চিত্র উন্মোচন করা উচিত। কারণ আইন সবার জন্য সমান।