Search

Saturday, August 12, 2017

ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ই পূর্বপরিকল্পিত

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন




আইন কমিশন একটি স্বাধীন কমিশন যার দায়িত্ব দেশের আইনসমূহ পর্যালোচনা করা এবং সংবিধানের আলোকে প্রয়োজনে আইনের পরিবর্তন ও পরিবর্ধনে সুপারিশ করা। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার মতোই আইনের বিশ্লেষণ করার ব্যাপারে আইন কমিশনকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। দলীয় রাজনীতির ঠিকাদারির বা সরকারের তলপিবাহক হওয়ার স্বাধীনতা দেয়া হয়নি। আইন কমিশন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুবিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনে প্রধানত আইনসমূহের বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারে। স্বাধীন আইন কমিশন স্বাধীন বিচার বিভাগের এক সহযোগী শক্তি।

কিন্তু আইন কমিশনের পক্ষে সুপ্রিমকোর্টের কোনো রায়ের সমালোচনা করার এখতিয়ার নেই। ফলে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং আইন কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান জনাব খাইরুল হক যে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের সমালোচনা করেছেন, দেশকে জনগণের প্রজাতন্ত্রের নয়, বিচারকদের প্রজাতন্ত্র বলে কটাক্ষ করেছেন সেটা তার ক্ষমতার বাইরে। নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না হয়েই সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের ইমপিচমেন্ট সম্পর্কিত রায় নিয়ে ক্ষমতাবহির্ভূত সমালোচনা করেছেন ও রায়ের বিরুদ্ধে চড়াও হওয়ার পাশাপাশি অশালীনভাবে রায়টির বিরোধিতা করেছেন বিচারপতি খায়রুল হক। কোনো যুক্তি দিয়ে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে খণ্ডনের চেষ্টা তিনি করেননি। তার যুক্তি হল পার্লামেন্টের সদস্য বা এমপিদের যদি অপরিপক্ব বা ইমম্যাচিউরড বলা হয়, তবে সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদেরও ইমম্যাচিউরড বা অপরিপক্ব বলতে হবে। এমন বাড়াবাড়ির কী কারণ থাকতে পারে? তিনি কি ভুলে গেছেন এই রায়ের পক্ষে সুপ্রিমকার্টের ৭ জন প্রবীণ আইনজীবী অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে মত দিয়েছেন? যার মধ্যে আছেন ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের মতো সিনিয়র আইনজীবী, যারা সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তারা সবাই ইমম্যাচিউরড!

যা সত্য তা হল, সরকারের আশপাশে এমন কিছু লোকের সমাগম রয়েছে, যারা অন্ধ ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। তারা সরকারকে বোকা মনে করে। তাই নিজেরা বুদ্ধিমান সেজে সরকারকে বিভ্রান্ত করে সরকার ও জনগণের জন্য মহাবিপদ ডেকে আনছে। সরকার এখন অব্যবস্থার মধ্যে আছে। এ মুহূর্তে তারা পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করছে।

জনাব খায়রুল হক কোনোরূপ যুক্তি দিয়ে সুপ্রিমকোর্টের রায়ের মোকাবেলা না করে বলে দিলেন দেশে জনগণের নয়, বিচারপতিদের প্রজাতন্ত্র চলছে। তিনি আরও বলেন, এই রায় পূর্বনির্ধারিত এবং আগে থেকেই পূর্বপরিকল্পিত রায় দেয়া হয়েছে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের ক্ষেত্রে। বিচারপতিরা বিচার্য বিষয়ের যুক্তিতর্ক ছাড়াই পূর্বনির্ধারিত, পূর্বপরিকল্পিত বা প্রিপ্লানড রায় দেন- এমন বক্তব্য সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের কাছ থেকে এলে আমাদের তার দেয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়টি নিয়ে আলোচনা করতে হয়। তিনি কি কোনো পূর্বনির্ধারিত ও পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের আইন সম্পর্কিত সংবিধানের সেই সংশোধনীটি বাতিল করেছিলেন? তার সে রায়ের মাধ্যমে বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান দুর্বল পার্লামেন্ট গঠন করা হয়েছে। বিচারপতিদের বিচার সম্পর্কিত রায়ের সমালোচনা করতে গিয়ে খায়রুল হক বলেছেন, এ ধরনের রায়ে সামরিক শাসন প্রবর্তনের কাজটিকে সাহায্য করা হয়েছে। দেশের পার্লামেন্ট ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

বিভিন্ন সময় কথায় কথায় আমাদের সামরিক শাসনের ভয় দেখানো হয়। সংসদের সমালোচনা ও রাজনীতিবিদদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ষোড়শ সংশোধনী রায়ে পর্যবেক্ষণ দেয়ার পর সে ধরনের কথা আবারও বলা হচ্ছে। সামরিক শাসন কীভাবে আসে। এটা তো সবারই জানা, সামরিক শাসন আনার পেছনে রাজনীতিকদেরই ভূমিকা ছিল। তাদের ব্যর্থতা বা অনেক ক্ষেত্রে তারাই নিজেদের স্বার্থে সামরিক শাসন টেনে এনেছেন।
 
জনাব খায়রুল হক যখন ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে পূর্বপরিকল্পিত বলে নজিরবিহীনভাবে সমালোচনা করেন (এর আগে কোনো সাবেক প্রধান বিচারপতি আপিল বিভাগের রায় নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেননি), তখন বাস্তবতা হচ্ছে তিনি কোনো ঐক্যবদ্ধ বা সর্বসম্মত রায়ের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায় দেননি। তিনি নিজের কাস্টিং ভোট (সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার জন্য নিজের ভোটকে অতিরিক্ত হিসেবে ব্যবহার করা) দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ওই রায় দেন। অথচ ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের যে রায় বর্তমান প্রধান বিচারপতি দিয়েছেন, সব বিচারপতির সর্বসম্মত রায় ছিল এটি। এমনকি অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে ৭ জন আইনজীবীর সবাই এই রায়ের পক্ষে মত দিয়েছেন।


তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সময় খায়রুল হকের যুক্তি ছিল নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকার নির্বাচিত নয়। নির্বাচন হতে হবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে। অর্থাৎ নির্বাচনের জন্য সংসদ ভাঙতে হবে না। আইনসভাসহ নির্বাচিত সরকারের অধীনে বিরোধী দলগুলোকে নির্বাচন করতে হবে। তিনি এভাবে তার রায়ের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অসম্ভব করে দিলেন! তিনি অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে প্রধান প্রধান আইনজীবীর মতামতকে অগ্রাহ্য করলেন। হাইকোর্টের বিচারপতিদের তিনজনের দেয়া রায়ের (তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার পক্ষে রায় দেন) প্রতি গুরুত্ব দিলেন না। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের অপর তিনজন বিচারপতির ভিন্নমত পোষণের কোনো মূল্য দিলেন না। এভাবে জনগণের নির্বাচন অসম্ভব করে তিনি জনগণের প্রজাতন্ত্রের কথা বলছেন! তার দেয়া রায়ের জন্য যে স্বাধীনভাবে জনগণের ভোটের মাধ্যমে পার্লামেন্ট গঠন করা সম্ভব হয়নি সেটা প্রধানমন্ত্রীও স্বীকার করেছিলেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও নিয়মরক্ষার নির্বাচন বলার মাধ্যমে। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, এমন একটি পার্লামেন্টের জন্য খায়রুল হকের দরদ একটু বেশিই মনে হয়েছে। যে পার্লামেন্টে কার্যকর বিরোধী দল থাকে না সে পার্লামেন্টকে কার্যকর পার্লামেন্ট বলা কোনো সুচিন্তিত কথা নয়।


তিনি যদি স্বাধীনভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচন পদ্ধতির দিকে তাকাতেন তাহলে জানতে পারতেন কোনো দেশেই পার্লামেন্ট ব্যবস্থায় সংসদ না ভেঙে নির্বাচন হয় না। এমনকি ভারতের দিকে তাকালেও বুঝতে পারতেন। আর এটা তো সহজ কথা যে, সংসদ ভেঙে দেয়ার পর নির্বাচিত সরকার থাকে না। উন্নত দেশে সরকার ভাঙার পর কেউ প্রশ্ন তোলে না বিধায় রানিং প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান সীমিত একটা অস্থায়ী সরকার করে দেয়।

জনাব খায়রুল জনগণের নির্বাচন অসম্ভব করে স্বৈরতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করেছেন। তার কাছে বর্তমান সংসদের দুর্বলতা কোনো দুর্বলতা নয়। এখন বিচার ব্যবস্থাকেও যদি সংসদের অধীনস্থ করা যায় তাহলে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়ে যাবে। সে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার বক্তব্যে এখানে মনে হবে যে তিনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নয়, সরকারকে রক্ষার জন্য ক্ষমতাবহির্ভূত বক্তব্য রেখেছেন। জনগণের প্রজাতন্ত্র থাকলে জনাব খায়রুল হক আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের পদে থাকতে পারতেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়কে যদি তার ভাষায় পূর্বনির্ধারিত ও পূর্বপরিকল্পিত বলা হয় তাহলে সেটাই হবে যুক্তিযুক্ত।

  •     ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
উৎসঃ jugantor.com

No comments:

Post a Comment