Search

Monday, May 31, 2021

নারীর ক্ষমতায়নে শহীদ জিয়ার অবদান

-----------------------------------------------------------

অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাঃ শামীম ও 

আশরাফুল ইসলাম খান আনিক

-----------------------------------------------------------


একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাফল্যগাঁথা এক দুই কলামে লেখা সম্ভব না, তাই আজকে এ লেখায় নারী উন্নয়নে, নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্যে মহৎ এ নেতার অবদানের কথা স্মরণ করছি বিন¤্র শ্রদ্ধায়। বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের নারী সমাজকে আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানের পথ প্রথম দেখিয়েছিলেন যিনি তিনি হলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। এদেশের নারীদের আজ যতটুকু অগ্রগতি, যতটুকু প্রাপ্তি তার সিংহভাগ যার অবদান তিনি জিয়াউর রহমান।

নারীর ক্ষমতায়ন এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে নারী তার নিজের অবস্থান বা আপেক্ষিক সামাজিক আত্মমর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হয়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানই সর্বপ্রথম নারীদের আপন শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা অর্জনের মধ্য দিয়ে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নারী-পুরুষ বৈষম্য দূরীকরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। মহান এ নেতার সূদুর প্রসারী চিন্তা ও পরিকল্পনা বাস্তাবায়ন হয়েছিল বিধায় নারী সমাজ আজ এর সুফলতা উপভোগ করছে। জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার স্বার্থে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অথনৈতির্ক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই নারীদের সামগ্রিক উন্নতির উপর বিশেষ জোর দেন। শুধু জিয়াউর রহমান নন, তার উত্তরসূরী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়াও পরবর্তীতে তার তিন (৩) মেয়াদে তাৎপর্যপূণঅবদান রেখেছেন।

মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় চালু

‘এ বিশ্বে যা কিছু মহান চিরকল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’- জাতীয় কবির এই অমর বাণীর প্রতি বিশ্বাস রেখেই জিয়াউর রহমান নারীদের উন্নয়নে প্রতিষ্ঠা করেন মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়। নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই শহীদ প্রেসিডেন্ট

জিয়াউর রহমান প্রথমবারের মতন দেশে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন। নারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের একক দায়িত্ব দিয়ে ১৯৭৮ সালের ১১ ডিসেম্বর মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। মন্ত্রণালয় শিশুদের লালন পালনের ইস্যু সমূহের দিকেও নজর দেয়। গঠিত হয় শিশুদের স্কুল বহির্ভূত বিভিন্ন কার্যক্রমে সহায়তাদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী। নারী সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় মহিলা সংস্থা। পরবর্তীতে শহীদ জিয়ার আমলেই মহিলা সংস্থার অধীনে মহিলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা করা হয়।

পুুলিশ বাহিনীতে নারীদের নিয়োগ

বাংলাদেশে পুলিশও আনসার বাহিনীতে নারীদের প্রথমবারের মত নিয়োগ দেন শহীদ জিয়া। তিনি অনুধাবন করেছিলেন ক্রমবধমার্ন অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণে ও নারীর ক্ষমতায়নে প্রশাসনের মূল ধারাতে নারীদের অংশগ্রহণ সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আজকে সেনাবাহিনীতে নারীরা যোগ দিচ্ছে। শুধু ডাক্তার বা নার্সহিসেবে নয়, সরাসরি যোদ্ধা হিসেবে, গোলন্দাজ বা কমিউনিকেশন ইউনিটে অফিসার হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত ১৯৮০ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া নিয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালের ৮ মার্চ পুুলিশ বাহিনীতে নারীদের নিয়োগ শুরু হয়। বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এটি ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত। নসারআ বাহিনী ও গ্রাম প্রতিরক্ষা দলেও নারীদের অন্তর্ভূক্ত করা হয় শহীদ জিয়ার নির্দেশেই।

দেশ পরিচালনায় নারীদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করণ

নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি করার জন্য এবং মহিলাদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার লক্ষ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল গঠন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি সর্বপ্রথম মহিলা রাষ্ট্রদূত ও মহিলা অডিটর জেনারেল নিয়োগ করেন। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ১৫ থেকে ৩০-এ উন্নীত করেন। মহিলাদের জন্য চাকুরির ক্ষেত্রে নন-

গেজেটেড পদে ১৫ শতাংশ এবং গেজেটেড পদে ১০ শতাংশ কোটা নির্ধারন করেন। শহীদ জিয়ার মন্ত্রীসভায় মহিলা মন্ত্রী ছিলেন একাধিক।

নারী কর্মক্ষেত্রের ব্যাপক প্রসার

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে সরকারি চাকুরিতে নারীদের জন্যকোটা সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করার প্রথম ঘোষণা দেয়া হয়। রাষ্ট্রীয় চাকরিতে নারীদের জন্য ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষিত রাখার বিধান করেছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনিই সর্বপ্রথম ১৯৭৮ সালের ৩ই নভেম্বর সরকারি চাকুরিতে মেয়েদের প্রবেশের বয়স সীমা ২৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করেন। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহন বাড়াতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেসব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয় সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি ছিল- সরাকারি প্রথমিক বিদ্যালয়সমূহে ৫০৮ জন নারী সহাকারী শিক্ষক নিয়োগ এবং ৫০ শতাংশ পদ নারীদের জন্য সংরক্ষিত করা, প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহের জন্য বর্ধিত সংখ্যায় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিক্ষক তৈরি, প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই) গুলোতে ১০-২৫ শয্যার নারী হোস্টেল নির্মান এবং নারী প্রশিক্ষণার্থীদের বইভাতা প্রদান। নারীদের কর্মসংস্থান পরিস্থিতির উন্নতির উপর জোর দেওয়ার ফলে ১৯৭৬ সালে সারাদেশে কর্মজীবি নারীর সংখ্যা দাড়ায় ২ কোটি ২৪ লাখ, যা ১৯৭৪ সালে ছিল ১ কোটি ৯২ লাখ।

খেলাধুলায় নারীদের অংশগ্রহন

নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে আরো একটি মাইলফলক হচ্ছে বাংলাদেশে মেয়েদের ফুটবল খেলাতে আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। মূলতঃ তাঁর সময় থেকেই

মেয়েদের আন্তঃস্কুল ফুটবল টুনামের্ন্ট চালু হয়।

যৌতুক বিরোধীআইন প্রনয়ণ

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে দেশে প্রথম যৌতুক বিরোধী আইন পাশ করা হয়। সমাজে নারীদের নিরাপত্তা এবং সামাজিক অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ১৯৮০ সালের ১২ই ডিসেম্বর দেশে যৌতুক বিরোধী আইন পাশ করা হয়।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, একাত্তরে সদ্য স্বাধীন দেশ ও পচাত্তরে বাকশাল থেকে মুক্ত বিধ্বস্ত একটা জনপদকে বিশ্বের মানচিত্রে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের মতোনারীদের অংশগ্রহন। আর এই উপলব্ধি বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন বিধায় আজকের বাংলাদেশে সরকারের সর্বোচ্চ পদ থেকে শ্রমজীবীদের কাতারে সর্বত্র, এমনকি সমাজের সর্বস্তরে মেয়েদের নির্ভীক পদচারণা নিশ্চিত হয়েছে। একেই বলে নেতৃত্বের কারিশমা এবং দূরদর্শীতা। পৃথিবীতে বাংলাদেশের মানচিত্র যতদিন থাকবে ততদিন ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নাম। তিনি মরেও আমাদের মাঝে অমর।


বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে প্রেসিডেন্ট জিয়ার অবদান

--------------------------------------------

অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডি

--------------------------------------------


স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে শক্ত ভীত রচনা করে গেছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভিষিক্ত হয়েই তিনি অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁর গৃহীত পরিকল্পনা ও কর্মসূচিতে কৃষির আধুনিকায়ন ও উন্ন্য়নকে অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি গতানুগতিক রাজনৈতিক ধারা থেকে দেশকে উৎপাদন ও উন্নয়নের রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। তার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহনকালীণ সময়ে এদেশের অর্র্থনীতি ছিল লুটেরাদের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত, বিধ্বস্ত ও ভঙ্গুর। তিনি ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত সাহসী, বাস্তব ভিত্তিক উন্নয়নমূলক নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহন করেন- যা ছিল খুবই চ্যালেঞ্জপূর্ন । জিয়ার গৃহীত নীতি  পরিকল্পনা  ও কর্মসূচি কিভাবে দেশের কৃষি উন্নয়ন ও  আধুনিকায়ন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে তা খুব সংক্ষেপে বিশ্লেষন করছি।

জাতীয় বীজ অধ্যাদেশ (Seed Ordinance) প্রণয়ন

সকল ফসলের মূল ও প্রধান উপকরণ হল বীজ।  ভাল বীজ মানে ভাল ফসল- রাষ্ট্রপতি জিয়া একজন বিজ্ঞানীর মতই এ কথা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন । তাই ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে বীজ অধ্যাদেশ  প্রণয়নের মাধ্যমে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী কর্মসূচী হাতে নেন । বীজ অধ্যাদেশ এর  মূল লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে কিভাবে খাদ্য ঘাটতি ও দারিদ্র্য দূর করা যায়। ফসলের মূল উপাদান বীজকে মানসম্পন্ন অবস্থায় কিভাবে কৃষকের দোর গোড়ায় পৌঁছানো যায় সে উদ্দেশ্য সফল করার জন্য বীজ অধ্যাদেশ  প্রণয়ন  করা হয়। বীজ অধ্যাদেশ   প্রণয়নের মাধ্যমে বীজ আমদানী, বীজ উৎপাদন থেকে শুরু করে বীজের বাজারজাতকরণ ও বিতরণের প্রতিটি পর্যায়ে ব্যক্তিখাতকে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেন ফলে ব্যক্তিখাতে বীজ শিল্পের উন্নয়নের সূচনা হয়। বীজ অধ্যাদেশ এর উল্লেখ যোগ্য বৈশিষ্ট্য হল- কৃষকরা বাজার থেকে বীজ কিনে যেন প্রতারিত না হয় তার ব্যবস্থা অর্থাৎ কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষন করা। বীজ অধ্যাদেশ প্রণয়নের মাধ্যমে কৃষকের মানসম্মত ভাল বীজ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বীজ শিল্প একটি বিকশিত ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এবং কৃষকের চাহিদা মেটাতে সরকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তিখাতও সমান ভাবে কাজ করছে । প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রনীত সেই বীজ অধ্যাদেশই আজ বে-সরকারী খাতে বাংলাদেশের বীজ শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে একটি মাইল ফলক হিসেবে কাজ করছে।

কৃষি সংস্কার কর্মসূচী

প্রেসিডেন্ট জিয়া কৃষির উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের জন্য কৃষকের হাতে উন্নতি প্রযুক্তি দ্রুত পৌঁছানো এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারনের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কৃষিতে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহন করেন । তিনি কৃষি উপকরন বিতরন ব্যবস্থা সংস্কার,  কৃষি উপকরন ব্যবসা উদারীকরন নীতি প্রনয়ন করেন । বীজের পরে ফসল উৎপাদনের প্রধান উপকরন হল- রাসায়নিক সার, সেচ ও সেচ যন্ত্র (এল,এল,পি, স্যালো টিউবওয়েল, ডিপ টিউবওয়েল), আধুনিক চাষ যন্ত্র (পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, রিপার, হার্ভেস্টার) ইত্যাদি । পূর্বে এ সকল উপকরন সংগ্রহ ও বিতরন বা সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হতো সরকারী প্রতিষ্ঠান যথা- পানি উন্নয়ন বোর্ড,  বি,এ,ডি,সি ও বি,কে,বির (বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক) মাধ্যমে। এই সংস্কার কর্মসূচি গ্রহনের মাধ্যমে জিয়া ক্ষুদ্র সেচ যন্ত্র, চাষ যন্ত্র, এবং সার বিতরন ব্যাবস্থায় আমুল পরিবর্তন নিয়ে আসেন । তিনি এই সংস্কার কর্মসুচির মাধ্যমে বেসরকারী খাতকে উৎসাহিত করে কৃষি উপকরন ব্যবসা  এবং উপকরন সরবরাহ ব্যবস্থায় সংযুক্ত করেন যেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীরা এর সুফল পায়। এই সংস্কার কর্মসূচী বাস্তবায়নের ফলে মাত্র দুই বছরের মধ্যেই কৃষির আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি সারা দেশে কৃষকদের মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই ধান উৎপাদন ৭৪-৭৫ সালে ১১.১১ মিলিয়ন টন থেকে ১৯৮০-৮১ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দŧাড়ায় ১৩.৬৬ মিলিয়ন টন। বর্তমানে কৃষকরা এই সংস্কার কর্মসুচির সুফল ভোগ করছে। (সুত্র ঃ বিবিএস, ২০১৮) 

খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্য শস্য সংগ্রহ অভিযান জোরদার করন কর্মসূচী

দেশের দরিদ্র জনগোষ্টীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য খাদ্যের  আপদকালীন মজুদ গড়ে তোলার উপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। এ কারনে তিনি নতুন খাদ্য গুদাম তৈরীর উদ্যোগ গ্রহন করেন যেন অতিরিক্ত উৎপাদিত ফসল গুদামজাত করে আপদকালীন মজুদ গড়ে তোলা যায় এবং প্রয়োজনের সময় খাদ্য বিতরন ব্যবস্থার (Public food distribution system)  মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ করে  দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।  কৃষদের শস্য উৎপাদনে উৎসাহিত করতে তিনি ভাল দামে তাদের কাছ থেকে সরাসরি ধান চাল ক্রয়ের ব্যবস্থা গ্রহন করেন। জিয়ার শাসনামলে (৮০-৮১) অর্থ বছরে ধান/চাল সংগ্রহ অভিযানে রেকর্ড পরিমান (১.০৩ মিলিয়ন টন)  চাল সংগ্রহ করা হয় (শাহাব উদ্দিন ও ইসলাম, ১৯৯১)। তাঁর শাসনামলেই ধানের বাম্পার ফলনের জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রথম চাল রপ্তানি করা হয়। 

খাল খনন কর্মসূচী

ষাট এর দশকের কৃষিতে যে সবুজ বিপ্লবের সূচনা হয় তার গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ হল সেচ । এই সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সহজলভ্য এবং টেকসই করার জন্য তিনি একটি যুগান্তকারী কমসূচী গ্রহণ করেন। শহীদ জিয়ার এই জনপ্রিয় কর্মসূচী হল খাল খনন কর্মসূচী। শুকনো মৌসুমে কৃষক যেন নদীনালা ও খালের পানি দিয়ে তার জমিতে প্রয়োজনীয় সেচের ব্যবস্থা করে ফসলের নিবীড়তা বাড়িয়ে এবং বর্ষা মৌসুমে ফসলকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ম্ভর করতে পারে- এই মূল লক্ষ্য নিয়ে তিনি খাল খনন কর্মসূচী গ্রহণ করেন। সমগ্র দেশে সে¦চ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে এই খাল খনন কর্মসূচীতে জনগণের সাথে তিনি নিজেও অনেক জায়গায় অংশ নিয়েছেন। কোদাল হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়া খাল কাটছেন এ ছবি এখনও মানুষের দৃশ্যপটে ভেসে আছে। দেড় বছরে সারা দেশে ১৫০০ এর বেশী খাল খনন ও পূনঃর্খনন করেন। প্রেসিডেন্ট জিয়ার এই বৈপ্লবীক পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশ স্বল্প সময়ের মধ্যেই খাদ্য উৎপাদনে স¦য়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। ভূগর্ভস্থ পানির সঠিক ব্যবহার নিয়ে তিনি একজন বিজ্ঞানীর মত চিন্তা করতেন। ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন কিভাবে বৃদ্ধি করা যায় সেটিও ছিল জিয়ার খাল খনন কর্মসূচীর অন্যতম লক্ষ্য। বর্তমানে কৃষি ব্যবস্থায় সেচের জন্য যে পানি ব্যবহার করা হয় তার ৮১% এর বেশী আসে ভূ-গর্ভস্থ উৎস থেকে, আর প্রায় ১৯% আসে নদীনালা, খাল-বিল ও বৃষ্টির পানি থেকে। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পানির স্তর আমাদের দেশে অনেক নিচে নেমে গেছে এবং অনেক স্থানেই Shallow Tube Well  দিয়ে পানি উত্তোলন করা যায় না, Deep Tube Well দিয়ে মাটির অনেক গভীর থেকে পানি উত্তোলন করতে হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত আহরণের ফলে বাংলাদেশের বিশাল এলাকার পানি ও মাটিতে আর্সেনিক দূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। ভবিষ্যতে সেচের পানির অভাবে কৃষি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। জিয়ার খাল খনন কর্মসূচী ছিল এদেশের কৃষকের জন্য বড় আশির্বাদ। 

 শস্য গুদাম ঋণ কর্মসূচী

দেশের মানুষ তথা দরিদ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠির খাদ্য নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে উনি বিশেষ কর্মপন্থা গ্রহণ করেন। শস্য সংগ্রহের সময় শস্যের দাম সাধারণতঃ কম থাকে আবার একই শস্য কিছু দিন পরে বেশী দামে কৃষককে কিনে খেতে হয়। কৃষক যেন শস্য সংগ্রহের সময় তার ফসল বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সেজন্য তিনি ১৯৭৮ সালে শস্য গুদাম ঋণ কর্মসূচী গ্রহণ করেন। এই কর্মসূচির আওতায় কৃষকরা উৎপাদিত খাদ্য শস্য গুদামে মজুদ রেখে স্বল্প সুদে ঋণ গ্রহন করতে পারে তার প্রয়োজন মেটানোর জন্য।  আবার মৌসুম শেষে বেশী দামে গুদাম জাত কৃত শস্য বিক্রি করে কৃষক তার ঋণ শোধ করতে পারে-  এতে কৃষকরা আর্থিক ভাবে লাভবান হয়। 

বিশেষ  কৃষি ঋণ কর্মসূচী (Special Agricultural Credit Program- SACP)

উচ্চ ফলনশীল প্রযুক্তি অধিক পুজি নির্ভর যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে বিনিযোগ করা কঠিন। সেজন্য কৃষকদের অধিক সুদে অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস হতে মূলধন সংগ্রহ করতে হতো । কৃষকদেরকে এ অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য তিনি ১৯৭৭ সালে ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ কৃষি ঋণ কর্মসূচী প্রনয়ণ করেন যা বাংলাদেশের কৃষি ঋণ প্রবাহে নতুনমাত্রা যোগ করে। এই কর্মসূচীর উদ্দেশ্য ছিল কোন ধরনের জামানত ছাড়াই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক যেন সহজেই কৃষিকাজের জন্য ঋণ সুবিধা পায়  এবং দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে ।

গ্রামীণ অর্থনীতি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে পল্লী বিদ্যুতায়ন কর্মসূচী

আধুনিক বিশ্বে  বিদ্যুতকে উন্নয়ন ও সভ্যতার একটি বড় নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭৭ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে তিনি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বা REB প্রতিষ্ঠা করেন যার দায়িত্ব হল গ্রাম অঞ্চলকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা। এই কর্মসূচীর উদ্দেশ্য হল- বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীন এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সম্প্রসারনের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন বৃদ্ধি করা যেন পল্লী এলাকার জনগণের জীবনমানের উন্নতি হয়। বৈদেশিক মুদ্রায় ডিজেল আমদানী করে সেচ পাম্প না চলিয়ে বিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্পের মাধ্যমে সেচ দিলে সেচ খরচ কমে যায়। বর্তমানে পল্লী বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে ৯৮% গ্রাম এবং ৫.০৮ মিলিয়ন কৃষি পরিবার বিদ্যুতের সুবিধা ভোগ করছে। বাংলাদেশে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এর প্রতিষ্ঠা ও এর উন্নয়ন তৃতীয় বিশ্বের জন্য অন্যতম একটি সফল ঘটনা। 

আত্মকর্মসংস্থান, ব্যক্তিগত উদ্যেক্তা তৈরী এবং বেকার সমস্যা সমাধানে যুব উন্নয়ন কর্মসুচী

দেশের শিক্ষিত-অশিক্ষিত যুব সমাজকে যেন উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যায় তার জন্য রাষ্ট্রপতি জিয়া গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচী হাতে নেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে যুব মন্ত্রনালয়  প্রতিষ্ঠা ও ১৯৮১ সালে যুব উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেন। যুব উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান লক্ষ্য বেকার যুবসমাজকে হাস মুরগী, গরু ছাগল লালন পালনের উন্নত কলা কৌশল, দুগ্ধ উৎপাদনের জন্য গাভী পালন, ডোবা, পুকুর, জলাশয়ে মৎস্য চাষ বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের মধ্য দিয়ে আতœকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দারিদ্র বিমোচন তথা দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। বর্তমানে দেশের আনাচে কানাচে দুগ্ধ খামার, পোল্ট্রি খামার, মৎস্য খামার গড়ে উঠেছে যেখানে বেকার যুবকরা কাজ করছে, দেশের ক্রমবর্দ্ধমান জনগোষ্ঠির পুষ্টির চাহিদা মেটাতে অবদান রাখছে। রাষ্ট্রপতি জিয়ার গৃহিত এই কর্মসূচি দেশে আতœকর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাক্তিগত উদ্যোক্তা তৈরী ও বেকার সমস্যা সমাধানের মধ্যে দিয়ে গুরুত্বপূর্ন অবদান রেখে চলেছে।

বিসিআইসি (Bangladesh Chemical Industries Corporation) প্রতিষ্ঠা ও সার কারখানা নির্মাণ 

বাংলাদেশের তিনটি সেক্টর কর্পোরেশনকে একিভূত করে তিনি ১৯৭৬ সালে বিসিআইসি  প্রতিষ্ঠা করেন । বাংলাদেশের সার কারখানা, কাগজ কারখানা-এর অন্তর্ভুক্ত। কৃষি বিপ্লবের ফলে দেশে সারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্য জিয়াউর রহমান নতুন সার কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেন। ১৯৮১ সালে তিনি আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন যার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৫,২৮,০০০ মেট্রিক টন। আরও কয়েকটি সার কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন যা তিনি দেখে যেতে পারেননি।

চিনি শিল্পের উন্নয়নে নীতিমালা প্রণয়ন

দেশে চিনি উৎপাদন বৃদ্ধি ও উপজাত ভিত্তিক পন্য উৎপাদন করা এবং আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশের চিনি শিল্পকে একটি শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করার জন্য গুরুত্বপূর্ন নীতিমালা গ্রহন করেন। ১ জুলাই ১৯৭৬ সালে বাংলাদশে সুগার মলিস্ করপোরশেন ও বাংলাদশে ফুড অ্যান্ড অ্যালাইড ইন্ডাস্ট্রজি করপোরশেনকে একীভূত করে বাংলাদশে সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রজি করপোরশেন গঠন করেন।

কৃষি গবেষণায় গুরুত্ব ও স্বায়ত্বশাসন

ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ অনান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নতুন শাখা, বিভাগ ও কেন্দ্র খোলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করেন। তিনি গমের আমদানী নির্ভরতা কমেিয় দেশেই গমের উৎপান বৃদ্ধির লক্ষে গম গবেষণার উপর গুরত্ব প্রদান করেন। জিয়ার সাশন আমলে ১৯৮০ সালের জুলাই মাসে নশিপুর, দিনাজপুরে গম গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়।  বাংলাদেশে বহুফসল নিয়ে গবেষণা করে এ রকম একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান হল বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, যেটি গাজীপুরে অবস্থিত। এটি পূর্বে Agriculture Directorate (Research & Education) এর অধীনে ছিল। তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৭৬ সালে Presidential Order No. LXII-এর বলে Bangladesh Agricultural Research Institute হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ, স্বতন্ত্র গবেষণা, বিভিন্ন ফসলের জাত উন্নয়ন ও উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও উদ্ভাবন, দেশের বিভিন্ন আবহাওয়া ও পরিবেশ অঞ্চলে খাপ খাওয়ানো উপযোগী জাত ও প্রযুক্তি উদভাবন ও উন্ন্য়ন, কৃষক প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য ম্যানডেট নিয়ে এই স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে স¦ায়ত্বশাসিত এই প্রতিষ্ঠানটি কৃষির উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করে চলছে। 

জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষি উন্নয়ন কার্যক্রমের অন্তর্ভূক্তি ছিল একটি সময়োচিত দৃঢ় পদক্ষেপ। তাঁর গৃহিত কর্মসূচী ও নীতিমালার সুফল মাত্র দুবছরের মধ্যেই দেশের মানুষ পেতে শুরু করে- যা দেশের সবুজ বিপ্লবকে ত্বরানিত করেছে। তাঁর উন্নয়ন কর্মকান্ডের ফলে খাদ্য ঘাটতির দেশ পরিণত হয় খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশ হিসেবে। তলা বিহীন ঝুড়ি খ্যাত দেশ এই রাখাল প্রেসিডেন্টের যাদুর হাতের স্পর্শে পরিণত হয় স্বনির্ভর বাংলাদেশে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও রাজনীতিকদের মধ্যে তিনিই অগ্রদূত যিনি দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে, মাঠে-ঘাটে, পায়ে হেঁটে ছুটে বেড়িয়েছেন কখনও লাঙ্গল হাতে, কখনও কাস্তে হাতে আবার কখনও কোদাল হাতে। রাখাল প্রেসিডেন্ট জিয়া কৃষকের মাঠে গিয়ে কৃষকের সাথে কথা বলেছেন, সমস্যা জেনেছেন, কৃষকের সাথে কাজে অংশ নিয়েছেন, কৃষকদের অনুপ্রাণিত ও জাগ্রত করেছেন।  অত্যন্ত সৎ, নির্লোভ ও দূরদর্শী এই রাষ্ট্রনায়কের ডাকে জনগন সাড়া দিয়েছিল ব্যপকভাবে। এ দেশের জনগণ তাঁকে প্রচন্ড ভালবাসত তার প্রমাণ আমরা পাই, ওনাকে সমাধিস্থ করার দিনে লক্ষ লক্ষ জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদন ও উপস্থিতির মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে, রাষ্ট্রপতি জিয়া যে ভিত এবং সোপান রচনা করেছেন সেকারনে তিনি  দেশের কৃষক, কৃষিবিদ এবং আপমর জনগণের কাছে চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবেন ।

  • লেখক শিক্ষক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ  এবং যুগ্ন আহবায়ক, এগ্রিকালচারিষ্ট আ্যসোসিয়েশন বাংলাদেশ (এ্যাব)। 

 


স্বাস্থ্য খাতে জিয়াউর রহমান ও বিএনপির অবদান

--------------------------------------------------------------------------------------

ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ও ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম

--------------------------------------------------------------------------------------

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞানুসারে স্বাস্থ্য মানে কেবল চিকিৎসা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নয়, বরং স্বাস্থ্যকে একটি অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে একটি পরিপূর্ণ শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতা নিশ্চিত করা। এ অবস্থানটির সূত্রপাত হয় ১৯৭১ সালে, হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয়ের বিশ্ববিখ্যাত রাজনৈতিক দর্শনের অধ্যাপক জন রল্সের ’সামাজিক ন্যায়বিচার’ ধারণার উন্মেষ থেকে। সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসন--এসব বিষয়কে জনমানুষের মুক্তির শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রণিধানযোগ্য যে, সেই সত্তরের দশকে ’সামাজিক ন্যায়বিচার’ শব্দটি একটি অ্যাকাডেমিক জার্গন হিসেবে তখনো বিশ^ব্যাপী পরিচিতি বা প্রতিষ্ঠা পায়নি। বর্তমানকালে জেরেমি করবিনের ব্রিটিশ লেবার পার্টি, বার্নি স্যান্ডার্স প্রভাবিত মার্কিন ডেমোক্র্যাটগণ এবং গোটা ইউরোপ বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয় দেশগুলোতে নব্য বামপন্থিগণ যেভাবে ’সামাজিক ন্যায়বিচারে’র ধারণাকে তাদের পার্টির মূলমন্ত্র বানিয়েছে, সেই সোভিয়েত-শঙ্কিত বিশ্বে তা তখনও ঘটে ওঠেনি। ভাবলে বিস্মিত হতে হয়, ইউরোপ আমেরিকার রাজনৈতিক অঙ্গনে যে আধুনিক চিন্তার অভিঘাত তখনো লেগে উঠতে পারেনি, সেটাই ঘটেছিল দক্ষিণ এশিয়ার সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশ বাংলাদেশে। আর তা ঘটেছিল এক অসাধারণ প্রজ্ঞাবান, বিশ্ব রাজনৈতিক-দর্শন সচেতন, গণমুখী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে।

বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ’সামাজিক ন্যায়বিচার’ অভিধার সংযোজনকে কোন কাকতালীয় ঘটনা কিম্বা অপরিকল্পিত বাগাড়ম্বর ভাবার কোন কারণ নেই। আমরা জানি, বাংলাদেশের তৎকালীন তো বটেই, সমসাময়িক রাজনীতিবিদদের তুলনায়ও শহীদ জিয়া ছিলেন উল্লেখযোগ্যভাবে প্রাগ্রসর চিন্তা চেতনার অধিকারী। তাঁর পড়াশোনা এবং জ্ঞানের পরিধিও ছিল ব্যাপক। ইংরেজিতে তুখোড় এ রাষ্ট্রনায়ক আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত বেস্ট সেলার গ্রন্থ জন রল্সের ’এ থিওরি অফ জাস্টিস’ পড়ে প্রভাবিত হয়ে তাঁর সময়ের তুলনায় বহু আগেই যে এমন একটি ধারণার সংযোজন বাংলাদেশের সংবিধানে ঘটাবেন, তা অসম্ভব মনে হয় না। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে যে অভূতপূর্ব সংস্কার তিনি সাধণ করেছিলেন, তা থেকে তাঁর এমন অগ্রগামী চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। বিশ^ব্যাপী সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় স্বাস্থ্য খাতে। কারণ, ১৯৭৮ সালের আলমা আতা ঘোষণার (যা ’প্রাইমারি হেলথ কেয়ার’ তথা ’২০০০ সাল নাগাদ সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল--একটু বয়সী পাঠকদের মনে থাকবে) আগ পর্যন্ত স্বাস্থ্য ছিল মূলতঃ পয়সাওলা মানুষদের ক্রয়যোগ্য পণ্যের মতো, ঠিক অধিকার নয়। সেখানে সামাজিক ন্যায়বিচার ধারণার প্রবর্তনের ফলে স্বাস্থ্য পেল গণমানুষের অধিকারের মর্যাদা। গৌরবের বিষয়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বকালীন বাংলাদেশ ছিল আলমা আতা ঘোষণার অন্যতম স্বাক্ষরকারী এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি উজ্জ্বল মডেল। তাঁর এবং পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার সময়কালে নেওয়া স¦াস্থ্যখাতের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে জনগণের স্বাস্থ্য সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত ২০০০ সালের মধ্যে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। পল্লীর জনগণ যেন সুচিকিৎসা পায় সেজন্য তিনি চীনের  ‘বেয়ারফুট ডক্টর’দের আদলে পল্লী চিকিৎসক ব্যবস্থা প্রবর্তণ করেন। ফলে মাত্র এক বছরেই প্রশিক্ষণ পান ২৭ হাজার পল্লী চিকিৎসক। তাঁর প্রচেষ্টায় সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া ও এ সংক্রান্ত অবকাঠামো উন্নয়নে আজকের বিশ্বখ্যাত জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ও হাসপাতাল (National Institute of Cancer Research and Hospital, NICRH)  প্রতিষ্ঠিত হয়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আগ্রহ ও ঐকান্তিক ইচ্ছায় বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ডায়রিয়া চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় অনন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর-বি। এটি কলেরা হাসপাতাল নামেও সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত। এছাড়া জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, নিপসম (NIPSOM: National Institute of Preventive and Social Medicine) এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি, ইপিআই (EPI: Expanded Program on Immunization) প্রতিষ্ঠিত হয় প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতাতেই। ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল ইপিআই থেকে বাংলাদেশে এক বছরের কম বয়সী সকল শিশুদের বহুল সংμামক রোগ যক্ষা, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, হাম, পোলিও-মায়েলাইটিস এবং মা ও নবজাতকের ধনুষ্টংকার রোগের টিকা দেওয়া শুরু হয়।

শহীদ জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন যে, আলমা আতা ঘোষণার আলোকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা (PHC)  বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্য হলো গ্রামীণ জনগণের স্বাস্থ্যের উন্নয়ন। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণের ধারনাটির প্রবর্তন এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ তিনিই প্রথম নিয়েছিলেন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গ্রামীণ জনগণের স্বাস্থ্য উন্নয়নে তৎকালীন থানা ডিসপেন্সারিসমূহকে আধুনিক থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উত্তরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন শহীদ জিয়া। ছয়টি উপজেলায় তিনি পরীক্ষামূলকভাবে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার পাইলট প্রজেক্ট উদ্বোধন করেন, যার হাত ধরেই বাংলাদেশ আজকে বিশে^র মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবকাঠামোগত নেটওয়ার্ক থাকার গর্ব করে। ১৯৭৭ এবং ১৯৭৯ সালে ডিরেক্টরেট অফ নার্সিং সার্ভিসের রিμুটমেন্ট রুলস বা নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের মাধ্যমে ডিরেক্টরেট অফ নার্সিং সার্ভিসেস প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৫ জানুয়ারি শহীদ জিয়া নার্সদের উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে দিতে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কলেজ অব নার্সিং যা তাঁর দূরদর্শীতার পরিচয় বহন করে। ভালো চিকিৎসক গড়ার পাশাপাশি ভালো নার্স তৈরির জন্য তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০টি নার্সিং ট্রেনিং সেন্টার। এছাড়া মেডিকেল অ্যাসিসটেন্ট ট্রেনিংয়ের জন্য ১৪টি মেডিকেল অ্যাসিসটেন্ট ট্রেনিং সেন্টার (MATS)  প্রতিষ্ঠা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা দেশপ্রেমিক জিয়া।

এছাড়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, পিজি হাসপাতালের সি-ব্লক, জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট (National Institute of Population Research and Training, NIPORT), হৃদরোগ ইন্সটিটিউট, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটসহ চিকিৎসকদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান বিএমএ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডার গঠন মহান নেতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আরেক কীর্তি। উক্ত ক্যাডার গঠনের মাধ্যমে তিনি চিকিৎসকবৃন্দকে জনগণের সেবায় নিয়োজিত এবং সুসংগঠিত বাহিনীতে পরিণত করেন। স্বাস্থ্য পরিচালকের (ডিরেক্টর অফ হেলথ সার্ভিসেস) পদকে স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের (ডিরেক্টর জেনারেল অফ হেলথ সার্ভিসেস) পদে উনড়বীতকরণ জিয়াউর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান, যা দুঃখজনকভাবে আজ আর বেশি মানুষ জানেনা বা উল্লেখ করেনা। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারও তাঁর শাসনামলে অনেক ইতিবাচক ভূমিকা রাখেন। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংখ্যা ৩১ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়, নতুন জেলা শহরে শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ এবং পুরানো জেলা শহরের হাসপাতাল ১০০ থেকে ২৫০ শয্যায় উনড়বীত করা হয় তার শাসনামলেই। বহু সংখ্যক হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যাম্বুলেন্স প্রদান করা হয়। এক বছরের কম বয়সী শতকরা ৮৫ ভাগ শিশুকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। তাছাড়া ১৯৯২ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজসহ পাঁচটি নতুন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০০৩ সালে ইপিআই থেকে মা ও শিশুদের হেপাটাইটিস রোগের টিকা দেওয়া শুরু হয়। সরকারি পদক্ষেপের কারণে দেশের শিশু ও মাতৃ-মৃত্যুর হার ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায় সেই সময়ে।

উল্লেখ্য, চিকিৎসকদের চাকরিতে নিয়োগদানের বয়সসীমা ৩০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩২ বছরে উন্নীত করে বিএনপি সরকার। এছাড়াও স্বাস্থ্য জনসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের প্রথম হিউম্যান রিসোর্স স্ট্র্যাটেজি প্রণয়ন করা হয় বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকালে, ২০০৩ সালে। এর বদৌলতে স্বাস্থ্য সেবাপ্রদাকারীদের দায়বদ্ধতা, কর্মদক্ষতা, নিয়োগ, জনসম্পদ তথ্য ব্যবস্থাপনা (হিউম্যান রিসোর্স ইনফরমেশন সিস্টেম) ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার রাস্তা খুলে যায়। ২০০৬ সালে ঢাকা ডিক্লিয়ারেশনের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয় অঞ্চলে স্বাস্থ্য জনসম্পদ উনড়বয়নের জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। একই সময়ে (২০০৬ সালে) বিএসসি নার্সিংয়ের জন্য অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়, যার ফলশ্রুতিতে বিএসসি নার্সদের চাকরি ও পেশাগত বিকাশের রাস্তা, যা দীর্ঘদিন আটকে ছিল, তা খুলে যায়। এর বাইরেও বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের শাসন আমলে গৃহীত ইমার্জেন্সি অবস্টেট্রিক কেয়ার (ইওসি) প্রজেক্ট প্রসূতি নারীদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ও মৃত্যুরোধে রাখে অনবদ্য অবদান। ১৯৯৫ সালের বাংলাদেশ ইন্টিগ্রেটেড নিউট্রিশন প্রজেক্ট (বিআইএনপি) পুষ্টির ক্ষেত্রেও রাখে অনুরূপ অবদান। তাঁর পরবর্তী শাসনামলে (২০০১ থেকে ২০০৬ সাল) ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট অফ চাইল্ডহুড ইল্নেস (আইএমসিআই) শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি উনড়বয়ন এবং শিশুমৃত্যু হ্রাসের জন্য বিশ^ব্যাপী প্রশংসিত হয়। এছাড়া মাতৃ ও শিশু শিশুমৃত্যু হার হ্রাসের জন্য ডিমান্ড সাইড ফাইন্যান্সিং স্কিমও বেগম খালেদা জিয়ার উভয় শাসনকালে স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ। দেশের মানুষ যেখানে স¦াস্থ্য ব্যয় নির্বাহে হিমশিম খায়, এই স্কিমের মাধ্যমে সেবাকেন্দ্রে আসা নারীদেরকে উল্টো প্রণোদনামূলক অর্থ প্রদান করা হয় যাতে তারা উন্নত সেবা নিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে আসতে আগ্রহী। তাঁর শাসনআমলগুলোতেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেটে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসা, স্বাস্থ্যনীতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি দরদ দিয়ে ভূমিকা রেখেছে বিএনপি। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রায় প্রত্যেকটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক বিএনপির অবদান। আমরা দেখেছি সেই আলমা আতা ঘোষণার আলোকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রণয়ন থেকে শুরু করে, ইপিআই, ইওসি, বিআইএনপি, আইএমসিআই পর্যন্ত যতগুলো আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য নীতিমালা রয়েছে, তার প্রায় প্রত্যেকটিই বিএনপির কোন না কোন শাসনামলে প্রণীত। আজকে বাংলাদেশ স্বল্প ব্যয়ে উনড়বত স্বাস্থ্য (Good health at low cost), প্রাথমি স্বাস্থ্য সেবা, ভ্যাক্সিন হিরো ইত্যাদি নানা অর্জন নিয়ে বিশে^র দরবারে গর্ব করে। এই সবই সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সামাজিক ন্যয়বিচার ভিত্তিক নীতিগত অবস্থানের কারণে। এ দলটি কেবল জাতীয় সংবিধানে সামাজিক ন্যয়বিচারের অভিধাটি যুক্ত করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তা স্বাস্থ্য খাতে বাস্তবায়ন করেও দেখিয়ে দিয়েছে, বিএনপি কেবল কথায় নয়, বরং কাজে বিশ্বাসী।






Sunday, May 30, 2021

অর্থনীতিতে শহীদ জিয়া ও বিএনপির ভূমিকা

-------------------------------------------------------------------

ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম ও ফারহান আরিফ

-------------------------------------------------------------------

টানা নয় মাস যুদ্ধের পর সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা ছিল ভয়াবহ রকমের ভঙ্গুর ও বিধ্বস্ত। এমন এক পরিস্থিতিতে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে প্রয়োজন ছিল একটি শক্তিশালী ও দূরদর্শী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণ করে মুজিব সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। ক্ষমতা গ্রহণ করে শেখ মুজিব বলেছিলেন, তিনি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চান। কিন্তু আদতে কোন ধরনের সমাজতন্ত্র তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তার কোনো নির্দেশনা ছিল না। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠাকরণে মুজিব সরকারে ঐ সময়ে কোনো অভিজ্ঞ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিও ছিলেন না। যার ফলে বিভিন্ন কল-কারখানা জাতীয়করণ করা হলেও সেটাকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার কোনো আবশ্যক বৈশিষ্ট্য ছিল অনুপস্থিত। 

যার ফলে অচিরেই মুজিব সরকারের এ পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে এক হিসাবমতে অন্তত দশ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটে;  চোরাকারবারি, মজুতদারি, কালোবাজারি ও লুটপাটের দরুন দেশজ অর্থনীতির এক ভঙ্গুর দশা দৃশ্যমান হয়। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান উপসামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন অবস্থাতেও জিয়া এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিজের কাছে রেখেছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় কাটিয়ে দেশকে পুনরুজ্জীবিত করার এক বিশাল গুরুভার বহন করেন। শহীদ জিয়া মিশ্র অর্থনীতিতে বিশ্বাস করতেন। তিনি ব্যক্তি ও সরকারি উভয় খাতকেই গতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সারা দেশের আনাচে- কানাচে লিফলেট আকারে বিমান থেকে ফেলে জিয়ার উন্নয়ন দর্শন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। শহীদ জিয়া বলতেন, বাংলাদেশ অর্থ হচ্ছে গ্রাম। বাংলাদেশের উন্নতির জন্য আমাদের গ্রাম ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন করতে হবে। তিনি মনে করতেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নকে শহর থেকে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত না পৌঁছাতে পারলে জাতীয় মুক্তি অসম্ভব। তাই তিনি সব সময় গ্রামমুখী অর্থনীতির কথা বলতেন। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার অনুসন্ধানে তিনি মাইলের পর মাইল গ্রাম্য মেঠোপথ হেঁটে বেড়িয়েছেন। ১৯৭৬ সালের ৬ ডিসেম্বর শহীদ জিয়া পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যবৃন্দ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সঙ্গে এক বৈঠকে তার অর্থনৈতিক উন্নয়ননীতির রূপরেখা তুলে ধরেন। তাঁর উন্নয়ন নীতিজুড়ে ছিল বিভিন্ন প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, গ্রামসমূহকে মৌলিক চাহিদা পূরণে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তোলা ও দেশের বিপুল জনশক্তির সুষ্ঠু ও যথাযথ ব্যবহারসহ বহুমুখী পরিকল্পনা। পরবর্তীতে এরই ধারাবাহিকতায় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ও ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার এ অগ্রযাত্রা অব্যহত রাখে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিকাশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গড়ে দেয়া ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এর বাস্তবায়নার্থে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর প্রতিষ্ঠাকাল থেকে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। বক্ষ্যমান প্রবন্ধে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শহীদ জিয়া ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। 

তৈরি পোশাকশিল্প রফতানিমুখীকরণ

প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলেই বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের হাঁটি হাঁটি পা করে যাত্রা শুরু, যা আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ। ১৯৭৮ সালের ৪ জুলাই তাঁরই উদ্যোগে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা নুরুল কাদের খান দক্ষিণ কোরিয় শিল্পগ্রুপ দেইউ-এর সঙ্গে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে যৌথ উদ্যোগে একটি শভাগ রফতানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা দেশ গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠা করেন। উভয় পক্ষে গৃহীত এক চুক্তির মাধ্যমে ১৩০ জন তরুণ-তরুণী দক্ষিণ কোরিয়ার পুসান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরাই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভিত ও এর মূল মানবসম্পদের ভিত গড়ে দেন। দক্ষিণ কোরিয়া শিল্পগ্রুপ দেইউ’র তৎকালীন চেয়ারম্যান কিম উ-চুং এর সঙ্গে দেশ গার্মেন্টসের মালিকের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে দেয়ার উদ্যোগ জিয়াউর রহমান নিজে গ্রহণ করেছিলেন। শহীদ জিয়া বাংলাদেশে রেডিমেড গার্মেন্টসের সূচনা এবং বিলম্বে দায় পরিশোধের ব্যাক টু ব্যাক এলসি প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি ১৯৭৮ সালে তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশের জন্য সর্বপ্রথম স্পেশাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ স্কিম চালু করেন। এই স্কিম চালু করার ফলে রফতানিকারকরা সরাসরি শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির অনুমোদন পায়। বর্তমানে এই শিল্পই দেশের অর্থনৈতিক হৃদযন্ত্রে সর্বাধিক রক্ত সঞ্চালন করে থাকে। শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সরকারি কল-কারখানায় তিন শিফ্টে কাজ শুরু হয় জিয়ার সময়েই। তিনি শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো এবং বছরে ছুটি ও বোনাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭৬ সালে তৈরি পোশাক শিল্প খাত বাংলাদেশের মোট রফতানির ০.০০১% অংশীদার ছিল, তা ২০০২ সালে এসে ৭৭% দখল করেছিল। তৈরি পোশাক শিল্প বিদেশে রফতানি করার জন্য যত প্রকারের সুযোগ-সুবিধা দেয়া দরকার, তা নিশ্চিত করা হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময়। সেই সময় বাংলাদেশে নারীদের প্রধান কর্মক্ষেত্র তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থান বাড়ে ২৯%। তিনি তাঁর শাসনামলে শুধু তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরও নতুন নতুন পণ্য রফতানির উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত করেন ।

VAT- সংযোজন

মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট VAT (Value Added Tax) বিংশ শতাব্দীতে উদ্ভাবিত একটি নতুন কর। দেশীয় পণ্য উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রয়, বিদেশি পণ্য আমদানি ও রফতানি সব ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর আরোপযোগ্য। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে করারোপ তদন্ত কমিশন কর্তৃক সরকারিভাবে বিক্রয় করের বিকল্প হিসেবে মূসক চালু করা হয়। ১৯৮২ সালে বিক্রয় কর অধ্যাদেশ জারি করে ১ জুলাই থেকে পূর্ববর্তী ‘বিক্রয় আইন ১৯৫১’ বাতিল করে নতুন আইন প্রতিস্থাপন করা হয়। দেশের মানুষের সামাজিক সুরক্ষায় কর ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার আনা হয় নব্বই-এর দশকের শুরুতেই, যোগ হয় ভ্যাট। অস্ট্রেলিয়া সরকারের অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান ডেইলি স্টারে তার একটি কলামে লেখেন, Saifur Rahman also understood that in order to invest in human capital, government revenue needed to rise. His solution was to rationalize the tax code, lowering the rate and broadening the base. The Value Added Tax, introduced in 1991, was a major milestone on this front. উল্লেখ্য, বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে ১৯৯১ সালের ১ জুলাই তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান সংসদে ‘মূল্য সংযোজন কর বিল ১৯৯১’ উত্থাপন করেন, যা ৯ জুলাই পাস হয়। বিলটি পরদিন রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করলে তা ‘মূল্য সংযোজন কর আইন ১৯৯১’ হিসেবে কার্যকর হয়।

যুব মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা

যুবসমাজকে সুসংগঠিত এবং উৎপাদনমুখী শক্তিতে রূপান্তর ও জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় অবদান রাখার জন্য জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে যুব মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় হিসেবে পুনঃনামকরণ করা হয়। যুবশক্তিকে বিভিন্ন অর্থপূর্ণ কাজে লাগানোর জন্য ‘যুব কো-অপারেটিভ কমপ্লেক্স’-এর ব্যবস্থা করেন। জেলায় জেলায় প্রতিষ্ঠা করেন যুব প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল ইনস্টিটিউশন (কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র)। আজ এখান থেকেই ট্রেনিং শেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বে বাংলাদেশের শ্রমিকরা চাকরি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে চলেছে। ১৯৭৮ সালের এক জরিপে জানা যায়, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশই যুবক। হতাশা, সন্ত্রাস, বেকারত্ব ও মাদকাসক্ত থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার শেরেবাংলানগরে দুদিনব্যাপী জাতীয় যুব সম্মেলন আয়োজন করে যুব সমাজকে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন।  

বিদেশে জনশক্তি রফতানি কার্যক্রম চালু

স্বাধীনতা-পরবর্তী দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশের উন্নয়নে দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশে^র নানা দেশে জনশক্তি রফতানির ব্যবস্থা করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, যুবকদের চাহিদা পূরণে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি খুবই জরুরি। দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলেই পরীক্ষামূলকভাবে কুয়েত ও সৌদি আরবে স্বল্পসংখ্যক শ্রমিক প্রেরণের মাধ্যমে বিদেশে জনশক্তি রফতানির ধারণাটি বাস্তব রূপ লাভ করেছিল, যা আজ দেশের অর্থনীতির মূল চাকায় পরিণত হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ শুরু হয়। আজ সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশের শ্রমিকদের যে শ্রমবাজার তৈরি হয়েছে তার মূল কৃতিত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের।

স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন

কৃষিপ্রধান অর্থনীতি এবং গ্রামপ্রধান দেশে যে কোনো বিপ্লবের সূচনা করতে হয় গ্রাম থেকে। ১৯৪১ সালে মাও সে তুং চীনে এভাবেই বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও গ্রাম থেকেই রাজনীতি শুরু করেছিলেন। মাঠের পর মাঠ এবং ক্ষেতখামার মাড়িয়ে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তিনি মাসের ২০ (বিশ) দিনই রাজধানীর বাইরে গ্রামে ছুটে বেড়িয়েছেন। ভিক্ষুকের হাতকে কর্মীর হাতে পরিণত করার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে একটি জাতীয় আন্দোলন হিসেবে ১৯৭৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর স্বনির্ভর বাংলাদেশ কর্মসূচির সূচনা করেন শহীদ জিয়া। পল্লীর সাধারণ মানুষের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য শহীদ জিয়ার আগ্রহে ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য কৃষকদের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ১০০ কোটি টাকার বিশেষ ঋণ বিতরণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। একজন কৃষক নির্ধারিত ঋণ পরিশোধ করে বছরে তিনটি ফসলের জন্য ঋণ নিতে পারতেন। এই কর্মসূচির বৈশিষ্ট্য ছিল ঋণ নেয়ার জন্য জমি ব্যাংকে বন্ধক রাখার প্রয়োজন হতো না এবং বর্গাচাষীসহ জমির মালিকও এ ঋণ নিতে পারতেন। ১৯৮০ সালের ১৪ জুলাই রাজবাড়ী, ফরিদপুরে গ্রামীণ কর্মী ও কৃষক সম্মেলনে শহীদ জিয়া বলেছিলেন, ‘গ্রামীণ জনগণের হাতেই বর্তমান শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের সাফল্যের চাবিকাঠি।...বছরে তিনটি ফসলের নিশ্চয়তা বিধান করে শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনই আমাদের লক্ষ্য নয়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহে সহায়তা করার জন্য রফতানি করার মতো উদ্বৃত্ত খাদ্যও আমাদের উৎপাদন করতে হবে।’ শহীদ জিয়া গ্রামীণ মহিলাদের মাধ্যমে পরিবারের ও দেশের উন্নয়নে ছোট ছোট কুটির শিল্প, হাঁস-মুরগি, মাছ চাষসহ আঙ্গিনা ভরে তুলতে চেয়েছিলেন বিভিন্ন বৃক্ষ বা সবজি দিয়ে। প্রেসিডেন্ট জিয়াই বাড়ির চারদিকে ফলফলাদি ও সবজি চাষ এবং রাস্তার দুপাশে ফলের গাছ লাগানোর জন্য গ্রামবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি দেশে ফ্রি মার্কেট ইকোনমি (মুক্তবাজার অর্থনীতি) চালু করেছিলেন। ফলে বাংলাদেশ অতি দ্রুত চরম দারিদ্র্য অবস্থা থেকে উঠে এসেছিল। এ প্রসঙ্গে ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের সুজান গ্রিন ঢাকা থেকে পাঠানো এক ডেসপাচে লিখেছিলেন, ‘সাম্যের প্রতীক ও সৎলোকরূপে ব্যাপকভাবে গণ্য জিয়াউর রহমান স্বনির্ভর সংস্কার কর্মসূচি শুরু করে বাংলাদেশের ভিক্ষার ঝুড়ি ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছেন।’ এছাড়া মালয়েশীয় দৈনিক ‘বিজনেস টাইমস’-এ প্রকাশিত ওই ডেসপাচে আরো বলা হয়, ‘অতীতে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত করেছিল যে মহামারি সমস্যাগুলো, প্রেসিডেন্ট জিয়া কার্যত সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ নভেম্বর ১৯৭৮)। এরই ধারাবাহিকতায় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও ডাল-ভাত কর্মসূচি, ছাগল-পালন কর্মসূচি ইত্যাদির মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জন শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ ব্লাকবেঙ্গল ছাগল পালনের জন্য সহজশর্তে ঋণদান কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য। উল্লেখ্য, বর্তমানে ব্লাকবেঙ্গল ছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ। বাংলাদেশের ব্লাকবেঙ্গল জাতের ছাগল বিশ্বের সেরা জাত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। 

কৃষিখাতে ব্যাপক উন্নয়ন

উন্নয়ন আর উৎপাদনে বাংলাদেশকে স্বনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ১০০ কোটি টাকা কৃষিঋণ চালু করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া। তিনি কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে ১৯৭৬ সালে খাল কাটা কর্মসূচিসহ নানামুখী স্বনির্ভর কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সংবাদদাতা মি. উইলিয়াম ব্র্যাংহ্যাম তাঁর ‘সোনার গাঁ’ নিবন্ধে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের দীর্ঘকালের খাদ্য রাজনীতি প্রেসিডেন্ট জিয়াই বন্ধ করতে পেরেছিলেন। তাঁর আমলেই দেশের মাটিতে খাদ্যশস্যের প্রাচুর্য দেখা দেয়।’ কৃষক-বন্ধু জিয়াউর রহমান আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তন করায় কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটে। যেখানে ১৯৭৪-৭৫ সালে সারাদেশে ধান উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ১১ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন, সেখানে ১৯৮০-৮১ সালে সমগ্র দেশে ধান উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন। ১৯৯১-৯৬ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও কৃষি খাত উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কৃষকদের ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা এবং সুদসহ ৫ হাজার টাকা কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়। এতে প্রায় ২৫ লাখ কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়। গ্রাম-গঞ্জে ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পোলট্রি ফার্ম গঠন করেন। বর্তমানে সারা দেশে কয়েক লাখ পোলট্রি খামার রয়েছে। এই শিল্পে কর্মরত আছেন ৬০ লাখ লোক যার অধিকাংশই শিক্ষিত বেকার তরুণ যুবক। ছাগল-পালন কর্মসূচি গ্রহণ করে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হয়। ২০০১ সালে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে বিএনপি সরকার আবারও কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্য প্রথম বছরেই ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। ২০০৪ সালে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৫০ লাখ প্রান্তিক কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ করা হয়। এছাড়া কৃষি খাতে ১০ শতাংশ ইনসেনটিভ দেয়াও ছিল এই শাসনামলের আরেকটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা

দার্শনিক রুশো বলেছেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও গৌরবমন্ডিত শিল্প হচ্ছে কৃষি’। বর্তমান পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোক কৃষিকর্মে  নিয়োজিত। বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদন্ডও হলো কৃষি যেখানে দেশের মোট শ্রমশক্তির ৫৮ ভাগ কৃষিতে জড়িত। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কৃষিকে বাংলাদেশের প্রাণ বলে অভিহিত করেন। কাজেই বাস্তবতার আলোকেই তাঁর সময় ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। বিভিন্ন ফসলের জাত উন্নয়ন ও উদ্ভাবন, টেকসই প্রযুক্তি উন্নয়ন ও উদ্ভাবন, কৃষি প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য ম্যানডেট নিয়ে যাত্রা শুরু করে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানটি।  সরকারি পর্যায়ে কৃষি কর্মকান্ডের সূত্রপাত মূলত এখান থেকেই।

খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্যশস্য গুদামজাতকরণ কর্মসূচি

দেশের দরিদ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখেই দরিদ্রের কন্ঠস্বর শহীদ জিয়া নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। শস্য সংগ্রহের সময় শস্যের দাম তুলনামূলক কম থাকায় এবং একই শস্য পরবর্তীতে বেশি দামে ক্রয় করায় কৃষক বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য তিনি ১৯৭৮ সালে শস্য গুদাম ঋণ কর্মসূচি চালু করেন। বাংলাদেশে ১৩০টিরও বেশি শস্যগুদাম আছে যেখানে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য মজুদ রেখে স্বল্পসুদে ঋণ নিতে পারে এবং মৌসুম শেষে বেশি দামে শস্য বিক্রি করে তা পরিশোধ করতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত উৎপাদিত ফসল গুদামজাত করে আপৎকালীন মজুদ গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শহীদ জিয়া সারাদেশে খাদ্য গুদাম তৈরি করেন।

সার কারখানা নির্মাণ

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে কৃষি বিপ্লবের ফলে দেশে সারের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়। ক্রমবর্ধমান সারের এ চাহিদা মেটাতে তিনি সার কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেন। ১৯৮১ সালে তিনি আশুগঞ্জ সার কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি আরও সার কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তা দেখে যেতে পারেননি।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ((BREB)) প্রতিষ্ঠা

আধুনিক বিশ্বের উন্নয়ন ও সভ্যতার অন্যতম মাপকাঠি হলো বিদ্যুৎ। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় আনতে শহীদ জিয়া ১৯৭৭ সালের ২৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে BREB (Bangladesh Rural Electrification Board) প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামাঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করাই ছিল এই কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বা ইজউই প্রতিষ্ঠা এবং এর উন্নয়ন ছিল তৃতীয় বিশ্বের জন্য অন্যতম এক মাইলফলক।

গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্প চালু

দারিদ্র্য বিমোচনের নানা উপায় ও কৌশল নিয়ে জিয়াউর রহমানের চিন্তা থেকেই টাঙ্গাইল জেলায় পরীক্ষামূলক ভাবে গ্রামীণ ব্যাংক ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প চালু হয়েছিল। গ্রাম্য এলাকায় ভূমিহীন দরিদ্রদের ঋণের ব্যবস্থা করতেই এর প্রতিষ্ঠা। কালের পরিক্রমায় সেটিই এখন গ্রামীণ ব্যাংক হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং নোবেল পুরস্কারও জয় করেছে। বর্তমানে বেশকিছু দেশ এ মডেল অনুসরণ করে কাজ করছে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় গঠন

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রবাসী শ্রমিকদের বিশাল অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিগত বিএনপি সরকার ২০ ডিসেম্বর ২০০১ তারিখে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় গঠন করে এবং বিদেশে বাংলাদেশের দুতাবাসসমূহ যাতে প্রবাসীদের কল্যাণে যথাযোগ্য ভূমিকা পালন করে তার নিশ্চয়তা বিধানের প্রচেষ্টা নেয়া হয়। বিদেশী কর্মসংস্থানের গুণগতমান বৃদ্ধি, কর্মী নিয়োগে মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের প্রতারণা ও তৎপরতা রোধ করে সচ্ছতা বৃদ্ধি ও দেশের সকল অঞ্চলের জনগণকে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে সুষম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চতকরণ ও প্রবাসীদের সামগ্রিক কল্যাণের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। 

বেসরকারি খাতের বিকাশ

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো বেসরকারি খাতের উন্নয়ন। ধ্বংসপ্রায় কারখানাগুলোকে বেসরকারিকরণ করেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। শিল্প-কারখানাগুলো ফিরে পায় প্রাণ, কর্মসংস্থান হয় লক্ষাধিক মানুষের। বেসরকারি খাতের উন্নয়ন ছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টেকসই করা সম্ভব নয়। তাইতো তিনি শুধু সরকারি খাতের বন্ধ কলকারখানাই চালু করেননি বরং বেসরকারি খাতের বিকাশেও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার জন্য ১৯৭৬ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ চালু করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে জাতীয়কৃত শিল্প-কারখানাকে বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করেন। ১৯৮০ সালে বিরাষ্ট্রীয়করণ আইন পাস করেন। এরই ধারাবাহিকতায় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ১৯৯৩ সালে প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড গঠন করে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকরের দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০১ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানাকে বেসরকারি খাতে নেয়ার জন্য প্রথম বাজেটে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়াও ছিল একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এছাড়া বেসরকারি খাতে বিদ্যমান দীর্ঘ ৩১ বছরের চিনি আমদানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ছিল বিএনপি সরকারের উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।

বৈদেশিক রিজার্ভ বৃদ্ধি

জিয়াউর রহমান তাঁর শাসনামলে দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে এক বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছিলেন। একটি গবেষণা রিপোর্টে দেখা যায়, ১৯৭৪-এ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৩৮.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ১৯৭৯-তে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩৭৪.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৯৮১-৮২ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল জিডিপি’র ০.৭% যা ১৯৯৩-৯৪ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৮.২% (দৈনিক দিনকাল, ৩০ মে ২০০২)। বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক রিপোর্ট থেকে সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের ০৬ (ছয়) মাসের শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল এদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম। তাই এ সময়ে টাকার দাম কমে যায়নি, জিনিসপত্রের দামও হঠাৎ বেড়ে যায়নি, যা আজকাল অহরহ পেপার-পত্রিকায় চোখে পড়ে। রিপোর্টে আরো দেখা যায়, ২০০১ সালে খালেদা সরকারের সময় তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৩০৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। উল্লেখ্য যে, বিএনপি সরকারের শেষের দিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৬১৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ঐ সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ। 

অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন

১৯৭৯ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, তিস্তা ব্যারেজ গড়বে এ দেশের প্রকৌশলীগণ। পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে নির্মাণ পর্যন্ত সব কাজই করেছেন আমাদের দেশীয় প্রকৌশলীগণ। স্কুল, কলেজ, সরকারি ভবন, সড়ক-মহাসড়ক, সেতু-কালভার্ট, বিদ্যুৎ, গ্যাসলাইন, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা প্রভৃতি অবকাঠামোগত খাতে বিএনপি সরকারের সময়ে ব্যাপক উন্নয়নসাধিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল ১৯৯৪ সালের ১৬ অক্টোবর যমুনা বহুমুখী সেতুর ভৌত নির্মাণ শুরু করা এবং প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতুর প্রায় ৭০% কাজ সম্পন্ন করা। মেঘনা-গোমতী সেতু নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাতায়াত নির্বিঘœ করা, চট্টগ্রামে একটি অত্যাধুনিক রেলস্টেশন নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য প্রকল্প গ্রহণ। দেশের সবক’টি প্রধান হাইওয়ের উন্নয়ন, বড় বড় নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণ, মুন্সীগঞ্জে ধলেশ্বরী সেতু নির্মাণ, কর্নফুলী নদীর ওপর তৃতীয় সেতু নির্মাণকাজে অগ্রগতি, পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও জাপানের অর্থ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রাপ্তি ও সম্ভাব্যতা যাচাই কাজের সমাপ্তি, সিলেট এয়ারপোর্টে নতুন দুুটি বিল্ডিং নির্মাণÑ এসবই হচ্ছে বিগত বিএনপি ও চারদলীয় জোট সরকারের ০৫ (পাঁচ) বছরে যোগাযোগ খাতে উন্নয়নের রেকর্ড। এছাড়া ঢাকায় স্থায়ী হাজি ক্যাম্প নির্মাণ করা হয় বিএনপি শাসনামলেই। টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার জন্য ৩০০ একরেরও বেশি জমি তবলীগ জামায়াতকে প্রদান করা হয়। 

ব্লু-ইকোনমি ও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে দেশ সমুদ্রকে যত বেশি ব্যবহার করতে পেরেছে, সে দেশ অর্থনীতিতে তত বেশি সমৃদ্ধশালী হয়েছে। খাদ্য উৎপাদন, খনিজ সম্পদ আহরণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সমুদ্রের ভূমিকা অপরিসীম। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরিকল্পনা ও উদ্যোগে ‘সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি’ ১৯৮১ সালের ১৯ থেকে ২১ জানুয়ারি দেশের সেরা ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী এবং একদল বিজ্ঞানীকে সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রগামী যাত্রীবাহী জাহাজ ‘হিজবুল বাহার’-এ চড়ে বঙ্গোপসাগরে একটি ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা সফরের আয়োজন করে। শহীদ জিয়ার এই সমুদ্র অভিযান বা শিক্ষা সফরের মূল উদ্দেশ্যও ছিল দেশের সেরা ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বঙ্গোপসাগরকে পরিচয় করিয়ে দেয়া; বঙ্গোপসাগরের সম্পদ ও সম্ভাবনাকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অবহিত করা এবং সমুদ্রবিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণ সংক্রান্ত গবেষণা কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। প্রেসিডেন্ট জিয়ার হাজারো কাজের মধ্যে এই কর্মসূচি ছিল একটি ক্ষুদ্র, অথচ দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কসুলভ কর্মসূচি। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট জিয়ার আগ্রহ ও নির্দেশেই সরকার সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, শিপিং মন্ত্রণালয়, মৎস্য অধিদপ্তর, জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ, পেট্রোবাংলা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্য বিজ্ঞান বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ‘জাতীয় কমিটি’ গঠন করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় খালেদা জিয়ার সরকারও তাঁর প্রথম শাসনামলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখেন। তিনি বঙ্গোপসাগরের জলদস্যুতা ও চোরাচালান হ্রাসে কোস্টগার্ড বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন।

দারিদ্র্য নিরসন

শহীদ জিয়ার জীবদ্দশার একটি বড় সময় কেটেছে এদেশের মানুষের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে। তাঁর পরিকল্পনা ছিল দারিদ্র্য দূরিকরণ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহের সাথে সামঞ্জস্য রেখে খালেদা জিয়ার সরকার মধ্য-মেয়াদি পরিকল্পনা হিসাবে একটি ‘দারিদ্র্য নিরসন’ কৌশলপত্র প্রণয়ন করেন। দারিদ্র্য নিরসনের জন্য বাজেট বরাদ্দের হার প্রতি বছরই বৃদ্ধি করা হয় এবং ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এর হিস্যা দাঁড়ায় মোট ৫৬ শতাংশ। পল্লী অঞ্চলের অতি দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য সরকার সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি সম্প্রসারিত করেছিল। দেশের উত্তরাঞ্চলে মঙ্গাপ্রবণ এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৫০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়েছিল সেই সময়ে। চরাঞ্চলে বসবাসরত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অবস্থার উন্নয়নে ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প (চর জীবিকায়ন কর্মসূচি) গ্রহণ করা হয়। এ সময়ে দেশের দারিদ্র্যের হার ০৯ শতাংশ হ্রাস পায়। 

সমাজের পশ্চাৎপদ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর কল্যাণে  বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়। বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা মহিলাদের মাসিক ভাতা ও সুবিধাভোগীর সংখ্যা উভয়ই বৃদ্ধি করা হয়। বয়স্ক ভাতা ও ভাতাগ্রহীতার সংখ্যা উভয়ই বাড়ানো হয়। এছাড়া দুঃস্থ মহিলাদের স্বাবলম্বী করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে ‘দুঃস্থ’ মহিলাদের ঋণদান কর্মসূচি চালু করা হয় সেই সময়ে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জন কেনেথ গ্যালব্রেইথ (১৯০৮-২০০৬) বলেন, In economics, hope and faith co-exist with great scientific pretension and also a desire for respectability. বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন চিন্তায় এর প্রতিফলন সুস্পষ্ট। জিয়া তাঁর যুগান্তকারী ১৯-দফা কর্মসূচিতে বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর যে চিন্তা ও চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন, আজ অবধি বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার মূলে তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একটি তলাবিহীন ঝুড়ি উপাধি পাওয়া দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে দৃঢ় প্রত্যয়ের প্রয়োজন ছিল প্রেসিডেন্ট জিয়া তা ধারণ করতেন। তারই দেখিয়ে যাওয়া পথ ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অতীতে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতিতে জোর দিয়ে এসেছে এবং আগামীতেও এ ধারা অব্যহত রাখবে বলেই জাতি প্রত্যাশা রাখে।




  •  লেখকদ্বয় গবেষক 

সঙ্কটকালে নেতৃত্বের করণীয় — শহিদ জিয়ার নেতৃত্ব থেকে শিক্ষা

-----------------------------------

—    ড এম আহমেদ 

-----------------------------------

রোববার ,মে, ৩০, ২০২১ জিয়াউর রহমান বীরউত্তম — স্বাধীনতার ঘোষক, বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট, সবচেয়ে সফল প্রেসিডেন্ট, সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের চল্লিশতম শাহাদৎবার্ষিকী I আল্লাহ আমাদের এই সৎ, দক্ষ, জনদরদী এবং ভিশনারি নেতার শাহাদৎ কবুল করে জান্নাত নসিব করুন।

জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে, সঙ্কটকালে আমাদের উচিত জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের বিচার বিশ্লেষণ করে সঙ্কট থেকে মুক্তির পথ বের করা I দেশ ও জাতির প্রতিটি সঙ্কটকালে জিয়াউর রহমান বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন এবং সঙ্কট থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চের কাল রাতের গণহত্যার পর পুরা জাতি যখন দিশেহারা, তখন ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’ বলে জাতিকে অন্ধকারে আলো দেখিয়েছেন, আশা জাগিয়েছেন, মনোবল যুগিয়েছেন।

 ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘Leader must be seen and heard’ - বিশেষ করে সঙ্কটকালে। 

মার্চ ২৭, ১৯৭১, রেডিয়োতে মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠস্বর শুনে জাতি যে উজ্জীবিত হয়েছিল, যার প্রমান অনেকের লেখায় পাওয়া যায়, তা থেকেই বুঝা যায় সঙ্কটকালে নেতার কথা বলা, যতদূর শুনিয়ে, যতজনকে শুনিয়ে, কথা বলা কতটুকু জরুরি। বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বকে এই বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে। তবে সেই সাথে এটাও মাথায় রাখতে হবে, তারা যেন ধারভাষ্যকার না হয়ে যান - কে কেমন, কী করছে, কী ঘটছে, এসব বর্ণনায় সীমাবদ্ধ না থাকেন, প্যাসিভ ভাষায় কথা না বলেন, এই করতে হবে, সেই করতে হবে, এই করা উচিত, সেই করা উচিত, তাদের বা ওদের এগিয়ে আশা উচিত। একটিভ ভয়েসে কথা বলতে হবে, ‘করব’ এই শব্দটা থাকতে হবে মুখে। তাদের কথায় যেন দিক নির্দেশনা থাকে, সঙ্কট থেকে মুক্তির স্পষ্ট ছবি ফুটে উঠে, দিনক্ষণ সুনির্দিষ্ট না হলেও মুক্তির একটা সময় সীমা যেন অনুসারীরা দেখতে পারেন সেই ভাষায় কথা বলতে হবে। 

১৯৭৫ এ আবার যখন এই জাতি সঙ্কটে পড়লো, ভোটাধিকার হারাল, বাক স্বাধীনতা হারাল, তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হল, হতাশাগ্রস্ত দেশে ভয়ানক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হল, তখোনো উদ্ধার করতে এগিয়ে এসেছেন জিয়াউর রহমান বীরউত্তম। দেশ যখন সর্বগ্রাসী সঙ্কটে - মানুষ খাদ্য সঙ্কটে, অর্থ সঙ্কটে, নিরাপত্তার সঙ্কটে, ‘আবার তোরা মানুষ হ’ নামের সিনেমা হওয়ার পটভূমি দেশে, তখন তিনি দেশের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন, মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। 

সঙ্কট মুক্তির পথ গণতন্ত্র, সঙ্কটে মুক্তির পথ বাক স্বাধীনতা। তাই বন্ধ করে দেওয়া গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ খুলে দিয়েছেন দ্রুততম সময়ে, বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়েছেন, বাক স্বাধীনতাও ফিরিয়ে দিয়েছেন, প্রবাসে থাকা শেখ হাসিনাকেও দেশে ফিরতে দিয়েছেন। তাই তো জিয়াউর রহমান ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, আওয়ামীলীগের পুনর্জন্ম দাতা এবং শেখ হাসিনাকে দেশে প্রত্যাবর্তনের সুযোগদাতা’।

সর্বব্যাপী সঙ্কটে দিশে হারা জাতিকে সঙ্কট থেকে মুক্তি দিতে জিয়াউর রহমান যে পদ্ধতিটি অনুসরণ করেছিলেন তা হচ্ছে, বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের পদায়ন করা এবং নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রীসভা এবং তাঁর সময় নিয়োগকৃত বিভিন্ন বিভাগের পরিচালকদের এবং নীতি নির্ধারকদের তালিকার দিকে নজর দিলে তা স্পষ্ট হয়ে যায়। আজকের সঙ্কটাপন্ন অবস্থা থেকে দেশকে উদ্ধার করতে হলে, ভোটাধিকার উদ্ধার করতে হলে, বাক স্বাধীনতা উদ্ধার করতে হলে, ফ্যাসিবাদ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হবে বিএনপিকে বিশেষজ্ঞদের দ্বারস্থ হতে হবে। একদিকে বিশেষজ্ঞদের চুলচেরা বিশ্লেষণে বিএনপির দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেগুলি দূর করার পথ বাতলে নিতে হবে, অন্য দিকে কিভাবে ফ্যাসিবাদী চিন্তা চেতনা থেকে ফ্যাসিবাদীদের মুক্ত করে দেশকে ফ্যাসিবাদের ভয়াল থাবা থেকে মুক্ত করা যায় তার পথ বাতলে নিতে হবে। জাতির এই সঙ্কটকালে জিয়াউর রহমানের চল্লিশতম শাহাদৎবার্ষিকীতে জিয়াউর রহমানের জীবন থেকে সঙ্কট থেকে উত্তরণের এই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে বিএনপি দ্রুততম সময় ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার করবে, বাকস্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করবে, দেশকে এবং দেশের মানুষকে ফ্যাসিবাদী ব্যক্তি, দল এবং চিন্তা চেতনা থেকে মুক্ত করবে এই প্রত্যাশা । 

  • লেখক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ। 


স্বাস্থ্যসেবায় শহিদ জিয়ার অমর কীর্তি

-----------------------------------

ড. জাহিদ দেওয়ান শামীম

-----------------------------------

১৯৭২- ১৯৭৫ —  বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিপরীতে ছিল একদলীয় বাকশাল, ছিল না মানুষের বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, চুরি-ডাকাতি, লুটপাট ও দুর্নীতি ছিল রন্ধ্রেরন্ধ্রে, গণবাহিনীর সাথে রক্ষীবাহিনীর যুদ্ধে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত খুন হত, পার্বত্য অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আস্ফালন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, নির্বাহী বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা ও সেনাবাহিনীসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিতর্কিত করা হয়েছিল। পাশাপাশি খাদ্য ও স্বাস্থ্য সেবার অভাবে সারাদেশে দুর্ভিক্ষ ও রোগবালাইয়ে মানুষের মৃত্যুসহ স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল। 

সব সেক্টরের এরকম বিভীষিকাময় ও ভয়াবহ অবস্থায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের হাল ধরেন। এই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, স্বনির্ভর, শক্তিশালী সমৃদ্ধ এবং আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মানুষের বাকস্বাধীনতা ফিরিয়ে দিলেন, বিচার, আইনশৃঙ্খলা, নির্বাচনী, নির্বাহী ও শিক্ষা বিভাগের সংস্কার ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেওয়া ও আধুনিকায়নের জন্য অনেক যুগান্তকারী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। 

স্বাস্থ্য সেক্টরে অবদান নিয়ে আলোচনার শুরুতেই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি ক্ষণজন্মা পুরুষ, ইতিহাসের মহান নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও রনাঙ্গনের যোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তমকে। স্বাস্থ্য সেক্টরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবিস্মরণীয় ও উল্লেখযোগ্য অবদান —  দেশে প্রথিতযশা ও স্বনামধন্য বেসরকারি চিকিৎসকদের মেডিকেল কলেজে শিক্ষক ও উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন - মেডিসিনের প্রফেসর ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, শিশু বিশেষজ্ঞ (ইউরোলজী) প্রফেসর ডা. আজিজুর রহমান, বারডেমের প্রফেসর ডা. মুহাম্মদ ইব্রাহিম, চক্ষু বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ । স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্যসেক্টরকে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা দুইটি অধিদপ্তরের ভাগ করেন। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোর ব্রিটিশ জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিলের স্বীকৃতিr ব্যবস্থা করেন। মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তিতে প্রেসিডেন্টের কোটা বাতিল করে মেধাভিত্তিক ভর্তির ব্যবস্থা করেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া। মেডিকেল কলেজে আমলা, রাজনীতিবিদ ও প্রফেসরদের স্বজনপ্রীতির শিক্ষার্থী মাইগ্রেশন বাতিল করে মেধাভিত্তিক মাইগ্রেশন পদ্ধতি চালু করেন। মেডিকেলের মেজর সাবজেক্ট গুলোতে (মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনী) সাব-স্পেশালিটি চালু করেন। তিনি মিডিল ইস্টসহ মুসলিম বিশ্বে দেশীয় চিকিৎসকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বিদেশে কর্মরত স্বনামধন্য দেশী চিকিৎসকদের দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের মেধাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। 

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে কলেরা (আইসিডিডিআরবি) হাসপাতাল, দক্ষ নার্স তৈরির লক্ষ্যে ৫ জানুয়ারি ১৯৮১ সালে মহাখালীতে নার্সিং কলেজ এবং ১৯৮১ সালের ৩ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট জিয়া জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। উনার প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় নিপসম, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান ও ইপিআই প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ৫০ শয্যার ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, পিজি হাসপাতালের সি-ব্লক, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটসহ চিকিৎসকদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান বিএমএ ভবন-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তিনি গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধিকরণের লক্ষ্যে ২৭৫০০ পল্লী চিকিৎসক নিয়োগের পাশাপাশি মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে কমিউনিটি স্বাস্থ্য সেবার জন্য গ্রামে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন এবং সদ্য পাশ করা তরুণ চিকিৎসকদের থানা হেল্থ কমপ্লেক্সে ৩ বছর কাজ করা বাধ্যতামূলক করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, স্বনির্ভর, শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস ও সূদরপ্রসারী চিন্তা ছিল। বাংলাদেশ নিজে পায়ে মাথা উচু করে দাঁড়াক এটা দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা মেনে নিতে পারেনি। এজন্যই ষড়যন্ত্রকারীরা ক্ষণজন্মা এই মহানায়ককে ১৯৮০ সালের ৩০মে রাতের আঁধারে কাপুরুষোচিত ভাবে হত্যা করে। যার ফলে, বর্তমানে গুম-খুন, ধর্ষণ, শাসকদলের সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দুঃশাসন ও লুটপাটের মাধ্যমে দেশ আবারো এক বিভীষিকাময় ও ভয়াবহ অবস্থায় মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জিয়াউর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে একটি জাতিকে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে উনার দর্শন ও আদর্শকে চিরদিনের জন্য স্তব্ধ ও শেষ করতে চেয়েছিল। যা কিনা সম্ভব হয় নাই। বর্তমান বিভীষিকাময় অবস্থার মধ্যেও কোটি কোটি জনতা মুক্তির জন্য জিয়ার দর্শন ও আদর্শ বুকে ধারন করে আছে। তাই, জিয়ার দর্শন ও আদর্শ বিশ্বাসী সকল দেশপ্রেমিক নাগরিকদের সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ ভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে সব ধরনের জাতিঘাতী এবং রাষ্ট্রঘাতী অপকৌশলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং মানষের ভোটাধিকার, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক মুক্তি ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে হতে হবে জয়ী । 

  • লেখক সিনিয়র সাইন্টিস্ট, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র। 


দফা দশ — দেশবাসীর জন্য ন্যূনতম চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা

--------------------------------- 

— জাকারিয়া চৌধুরী 

---------------------------------

শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম এর ঐতিহাসিক ১৯ দফা কর্মসূচিতে ১০ নম্বরে বলা ছিল ‘সকল দেশবাসীর জন্য ন্যূনতম চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা’। অর্থাৎ দেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা তিনি নিয়েছিলেন সেই প্রায় সাড়ে চার দশক আগে!

সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি কয়েকটি কার্যকর উদ্যোগ হাতে নিয়ে ছিলেন।  তিনি বেয়ারফুট ডাক্তার বা গ্রামডাক্তার কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। প্রতিটি গ্রামে সাধারণ মানুষ যাতে ন্যূনতম প্রাথমিক চিকিৎসা পায় তার জন্য লাখ লাখ গ্রাম ডাক্তার প্রশিক্ষণ ও পোস্টিংয়ের ব্যবস্থা করেন। 

স্বাস্থ্য ক্যাডার প্রবর্তন করেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম জোরদার করেন। ইউনিসেফ-এর সহযোগিতায় শিশুদের ঘাতক ব্যাধি নির্মূলে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ইপিআই প্রবর্তন করেন। ওরস্যালাইন বিতরণকে একটা সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিয়ে কলেরা-ডায়রিয়ার মহামারি রোধ করা হয় সেই সময়ে। 

নার্স, মিডওয়াইফ ট্রেনিং এর ব্যবস্থা নেয়া হয়। প্রতি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র স্থাপন এবং প্রতি থানায় (এখন উপজেলা) স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপন করেন। বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা হোমিও ও ইউনানি শিক্ষার ব্যবস্থা প্রসারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। প্যারামেডিক্স ও স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ জোরদার করেন। নতুন হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন, বেড বৃদ্ধি, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজন করেন। জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসা সেবাকে গুরুত্ব দিতে ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম, বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও এম এ মতিনের মতন লোকদের রাষ্ট্রক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণের শীর্ষস্তরে নিয়ে আসা। 

এই কথা আজ নিশ্চিত বলা যায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত্তি তিনি শক্তিশালীভাবে স্থাপন করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল প্রতিটি নাগরিকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা। জিয়াউর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে সেই অভিযাত্রাকে থামিয়ে দেয়া হয়। 

কোভিড নাইনটিন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার চরম দূর্বলতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছে। শহীদ জিয়ার অভাব অনুভব করছি। 

  • লেখক চিকিতসক ও ব্লগার। 


আপনি কি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে চিনতেন?

---------------------------------

আখতার-উল-আলম

---------------------------------


তুরস্কের অ্যাম্বাসেডর সাহেব আমাদের দূতাবাসে এসেছেন। বয়স্ক কূটনীতিক। অভিজ্ঞ এবং ঝানু। ১৯৮৬ সালের মার্চ মাসে ওআইসির একটা সম্মেলনে তুরস্ক সফরের সৌভাগ্য হয়েছিল আমার । আমি তখন দৈনিক ইত্তেফাকে। সে সময় এই ভদ্রলোকের সাথে কিছুটা পরিচয়। বাহরাইনে এসে তাকে তুরস্কের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পেয়ে সেই পূর্ব পরিচয়টা যেন নতুন করে পেলেই তিনি আমাদের বাসায় বা দূতাবাসে আসতেন। আমিও সময় পেলে তাঁর ওখানে গিয়ে আড্ডা দিতাম। আমার স্ত্রীও সময় পেলে তার বাসায় যেত। তার স্ত্রীও সময়ে অসমেয় আমাদের বাসায় এসে আমার স্ত্রীর ও মেয়ের সাথে সময় কাটাতেন। নাতিকে নিয়ে খেলতেন।

সেদিন মান্যবর রাষ্ট্রদূত মনে হলো হাতে সময় নিয়েই এসেছেন। নানা বিষয় নিয়ে চলছিল আলাপ আলোচনা। বাংলাদেশের কিছু কিছু পোস্টার তার সামনে। একখানা পুস্তকে শহীদ জিয়ার ছবিখানাই দেখছিলেন। এক সময়ে হঠাৎ করে বলে উঠলেন, এক্সেলেন্সি, যদি কিছু মনে না করেন, একটা আরজ জানাতে চাই। …. আপনি কি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের একখানা পোর্ট্টেট আমাকে দিতে পারেন?

আমি যাথাসমেয় তাঁকে ওই পোর্ট্টেট দেব, কথা দিলাম। সে সময়ে অ্যাম্বেসিতে দু’জন ফার্স্ট সেক্রেটারি ছিলেন। মোহাম্মদ শরিফুল আলম আর জমির উদ্দিন আহমাদ। খুব সম্ভব জমির সাহেবই রাষ্ট্রদূত সাহেবের কাছে জানতে চাইলেন, এক্সেলেন্সি, আপনি কি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে চিনতেন?

তুরস্কের মান্যবর রাষ্ট্রদূতের মুখে যেন ফুটে উঠল একটা বেদনার ভাব। বললেন, আমার জীবনের সে এক দুর্লভ স্মৃতি, বলতে পারেন আনন্দঘন অভিজ্ঞতা। আপনারা যে জিয়াউর রহমানকে চেনেন ও জানেন, আমার চেনাজানার জিয়াউর রহমান তার তা থেকে ভিন্ন, একেবারেই আলাদা। শুধু আপনার নয়, এটা তুরস্কের এবং গোটা মুসলিম উম্মহরও দুর্ভাগ্য যে, আমরা তাকে পেয়েছিলাম বেশিদিনের জন্য নয়। আমরা তাঁকে হারিয়ে কি যে হারিয়েছি, সেকথা বলে শেষ করতে পারব না। কেননা, তিনি এখনো ওআইসির নানা কর্মকাণ্ডে, ওআইসিতে তুরস্কের যোগদানের নেপথ্য নায়ক হিসেবে বিরাজ করছেন। অনেকেই জানেন না। কিন্তু বিষয়টির সাথে আমি ব্যক্তিগতভাবে জড়িত বলেই তার হারিয়ে যাওয়াকে আমি নিজের ক্ষতি বলে মনে করি। বেদনা বিধুর কণ্ঠে কথাগুলো শেষ করেন মান্যবর রাষ্ট্রদূত। তাঁর দু’চোখ অশ্রুভরা।

  • লেখক প্রখ্যাত সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাষ্ট্রদূত।


জিয়াউর রহমান মানেই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ

-----------------------------

—  তারেক রহমান 

-----------------------------


 

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, উদ্দেশ্যমূলক ও সুক্ষভাবে নানারকম ইস্যু তৈরী করে সমাজের সর্বস্তরে মানুষে মানুষে বিরোধ-বিভাজন তৈরী করে মানুষের ঐক্য বিনষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। স্বাধীন দেশের নাগরিকরা আজ পরাধীন।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আমরা সকলে বাংলাদেশী। এই মাটি আমাদের, এই মাটি থেকেই আমাদের অনুপ্রেরণা আহরণ করতে হবে। জাতিকে শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য। ঐক, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও কঠোর মেহনতের মাধ্যমেই তা সম্ভব।’

স্বাধীনতার ঘোষকের ৪০ তম শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার, মে ২৯, ২০২১, বিএনপি আয়োজিত এক ভার্চুয়াল আলোচনাসভায় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এসব কথা বলেন। তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে তাই এবার আরেকটি যুদ্ধের শপথ নিতে হবে। এবারের যুদ্ধ স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ, এবারের যুদ্ধ মাফিয়ামুক্ত দেশ গড়ার যুদ্ধ, এ যুদ্ধে আমাদের শ্লোগান দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরীর পরিচালনায় সভায় দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্যরা বক্তব্য দেন। সভায় বিএনপির জেলা-উপজেলার নেতারা এবং দলের অঙ্গসংগঠনের নেতারাও যুক্ত ছিলেন।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতার ঘোষককে হত্যা ছিল ৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পরাজিত অপশক্তির সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ। বাংলাদেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করার সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের অংশ। তাই স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর এই গর্বিত সময়ে দেখতে হচ্ছে সীমান্তে ফেলানীকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে কাঁটাতারে। যেন ঝুলছে অসহায় বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশকে আজ এতটাই অসহায় করে ফেলা হয়েছে দেশের মর্যাদার পক্ষে কথা বলায় স্বাধীন বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা কতিপয় কুলাঙ্গার আবরারদের মতো দেশপ্রেমিককে পিটিয়ে হত্যা করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। তারেক রহমান বলেন, পরদেশের স্বার্থ রক্ষায় নিজ দেশের মানুষকে হত্যা করার মতো স্বদেশী খুনি যখন তৈরী হয়ে যায় তখন বুঝতে হবে আবরার হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশে চলমান যে নির্মম বাস্তবতা, এটি হচ্ছে ৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সেই পরাজিত অপশক্তির ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের-ই কুফল।

তারেক রহমান বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব, এমন একজন নেতৃত্ব, যার পেশাগত কিংবা আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি কর্ম প্রতিটি পদক্ষেপ বিএনপির তথা জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতিটি নেতা-কর্মী গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করতে পারেন, অনুসরণ করতে পারেন ।

তারেক রহমান বলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ জিয়া আগন্তুক কোনো ব্যক্তি নন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে, আধুনিক বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ জিয়া একটি অনিবার্য নাম। শহীদ জিয়ার গৌরবগাঁথা আলোচনায় র্যাব-পুলিশের হুমকি ধামকি কিংবা আদালতের রায়ের দোহাই দেয়ার প্রয়োজন হয়না।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম সাধীনতা বার্ষিকীর বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত স্বাধীনতার ঘোষক জিয়ার লিখিত ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক নিবন্ধটিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনন্য দলিল উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ছাত্র জীবন থেকেই তরুণ জিয়া মন ও মননে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন লালন করেছিলেন। স্বাধীনতার জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রেখেছিলেন। শুধু ছিলেন সময়ের অপেক্ষায়।

‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক নিবন্ধে শহীদ জিয়া লিখেছেন, ‘সেই স্কুল জীবন থেকেই মনে মনে আমার একটি আকাঙ্খাই লালিত হতো, যদি কখনো দিন আসে তাহলে এই পাকিস্তানবাদের অস্তিত্বেই আমি আঘাত হানবো। সযত্নে এই ভাবনাটাকেই আমি লালন করতাম। অপেক্ষায় ছিলাম উপযুক্ত সময় আর উপযুক্ত স্থানের’ ।

তারেক রহমান বলেন, এ কারণেই দেখা যায় দেশে বিদেশে সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে জিয়াউর রহমানকে কোনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে হয়নি। স্বাধীনতার ঘোষণায় কোনো রকমের জড়তা ছিলোনা।

স্বাধীনতার ঘোষককে জানতে হলে, মানতে হলে, বুঝতে হলে অন্য কারো বিরোধিতা কিংবা কারো সঙ্গে তুলনা করার প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিটি যুগান্তকারী কাজের মধ্য দিয়েই শহীদ জিয়া স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল, বলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতাকামী মানুষের কাছে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে শহীদ জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা ছিল তূর্যধ্বনির মত।

আবার ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের সময় স্বাধীনতার ঘোষকের নেতৃত্বেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ তাই বাংলাদেশের পক্ষের শক্তির কাছে গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির কাছে জিয়াউর রহমান একটি সাহসের নাম জাতীয়তাবাদী শক্তির কাছে জিয়াউর রহমান মানেই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরো বলেন, দেশ আজ এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। দেশে সবচেয়ে ভুলুন্ঠিত মানবিক মর্যাদা। সবচেয়ে অবহেলিত বিবেকবোধসম্পন্ন গণতন্ত্রকামী মানুষ। গণতন্ত্র নির্বাসিত। গুম-খুন-অপহরণ এখন সাধারণ বিষয়ে পরিণত করে ফেলা হয়েছে। দেশে চলছে পুলিশী রাজ। পুলিশ এখন সেনাবাহিনীকে নিয়েও রং-তামাশা করছে। পার্লামেন্ট এখন যেন স্রেফ নাট্যশালা। বিচারালয়কে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি বিভাগে পরিণত করা হয়েছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি লুটপাট এখন ওপেন সিক্রেট।

মাদার অফ ডেমোক্রেসি বেগম খালেদা জিয়াকে দেশপ্রেমিক মানুষের ঐক্যের প্রতীক উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, খালেদা জিয়াকে বন্দি রেখে আওয়ামী লিগ ক্ষমতার মেয়াদ হয়তো কয়েক বছর দীর্ঘায়িত করেছে। কিন্তু কয়েকযুগ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। দেশ আজ দু’ভাগে বিভক্ত। একদিকে মাফিয়া চক্র অন্যদিকে গণতন্ত্রকামী জনগণ।

তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে হানাদাররা যেভাবে রাতের অন্ধকারে স্বাধীনতাকামী মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুম করেছিল হত্যা করেছিল একইভাবে স্বাধীন বাংলাদেশেও এখন আওয়ামী হানাদারবাহিনী গণতন্ত্রকামী মানুষকে রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে গিয়ে গুম-অপহরণ করছে, হত্যা করছে। লাঞ্চিত করছে, অপমান করছে।

সভায় আরো বক্তব্য বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরুদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এছাড়াও বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতা হাবিব উন নবী খান সোহেল, এম এ কাইয়ুম, ঢাকা জেলার ডা. দেওয়ান মো. সালাহউদ্দিন, চট্টগ্রাম মহানগরের ডা. শাহাদাত হোসেন, দক্ষিণের মোস্তাক আহমেদ খান, বরিশাল দক্ষিণের এবায়দুল হক চাঁন, রাজশাহী মহানগরের মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, খুলনা জেলার শফিকুল আলম মনা, রংপুর মহানগরের সাইফুল ইসলাম, ময়মনসিংহ উত্তরের অধ্যাপক একেএম শফিকুল ইসলাম, দক্ষিণের ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন, যশোরের অধ্যাপক নার্গিস বেগম, কুমিল্লা দক্ষিণের হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন, উত্তরের আখতারুজ্জামান সরকার, ফেনীর শেখ ফরিদ বাহার, হবিগঞ্জের জি কে গউস, সুনামগঞ্জের কলিমউদ্দিন আহমেদ মিলন, কক্সবাজারের শাহজাহান চৌধুরী, ফরিদপুরের সৈয়দ মোদারেস আলী ইছা, নওগাঁয়ের হাফিজুর রহমান, ঠাকুরগাঁওয়ের তৈমুর রহমান বক্তব্য দেন।

মির্জা আলমগীরের সভাপতিত্বে এবং প্রচার সম্পাদক শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও সহপ্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম আলীমের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন-কর্মের ওপরে স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বক্তব্য রাখেন।


শাহাদতবার্ষিকীতে বীরউত্তম জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

-----------------------------------------------------

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক

-----------------------------------------------------

শহীদ জিয়ার মূল্যায়ন


মানুষ মরণশীল; প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও মরণশীল ছিলেন। জীবন ও মৃত্যু মহান আল্লাহ তায়ালার হাতে; এখানে বান্দার হাত রাখার কোনো জায়গা নেই। মানুষ হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কোনো-না-কোনো দিন মারা যেতেন। পৃথিবীর বহু দেশের বহু রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী বা জাতীয় নেতা দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় আততায়ীর হাতে প্রাণ দিয়েছেন। আমাদের দেশে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, পরিবশগত কারণে শাহাদতবরণ করেছেন। কিন্তু তিনি স্মৃতিতে অমর। চট্টগ্রাম মহানগরের ষোলোশহরে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিয়ে, ২৬ মার্চ ১৯৭১-এর প্রথম প্রহরেই তিনি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২৭ মার্চ তারিখে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে, প্রথমে নিজের নামে ও নিজের দায়িত্বে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে একই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে পুনরায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস যাবত সেক্টর কমান্ডার এবং ফোর্স কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তথা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। অতঃপর একজন শৃঙ্খলামুখী অফিসার হিসেবে ১৯৭৫ এর ২৪ আগস্ট সকাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে চাকরি করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনী প্রধান হন। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব টলটলায়মান ছিল, তখন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সুদৃঢ়ভাবে, প্রত্যক্ষভাবে সেনাবাহিনীর এবং পরোক্ষভাবে পুরো জাতির হাল ধরেন। তিনি ছিলেন জনগণের হৃদয়ের মানুষ। তিনি ছিলেন কাজের মানুষ। সামরিক শৃঙ্খলাকে, সামরিক আবেগকে তিনি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিয়ে আসেন। তার রাজনৈতিক বিরোধীগণ, তার সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু বিশ্লেষণমূলক ব্যক্তিগণ বিনাদ্বিধায় বলবেন যে, জিয়াউর রহমান সমন্বয়ের রাজনীতি, সহনশীলতার রাজনীতি, সমঝোতার রাজনীতি ও বহুদলীয় রাজনৈতিক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। গবেষকগণ স্বীকার করেন যে, তিনি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তৃণমূল মানুষের অংশগ্রহণে বিশ্বাস করতেন, কঠোর শৃঙ্খলায় বিশ্বাস করতেন এবং নিজেকে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে রাখায় বিশ্বাস করতেন। তিনি তরুণ ও মেধাবীদের রাজনীতিতে আগ্রহী করে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। সবকিছু মিলিয়ে তিনি সেনাপতি থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়েছিলেন; তিনি বন্দুকের যোদ্ধা থেকে কোদালের কর্মী হয়ে দেশ গড়ার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছিলেন। মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর এবং তার সঙ্গীরা, নিজেদের প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, তারা জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে ভুল করেছিলেন।

বহিরাঙ্গন

জিয়ার দূরদৃষ্টিমূলক, রাষ্ট্রনায়কোচিত কর্মকাণ্ডের কারণে, বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে প্রথম পা রাখে; বাংলাদেশ পৃথিবীর জাতিগুলোর মিলনমেলায় নিজের নাম উজ্জ্বলভাবে প্রস্ফুটিত করে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান দেশগুলো, তাৎক্ষণিক প্রতিবেশী অমুসলমান দেশগুলো এবং বিশ্বের নেতৃত্ব প্রদানকারী পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সাথে, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। ১৯৮০ সালে ইরাক এবং ইরান-এর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল; উভয় পক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ওই যুদ্ধ নিরসনের লক্ষ্যে যে তিন সদস্যের তথা তিনজন রাষ্ট্রপ্রধানের কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেই কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। সর্বোপরি সবেমাত্র উদীয়মান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি চীনের সাথে যুগপৎ ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন তিনি।

দু’টি ঘটনার মোড়

জিয়াউর রহমান ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি, কাকুল থেকে কমিশন পান, ১২তম লং বা দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের একজন সদস্য হিসেবে। তার অন্যতম সতীর্থ (সামরিক পরিভাষায় কোর্সমেট) ছিলেন সফিউল্লাহ। ১৯৫৫ সালে কমিশন পাওয়ার সময় মেধা তালিকায় জিয়াউর রহমান ছিলেন জ্যেষ্ঠ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, জিয়াউর রহমান এবং সফিউল্লাহ উভয়েই গুরুত্বপূর্ণ সময়োচিত নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন; উভয়েই সেক্টর কমান্ডার এবং ফোর্স কমান্ডার ছিলেন। ১৯৭২ সালের এপ্রিলের কথা। জ্যেষ্ঠ জিয়াউর রহমানকে ডিঙিয়ে বা পাশ কাটিয়ে, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করা হয়েছিল কনিষ্ঠ সফিউল্লাহকে এবং জিয়াউর রহমানকে করা হয়েছিল সেনাবাহিনীর উপপ্রধান। আমার মূল্যায়নে, সে দিন সরকার একটি পেশাগত ৫ কৌশলগত ভুল করেছিল। ৩ বছর ৪ মাস পর, ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের ২৪ তারিখ, তৎকালীন মোশতাক সরকার, জিয়াউর রহমানকে সফিউল্লাহর স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন। তত দিনে সফিউল্লাহ সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে ৩ বছর ৪ মাস দায়িত্ব পালন করেছেন। জিয়ার সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আড়াই মাসের মাথায় সংঘটিত হয় ৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এর ঐতিহাসিক ঘটনা। জিয়াউর রহমান অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় জড়িত হওয়া শুরু করেন ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখ থেকে। আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম পদত্যাগ করায় তৎকালীন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। এই সময় থেকে, মৃত্যুর দিন পর্যন্ত, জিয়াউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বে ছিলেন।

ক্রসরোডে বা জংশনে জিয়াউর রহমান

দায়িত্ব নেয়ার পর জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে একাধিক বিষয়ে যথা প্রশাসনিক বিষয়ে, উন্নয়ন বিষয়ে, পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে, সামরিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তাকে কোনো-না-কোনো একটি মহাসড়ক বেছে নিতে হয়েছিল। এই কলামের পাঠকের চিন্তার সুবিধার্থে আমি উদাহরণস্বরূপ পাঁচটি অপশন বা বিকল্প যেটি সেই সময়ে জিয়াউর রহমানের সামনে উপস্থিত হয়েছিল সেগুলো এখানে লিখছি। তখন বাংলাদেশের সামনে বেছে নেয়ার জন্য রাস্তাগুলো ছিল নিম্নরূপ : (এক) উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পরিপূরক সড়ক অথবা, গণতন্ত্র ব্যতীত শুধু উন্নয়নের সড়ক। উল্লেখ্য, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত যে তত্ত্ব ও অভ্যাসগুলো সেগুলো হলো সততা বা অসততা, নীতি বা দুর্নীতি এবং সংযম অথবা লুটপাট। (দুই) মুসলিম বিশ্বের সাথে যথাসম্ভব সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রেখে বাকি বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন অথবা, মুসলিম বিশ্বকে অবহেলা করে বাকি বিশ্বের সঙ্গে দহরম-মহরম করা (তিন) বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক প্রতিবেশীদের প্রাধান্য দিয়ে বাকি বিশ্বের সাথে সম্পর্ক রাখা অথবা, প্রতিবেশীদের অবহেলা করে বাকি বিশ্বের সাথে দহরম-মহরম করা। (চার) শিক্ষানীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদিতে ধর্মীয় মূল্যবোধের উপস্থিতি রাখা অথবা, ধর্মীয় মূল্যবোধের উপস্থিতি না রাখা। ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সম্পর্ক নৈতিকতা, সামাজিক আচার-আদবের। (পাঁচ) দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কি বাকশালীয় তথা একদলীয় তথা সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির মডেলটি অব্যাহত রাখা হবে, নাকি বহুদলীয় উন্মুক্ত গণতন্ত্র পুনরায় চালু করা হবে? বাংলাদেশ কোন রাস্তাটা বেছে নেবে সেটি নির্ভর করছিল বাংলাদেশের তৎকালীন নীতি নির্ধারকমণ্ডলীর ওপর এবং সেই নীতিনির্ধারকমণ্ডলীর কর্ণধার ছিলেন জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। আমরা এখানে সবগুলো বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারছি না স্থানাভাবে। শুধু দু’টি বিষয় আলোচনা করব; যথা- বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সার্ক।

বহুদলীয় গণতন্ত্রের সিদ্ধান্ত

জিয়াউর রহমান বহুদলীয় রাজনীতিকে বাংলাদেশে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেন। যার ফলে আগে থেকেই পরিচিত বহু রাজনৈতিক দল নব উদ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কাজ শুরু করে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসের আগে তথা সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাকশাল নামক একক রাজনৈতিক দল কায়েমের আগে যে রকম আওয়ামী ছিল, সেই আওয়ামী লীগ পুনরায় কাজ শুরু করে। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের ফলে তখন একাধিক নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছিল যার মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তথা বিএনপি। বিএনপি জিয়াউর রহমানের অমর সৃষ্টি। তাই বলা হয়, জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথমে ছিলেন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট; ১৯৭৩-এর মার্চের নির্বাচনের পরও তিনি হয়ে যান প্রধানমন্ত্রী এবং এইরূপভাবে জানুয়ারি ১৯৭৫ পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করে গেছেন। জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু পুনরায় দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী হন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর, খোন্দকার মোশতাক প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশ চালান; মোশতাকই সামরিক শাসন জারি করে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছিলেন। মোশতাকের অপসারণের পর ৫ নভেম্বর ১৯৭৫ থেকে বিচারপতি সায়েম দেশ চালিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমানও রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার অব্যাহত রেখেছিলেন।

সার্ক বা দক্ষিণ এশিয়া সহযোগিতা সংস্থা

‘সার্ক’ মানে ইংরেজিতে সাউথ এশিয়া অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কোঅপারেশন। বাংলাদেশের জন্মে বা স্বাধীন আবির্ভাবে ভারতের ভূমিকা অনস্বীকার্য ও অনবদ্য। স্বাধীন বাংলাদেশের আবির্ভাবের কারণে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র আকারে ক্ষুদ্র হয়ে যায় এবং ভারতের সাথে পারস্পরিক শক্তির ভারসাম্য পাকিস্তানের বিপক্ষে যায়। অপরপক্ষে বাংলাদেশকে পাশে নিয়ে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত হেভিওয়েট শক্তিতে পরিণত হয়। ভারতের প্রভাব বলয় থেকে সসম্মানে বের হয়ে নিজের স্বাধীন সত্তা বিকশিত করার জন্য বাংলাদেশকে প্রস্তুত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। অপরপক্ষে ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ এবং পারস্পরিক উপকারিতার স্বার্থে ভারতের সাথে বাংলাদেশকে একটি হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেই হতো। এই চিন্তাটি ১৯৭৭ বা ১৯৭৮ বা ১৯৮০ সালে যেমন জিয়াউর রহমান মহোদয়ের মানসপটে প্রোথিত ছিল, তেমনই আজো আমি বা আমার মতো আরো কোটি মানুষের মনে প্রোথিত আছে। জিয়াউর রহমান তাই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি সহযোগিতামূলক সংগঠনের চিন্তা উপস্থাপন করেন। তার উদ্যোগে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ নামক প্রতিষ্ঠান তথা থিংক ট্যাংক বা চিন্তার আধার স্থাপিত হয়েছিল। তাদের মাধ্যমেই পররাষ্ট্রনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এইরূপ একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা জিয়া দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গের সামনে সফলভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। ফলে জন্ম নেই সার্ক। 

জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সর্বোত্তম উসিলা 

যারা জিয়াউর রহমানকে ভালোবাসেন, তাদের অনুভূতি হলো, জিয়াউর রহমান, ১৯ দফার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জন্য একটি ভিশন তুলে ধরেছিলেন। জিয়াপ্রেমিকদের অনুভূতি হলো, জিয়ার অনুসরণের মধ্যেই বিএনপির সাফল্যের চাবিকাঠি নিহিত। জিয়াউর রহমানের স্মৃতি কারো প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক সাফল্য কারো প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। এই দু’টি কথা আন্তরিকভাবে মেনে নেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই কলামের লেখক অর্থাৎ আমি নিজে একজন রাজনৈতিক কর্মী এবং ২০ দলীয় জোটের অংশীদার একটি দলের প্রধান। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে মনে করি, গত তেরো বছর যাবত বিএনপি নিজে কিছু ভুল করেছে এটা যেমন সত্য, তার থেকেও অনেক বড় সত্য হলো বিএনপির ওপর নির্যাতন নিপীড়নের খড়গ্হস্ত নেমে এসেছে। আমি মনে করি, বিএনপিকে ক্ষতিগ্রস্ত বা বিএনপিকে নির্মূল করা মানে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী ঘরানার রাজনীতিকে ক্ষতি করা বা নির্মূল করা। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি মনে করি, ধৈর্যের ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে বিএনপির অখণ্ডতাকে সুরক্ষা দিতে হবে; এই কাজে আমি একজন নিবেদিতপ্রাণ রাজনৈতিক সহযোগী হয়ে নিজেকে সৌভাগ্যমান মনে করি। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শ, রাজনৈতিক কারিশমা ও দেশ গঠনের আদর্শের ক্ষতি করার জন্য অতীতে বহু চক্রান্ত হয়েছে; বর্তমানেও যে হচ্ছে না তার কি কোনো গ্যারান্টি আছে? অতএব, সাধু সাবধান!

  • লেখক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি।