Search
Tuesday, December 30, 2025
খালেদা জিয়া: গৃহবধূ থেকে এক দৃঢ়চেতা নেত্রী
বিভেদ নয়, বিশ্বাস করি উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের রাজনীতিতে
২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস, খালেদা জিয়া তখন বিরোধীদলীয় নেতা, ওই সময় প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন তিনি। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন, বিভেদ-বিভ্রান্তির রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাস করেন না, তাঁর বিশ্বাস উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রের রাজনীতিতে। সাক্ষাৎকারটি প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়েছিল ২০০০ সালের মার্চে। রাজপথে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের পর রাষ্ট্রক্ষমতায়ও আসীন হওয়া খালেদা জিয়াকে বুঝতে সেই সাক্ষাৎকার প্রাসঙ্গিক এখনো। বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রয়াণে সাক্ষাৎকারটির নির্বাচিত অংশ পুনঃপ্রকাশ করা হলো।
মতিউর রহমান: আপনারা বলেন না কেন যে আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চাই, শান্তিপূর্ণ জমায়েত চাই। বোমা, ভাঙচুর, সন্ত্রাস—যেগুলো মানুষের ক্ষতি করে, সেগুলো আপনারা করবেন না।
খালেদা জিয়া : আমরা সব সময় বলেছি যে আমাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক। আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন, ৭ নভেম্বর (১৯৯৯ সালে, তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়) আমাদের যে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হয়েছিল, তাতে হামলা চালানো হলো, বোমা-টিয়ারগ্যাস মারা হলো। তারপর সচিবালয়ের সামনে আমরা বলেই দিয়েছিলাম যে আমরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেব। শান্তিপূর্ণভাবেই সেখানে সমাবেশ হচ্ছিল। দলের নেত্রী বক্তব্য দেওয়ার সময় দলের কোনো নেতা-কর্মী নিশ্চয়ই চাইবে না যে পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাক, নেত্রীর বক্তব্য অসম্পূর্ণ থেকে যাক বা নেত্রী বক্তব্য দিতে না পারুন। আমি বক্তব্য দেওয়ার সময় ছাদের ওপর থেকে বোমা, গুলি, টিয়ারগ্যাস মারা হলো। অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপরও সরকার আক্রমণ শুরু করল।
আমরা যে গণমিছিল করেছিলাম, বলা হচ্ছে, সেই গণমিছিল থেকে জনকণ্ঠ অফিসে হামলা করা হয়েছে। আমরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আমরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিয়েছি। কখনোই কোনো পত্রিকা অফিসে হামলা করা হবে, এটা আমরা বিশ্বাস করি না এবং আমরা তা করিওনি। বিশাল গণমিছিল দেখে সরকার ভীত হয়ে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি (২০০০ সালের) চার দল, সাত দলসহ পেশাজীবীদের নিয়ে যে গণমিছিল হলো, সেটিও ছিল বিশাল, তার ওপরও সরকার পরিকল্পিতভাবে হামলা করেছে। আমাদের কর্মসূচি যতই শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক হোক না কেন, তার ওপরই সরকার এখন আঘাত হানছে, হামলা করছে।
মতিউর রহমান: আমি আবার আপনাদের ঐক্যের কথায় ফিরে যাই। এই ঐক্য নিয়ে কিন্তু আপনার দলের নেতৃত্ব এবং কর্মী-সদস্যদের মধ্যেই হতাশা ও প্রশ্ন আছে। স্বাধীনতা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নেতা-কর্মীদের এই ঐক্যের ব্যাপারে অসন্তোষ আছে।
খালেদা জিয়া: আপনি যে কথাটা বলছেন, সেটা সঠিক নয়। পত্রপত্রিকায় এসব কথা লেখা হচ্ছে। কারণ, আমরা যখন যা কিছুই করি না কেন, সবার আগে চিন্তা করি দল নিয়ে। আন্দোলন বলেন, নির্বাচন বলেন, যেকোনো কর্মসূচিতেই আগে দলকে সম্পৃক্ত করতে হয়। আজ দেশের যে অবস্থা, তাতে সকলেই বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন করছে। কিন্তু আমরা মনে করি, আন্দোলনকে সত্যিকারভাবে জোরদার করতে হলে এবং যৌক্তিক পরিণতিতে নিয়ে যেতে হলে ঐক্যটা নিঃসন্দেহে প্রয়োজন। সে জন্য যার যার অবস্থানে থেকে আন্দোলন না করে আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করার জন্য ঐক্যের প্রয়োজন রয়েছে। পার্টিতে সকলে আলোচনা করেই আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কাজেই এ কথাটা সঠিক নয় যে এ নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা রয়েছে বা তাঁরা ব্যাপারটি পছন্দ করেননি বা ক্ষুব্ধ।
মতিউর রহমান: মানুষ তো এটা দেখে যে আপনি এরশাদের সঙ্গে ঐক্য করেছেন। এখন কত মিটিং-মিছিল করছেন। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে আপনি একসময় কত বক্তৃতা দিয়েছেন। আপনি তাঁকে হত্যাকারী বলেছেন, তাঁকে পাঁচ বছর জেলে আটকে রেখেছেন। আবার তাঁর সঙ্গেই এখন ঐক্য করলেন?
খালেদা জিয়া: কথা হলো, কখন আমি ঐক্য করেছি। তারা এখন বিরোধী দল। আমরা কথাগুলো আজ বলছি। সরকার গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে। সংসদে আমাদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। দেশের অর্থনীতি ধসে পড়ছে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আজ বিপন্ন হওয়ার পথে, মানুষের জানমালের কোনো নিরাপত্তা নেই, দেশে সন্ত্রাস বিরাজ করছে। দেশের এই সংকটাপন্ন অবস্থায় তারা সকলে আন্দোলন করছে, একটা অবস্থান নিয়েছে। তারাও সংসদে আছে। বিরোধী দলের নেত্রী কথাটা বলা হলে সংসদের বিরোধী দল হিসেবে তারাও নিশ্চয়ই এসে পড়ে। বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে তো আমার একটা ভূমিকা রয়েছে, একটা দায়িত্ব রয়েছে। সে জন্যই এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী ও জোরদার করার জন্য তারা যদি আমাদের সঙ্গে আসতে চায় এবং আমরা যেসব ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করছি তারাও যদি সেসব নিয়ে আন্দোলন করতে চায়, তাহলে তাদের সঙ্গে রাখা আমরা প্রয়োজন মনে করেছি।
মতিউর রহমান: একই কৌশল তো আওয়ামী লীগও নিয়েছিল। এ নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। আপনারাও অনেক সমালোচনা করেছেন। এখন কী বলবেন?
খালেদা জিয়া: আমাদের সময় আর তাদের সময়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। আমাদের সময় যে ইস্যুগুলো এসেছে, সে ইস্যুগুলো তখন ছিল না। আমাদের সময় দেশের উন্নয়ন হচ্ছিল, দেশের অর্থনীতি ভালো ছিল, দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে লেখাপড়া হচ্ছিল। শিক্ষার ওপর আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলাম। বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। আমাদের সময় স্বাস্থ্য খাতে যথেষ্ট টাকা বরাদ্দ করেছিলাম, আইনশৃঙ্খলা ভালো ছিল, নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা হয়েছিল, উৎপাদন বাড়ছিল, বাড়ছিল রাজস্ব আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভালো ছিল; মোট কথা দেশের সবকিছু সুন্দর ছিল। বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য কোনো ইস্যু না পেয়ে আওয়ামী লীগ তখন শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যু নিয়ে মাঠে নামল। সে জন্যই বর্তমান অবস্থা আর তখনকার অবস্থা এক নয়।
মতিউর রহমান: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তো আপনি শেষ পর্যন্ত মানতে বাধ্য হলেন।
খালেদা জিয়া: মেনেছি, যেহেতু আমরা দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা চাই, যেহেতু উন্নয়নের যে ধারা আমরা শুরু করেছি, যেভাবে উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছি, তা আমরা ব্যাহত বা বিনষ্ট হয়ে যেতে দিতে চাইনি। কিন্তু আমরা বলেছি, সেটি হতে হবে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। তারা বলেছিল হুট করে দিয়ে দিতে। আমরা বলেছি, সেটা তো সংবিধানে নেই, আমরা সেটা করতে পারি না। এ জন্য তাদের বলেছি, সংসদে আসুন, আলোচনা করুন। আলোচনার মাধ্যমে সময়মতো সে জিনিসটা হবে। কিন্তু তারা হঠাৎ সংসদ থেকে চলে গেলেন। একসময় সংসদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দিলেন, যে জন্য সেটা করা যায়নি। আমরা আমাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই সেটা করেছি এবং আমরা সংবিধানকে সংশোধন করেই সেটা করেছি।
মতিউর রহমান: জামায়াতের সঙ্গেও আপনাদের আগে সমঝোতা ছিল, মাঝে ছিল না। আবার তাদের সঙ্গে ঐক্য করলেন। আপনিই কিন্তু তাদের স্বাধীনতাবিরোধী বলে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন।
খালেদা জিয়া: জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন করে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবেই জাতীয় সংসদে আসে। তখন তাদের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা এবং একটা যোগাযোগ ছিল। আওয়ামী লীগ তখন ছিল বিরোধী দলে। আওয়ামী লীগের সঙ্গেও আমাদের একটা সম্পর্ক ছিল এবং সে সম্পর্ক আমরা চেয়েছি। আমরা একত্রে সংবিধান সংশোধন করেছি। যে গণতন্ত্রের জন্য আমরা এত দিন আন্দোলন করেছি, সংগ্রাম করেছি, তা আরো শক্তিশালী করার জন্য আমরা সকলকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করেছি।
মতিউর রহমান: আওয়ামী লীগও বলত, যারা সংসদের ভেতরে, তাদের নিয়ে ঐক্য করেছিল। তারপরও আপনারা অনেক সমালোচনা করেছিলেন।
খালেদা জিয়া: আওয়ামী লীগ সংসদে তাদের নিয়ে যে ঐক্য করেছিল, তার তো কোনো ইস্যু ছিল না। তাদের ইস্যু ছিল বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে এবং ক্ষমতায় যেতে হবে। সে জন্যই তারা জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য করেছিল।
মতিউর রহমান: দেশে বিএনপির একটা শক্তিশালী অবস্থান আছে। এই ঐক্য না করে আপনারা একক থাকলে এবং একটা মধ্যপন্থী দল হিসেবে দাঁড়ালে তো আপনারা আরও এগোতে পারতেন—এটা কি আপনার মনে হয় কখনো? আপনি যেটা আশির দশকে করতেন, একদিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে একমঞ্চে যাননি, আবার অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও ঐক্য করেননি, এক প্ল্যাটফর্মে যাননি, এককভাবে আন্দোলন করেছেন বা চলেছেন। বিএনপি একটা মধ্যপন্থী দল হিসেবে থাকতে পারলে কি সেটা দলের ভালো হতো না?
খালেদা জিয়া: বিএনপি কিন্তু নিজের অবস্থানেই আছে। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে সরিনি। আমি আগেই বলেছি যে আমরা এককভাবেই আন্দোলন শুরু করেছিলাম। আমরা আন্দোলন শুরু করার পর তারাও তাদের অবস্থান থেকে আন্দোলন শুরু করল। আমরা দেখলাম, আমাদের ইস্যুগুলো নিয়েই তারা সকলে আন্দোলন করছে এবং জাতীয় সংসদে তাদের প্রতিনিধি রয়েছে। তারা বলছে, আমরা বিরোধী দল এবং বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে আপনার সঙ্গে এক হয়ে আন্দোলন করতে চাই। আমরা দেখলাম, আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সারা দেশে বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন হচ্ছে, বিভিন্ন দল আন্দোলন করছে, দেশের মানুষও সেটি চায়, আন্দোলনই যখন হচ্ছে, তখন সে আন্দোলন ঐক্যবদ্ধ হলে সফলতা আরও তাড়াতাড়ি আসবে এবং আন্দোলনের গতি আরও বাড়বে।
মতিউর রহমান: আশির দশকের মতো যুগপৎ আন্দোলন করতে পারতেন।
খালেদা জিয়া: হ্যাঁ, যুগপৎ আন্দোলন হতে পারত। আমরা তো সেভাবে শুরু করতে করতেই আজ এ পর্যায়ে এসেছি।
মতিউর রহমান: প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় হরতাল নিয়ে আপনিও অনেক কথা বলেছেন। আমাদের মনে আছে, বিরোধী নেত্রী হিসেবেও চট্টগ্রাম চেম্বারের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এক আলোচনায় আপনি বলেছেন, সরকার যদি বলে যে তারা বিরোধী দলে গেলে হরতাল করবে না, তাহলে আমরাও তা বিবেচনা করব। পরে প্রধানমন্ত্রীও সম্পাদকদের সামনে বলেছেন, ‘ঠিক আছে, আমরা বিরোধী দলে গেলে হরতাল করব না।’ তখন আপনি বললেন যে না, এটা হবে না। লোকে মনে করল, যেকোনো উপায়ে সরকারের উৎখাতই আপনার লক্ষ্য।
খালেদা জিয়া: আমি সব সময় বলেছি। আমি যখন সরকারে ছিলাম তখনো হরতালের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। আমি বিরোধী দলে থেকে হরতাল করছি। তারপরও আমি বলছি, হরতাল করাটা দেশের জন্য, অন্ততপক্ষে দেশের অর্থনীতির জন্য সহায়ক নয়। আমরা হরতাল করতে চাই না। কিন্তু আমরা কখন হরতাল করছি? যখন নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচিগুলো পালন করতে পারছি না। আমি একসময় বলেছিলাম, কিন্তু সরকার সে সময় সাড়া দেয়নি। আমিই প্রথম গার্মেন্টস শিল্পকে হরতালের আওতার বাইরে রাখা শুরু করেছি। আমাদের সময় আওয়ামী লীগ যখন হরতাল করেছে, তখন গার্মেন্টস মালিকেরা তাদের কাছে গিয়েছিল অন্তত গার্মেন্টস শিল্পকে হরতালের আওতার বাইরে রাখার জন্য। তারা সেটাও করেনি, কিন্তু আমি করেছি। এখন তারা চাপে পড়ে বলতে বাধ্য হচ্ছে, হরতাল করব না। তাদের বিশ্বাস করা যায় না। কারণ, তারা অতীতে বহু কথাই বলেছে কিন্তু কোনোটাই রাখেনি।
মতিউর রহমান: সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে অবস্থা এখন যা দাঁড়িয়েছে, সেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথই কি এখন নেই? এই যে বিভেদ, সংঘাত-এর থেকে বের হয়ে আসার কোনো চেষ্টা কি হতে পারে না? বাইরের কেউ সে চেষ্টা করতে পারেন কি না? এ সম্পর্কে আপনার কোনো প্রস্তাব আছে? যেমন ধরুন, আপনি যদি বলেন, ঠিক আছে, সুশীল সমাজ এটা করতে পারে, বা বুদ্ধিজীবীরা এটা করতে পারেন, এমন কিছু আছে কি না যা করা যায়, বা কোনো পথ আছে কি না যেটা খুঁজে দেখা যায়?
খালেদা জিয়া: সমস্যা তো সৃষ্টি করেছে সরকার। যে সমস্যাগুলো হয়েছে, যার জন্য আমাদের মধ্যে এত দূরত্ব বেড়েছে, সেই দূরত্ব কমিয়ে আনার দায়িত্ব তো সরকারে যে আছে তারই। সমস্যার সমাধানের জন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু সরকার সে উদ্যোগ নিচ্ছে না এবং তাতে তাদের কোনো আগ্রহও নেই। সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত না আগ্রহ প্রকাশ করবে, ততক্ষণ যিনিই উদ্যোগ নিন না কেন, তা কার্যকর হবে না।
মতিউর রহমান: বিরোধী দলেরও তো কিছু দায়িত্ব আছে। বিরোধী দলকে কিছু বললেই বলা হয়, সরকার কিছু করল না। আপনারা তো একটা উদ্যোগ নিতে পারেন?
খালেদা জিয়া: আমরা তো উদ্যোগ নিয়েছিলাম। যার জন্য দুই দফা চুক্তি হলো। সেই চুক্তিটা তো রক্ষা করা হলো না। উদ্যোগ নিয়েছিলাম বলেই তো আপনারা নতুন কর্মসূচি দেখেছেন, যা আগে কেউ করেনি, আমরা রোডমার্চ শুরু করেছিলাম। সরকার দায়িত্বহীনভাবে যমুনা সেতুর ওপর দিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করল।
আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা সেখানে যাব। যত দিন না খোলে, তত দিন আমরা ওখানে অবস্থান করব। আমরা বললাম, উত্তরাঞ্চল অচল হয়ে যাবে এবং চট্টগ্রামসহ এ অঞ্চল অচল হয়ে যাবে। তখন সরকার দেখল যে এটা বোধহয় সঠিক হবে না। বাধ্য হয়ে তারা বলল, ‘ঠিক আছে, কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায়, সে নিয়ে আলোচনা করি।’
উদ্যোগী না হলে তো আমরা যেতাম না। শান্তি চাই বলেই আমরা আলোচনা করেছি। আপনারা দেখেছেন, অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে আমরা যমুনা সেতু পার হয়েছি। এরপর কী হলো, তা আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে বিবৃতি দিলেন, কোনো দায়িত্বশীল নেতা বা মন্ত্রী কি তা দিতে পারে?
মতিউর রহমান: আপনারা গঙ্গার পানিচুক্তি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করছেন এবং অনেক প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু বাস্তবে তো দেখা যাচ্ছে, কিছু সমস্যা থাকলেও পানি আসছে। আর পার্বত্য চট্টগ্রামে যুদ্ধ ও হতাহতের দৃশ্যাবলি তো বন্ধ হয়েছে।
খালেদা জিয়া: ফারাক্কার সমস্যা কিন্তু এখনই শুরু হয়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ফারাক্কা চালু করার ব্যাপারে সম্মতি দেওয়ার পর থেকেই সমস্যাটি শুরু হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করেই ফারাক্কা সমস্যার সমাধান করতে হবে। শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়ই দুই দেশের মধ্যে প্রথম একটি সম্মানজনক চুক্তি হয়েছিল। সে চুক্তিটিতে আমরা আমাদের ন্যায্য হিস্যা পেয়েছি। আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যা যা থাকা দরকার, তাতে সেসব ছিল। আমরা বলেছিলাম গঙ্গার পানিবণ্টন হবে। সেই গঙ্গার পানি তখন বণ্টন হয়েছিল। সে চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার পর এরশাদের সময় ফারাক্কা সমস্যার আর কোনো চুক্তি হয়নি।
আমাদের সরকারের সময় এসেও অনেক চেষ্টা করেছি, অনেক আলোচনা করেছি। আপনারা তা দেখেছেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিনিধিদল ভারতে গেছে। আমি নিজে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বসেছি। আমাদের আলোচনার প্রথম এজেন্ডাই ছিল পানিচুক্তি। পানি পাওয়ার জন্য আমরা বহু কিছুই করেছি, আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। সে জিনিসটি পাইনি বলে আমাদের সঙ্গে চুক্তি হয়নি। কিন্তু পানি যে আসেনি, তা নয়। তখনো পানি আসছিল। আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর কিন্তু সত্যিকার অর্থে তারা গঙ্গার পানিচুক্তি করেনি। যে চুক্তিটি হয়েছে, সেটি ফারাক্কা থেকে পানিচুক্তি হয়েছে। সে চুক্তিটিতে আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা হয়নি।
আমরা জানি, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আলাপ-আলোচনার পর সরকার-সরকার চুক্তি হয়। চুক্তির মধ্যে কিছু ক্লজ থাকতে হয়, শহীদ জিয়ার সময় যেগুলো হয়েছিল। যেমন আমরা বলেছিলাম গ্যারান্টি ক্লজ থাকবে; দুই দেশের মধ্যে কোনো চুক্তি হলে যেকোনো সময় যেকোনো সমস্যা হতে পারে, সে জন্য সেখানে সালিসি ব্যবস্থার কথা আমরা রেখেছিলাম। আরও বিভিন্ন বিষয় থাকবে। কিন্তু এই চুক্তিতে সেগুলোর কোনোটিই নেই। এ চুক্তির সবকিছু গেছে ভারতের পক্ষে, সবকিছু ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ভারত ইচ্ছা হলে আমাদের পানি দেবে, ইচ্ছা না হলে দেবে না। এখন কিন্তু আসলে আমরা পানি পাচ্ছি না বা পানি আসছে না। পত্রপত্রিকায় প্রতিনিয়তই দেখছি, যে পানি আমাদের দেওয়ার কথা ছিল, সে পানি তারা দিচ্ছে না। ফলে নদ-নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, সেচের প্রকল্প বন্ধ হয়েছে, ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, লবণাক্ততা বাড়ছে, আর্সেনিক সমস্যা দেখা দিয়েছে—এমন নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সরকার তো নিজেই স্বীকার করছে যে চুক্তি অনুযায়ী পানি আমরা পাচ্ছি না। তা ছাড়া সমস্যা হলে যে দুই দেশের বসার কথা বলা হয়েছে, সে ক্ষেত্রেও কিন্তু ভারত বসে না। তারা সময় দিচ্ছে না। বাংলাদেশ চেষ্টা করেও ভারতকে বসাতে পারছে না।
মতিউর রহমান: আপনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সার্কের চেয়ারপারসনও ছিলেন। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো নিয়ে আপনি অনেক কথা বললেন। ভারত একটা বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ। এই ভৌগোলিক অবস্থান তো আমরা পরিবর্তন করতে পারব না। তাদের সঙ্গে আমাদের সহাবস্থান করতে হবে, আমাদের স্বার্থও দেখতে হবে, আমাদের দাবিও তাদের কাছ থেকে আদায় করে নিতে হবে। কিন্তু অনেক সময় আপনার কিংবা আপনাদের দলের বক্তৃতা-বিবৃতিতে তীব্র ভারতবিরোধিতা লক্ষ করা যায়। এটা কি আপনার দলের জন্য সহায়ক? ভবিষ্যতে আপনি সরকারে গেলে এই অবস্থান রেখে কীভাবে চলবেন?
খালেদা জিয়া: আমরা তো যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা ছোট হতে পারি। কিন্তু আমাদের একটা আত্মমর্যাদাবোধ রয়েছে। স্বাধীন দেশ হিসেবে আমরা মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে বাস করতে চাই। সে জন্য আমরা সকলের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক রাখতে চাই। একটা বড় দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে আমাদের যে সমস্যাগুলো হবে, তা সমমর্যাদার ভিত্তিতে নিরসন করার জন্য আমরা কাজ করতে চাই। কিন্তু বড় দেশ বলে ভারত যা বলবে তা আমাদের মেনে নিতে হবে বা তারা জোর করে আমাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দেবে, এটা আমরা মেনে নিতে পারি না। যখন তারা বড় দেশ হিসেবে আমাদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে কিংবা আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানার চেষ্টা করে, একটি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল হিসেবে সে অন্যায়গুলোর কথা তখন বাধ্য হয়ে আমাদের বলতে হয়। সেগুলো বলার কারণে যদি আমাদের ভারতবিরোধী মনে করেন, তাহলে আমার বলার কিছু নেই।
মতিউর রহমান: প্রধানমন্ত্রী (তৎকালীন) শেখ হাসিনা প্রথম আলোকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বিএনপি ভারত-সমর্থিত দল, এটা আপনারা খুঁজে দেখতে পারেন। আবার আপনার কিংবা আপনার দলের বিরুদ্ধে একটা প্রচার আছে যে আসলে আপনারা পাকিস্তান-সমর্থিত দল।
খালেদা জিয়া: বিএনপি বাংলাদেশের জনগণ-সমর্থিত দল। বিএনপি সব সময় দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই কাজ করছে। আমরা কারও পক্ষে-বিপক্ষে নই। আমি আগেও বলেছি, আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। শহীদ জিয়াউর রহমান দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কারও পক্ষে কিংবা কারও পকেটে থাকার জন্য আমরা দেশ স্বাধীন করিনি। আমরা দেশ স্বাধীন করেছি সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বসবাস করার জন্য।
আমরা কারও পক্ষে না। পাকিস্তানের পক্ষেও না, ভারতের পক্ষেও না। আমরা বাংলাদেশের পক্ষে। বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে। বাংলাদেশের স্বার্থ, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, বাংলাদেশের উন্নয়নই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।
মতিউর রহমান: আপনাদের বিরুদ্ধে একটা বিরাট প্রচারণা হলো আপনারা ক্যান্টনমেন্ট থেকে তৈরি দল এবং সরকারে থেকে আপনাদের দল গঠন করা হয়েছে?
খালেদা জিয়া: এটা কে বলে? যারা আমাদের বিপক্ষে, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বিএনপির বিরুদ্ধে এই প্রচারণাটি চালায়। বিএনপি জনগণের দল। বাংলাদেশের জনগণকে নিয়েই দলটি গঠন করা হয়েছে। ক্যান্টনমেন্ট থেকে নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, যেমন ন্যাপ থেকেও অনেকেই এতে এসেছেন। ন্যাপ অত্যন্ত পুরোনো একটি দল, মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সাহেব একসময় এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এ দেশের মানুষের স্বাধীন অধিকার এবং এ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারবে এমন এক ব্যক্তি জিয়াউর রহমানকে দেশের মানুষ যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করল, তখন মাওলানা ভাসানী তাঁর জীবনের শেষ সময়ে তাঁকে সমর্থন দিয়েছিলেন, তাঁকে দোয়া দিয়েছিলেন এবং তাঁর নেতা-কর্মীদেরও শহীদ জিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে আসা দেশপ্রেমিক নেতা-কর্মীদের নিয়েই বিএনপি গঠিত হয়েছে।
বিএনপি একটি রাজনীতি, একটি দর্শন দিয়েছিল, যেটা অতীতে কেউ দিতে পারেনি। সেটি হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, বাঙালি, পাহাড়ি, এ দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী সকলে এ জাতীয়তাবাদের মধ্যে আছেন। সকল ধর্মের মানুষ এখানে থাকতে পারবেন, তাদের ধর্ম-কর্ম পালন করতে পারবেন। এর মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনীতি উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে থাকবে আমার সংস্কৃতি এবং যেখানে আমাদের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্য থেকে আমরা রাজনীতি পরিচালনা করতে পারব। এখন কেউ বলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, আর আমরা বলি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এখানেই আমাদের রাজনীতি সার্থক।
বাংলাদেশের জনগণও বাংলায় কথা বলছে, আবার পশ্চিমবঙ্গের মানুষও বাংলায় কথা বলে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে আমরা আমাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং এ দেশের জাতি, ধর্ম, গোত্র—সকলকে সম্পৃক্ত করে একটা পূর্ণাঙ্গ রাজনীতি পাচ্ছি। এ জন্যই বিএনপির জনপ্রিয়তা বেড়েছে এবং সকলে বিএনপির এ রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছে। পাশাপাশি একটি আদর্শভিত্তিক কর্মসূচিও আমরা দিয়েছি, তাতে দেশ গঠন ও উন্নয়ন কর্মসূচিভিত্তিক ১৯ দফা কর্মসূচি আছে। এই কর্মসূচিতে বাংলাদেশের জনগণ রয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে লোকেরা এসেছেন। আমার দলে অবসরপ্রাপ্ত আর্মি অফিসার, সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পেশাজীবী রয়েছেন। এ রকম দর্শন ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতি এর আগে কেউ দিতে পারেনি বলে ঈর্ষান্বিত হয়ে অনেকে, যারা একসময় বাকশালের একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল, বিএনপিকে ক্যান্টনমেন্টের দল বলে। আর এই ক্যান্টনমেন্ট বাংলাদেশের সীমার মধ্যেই অবস্থিত, বাংলাদেশের তো বাইরে নয়।
মতিউর রহমান: আমরা দেখি যে আপনার দল চলে আপনার একক সিদ্ধান্তে। গঠনতন্ত্রেও আপনাকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দিয়ে দলকে এককেন্দ্রিক করে রাখা হয়েছে। গণতন্ত্রের চর্চা যে আপনার দলের মধ্যেই নেই, এটাও একটা বড় প্রশ্ন।
খালেদা জিয়া: আমাদের গঠনতন্ত্র লিখিতভাবে এককেন্দ্রিক হতে পারে, কিন্তু দলের নেতা-কর্মীদের মতামত নিয়ে, তাঁদের সম্পৃক্ত করেই আমরা সবকিছু করি। আমাদের গঠনতন্ত্র মোতাবেক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একটা স্ট্যান্ডিং কমিটি রয়েছে, সেখানে আমাদের সদস্যদের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্ত নিই। প্রয়োজনে স্ট্যান্ডিং কমিটির সিদ্ধান্তও আমরা আরও বৃহত্তর পরিসরে, যেমন দলের ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা, কর্মকর্তা এবং আরও যাঁদের নিলে সঠিক সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে বলে মনে করি, সেখানে তাঁদের সবার সঙ্গে আলোচনা করি। এমনকি অনেক সময় স্ট্যান্ডিং কমিটি এবং নির্বাহী কমিটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অনেককে আমরা আলাদাভাবে আমন্ত্রণ জানাই এবং তাঁদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিই।
মতিউর রহমান: আপনার সামনে কি অন্যেরা ভিন্নমত জানাতে পারেন বা আপনি যেটা বলছেন বা চিন্তা করছেন, সেটার সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন? এমন কি হয় যে আপনার মতের বিরুদ্ধে তাঁরা তর্ক-বিতর্ক করছেন?
খালেদা জিয়া: আমাদের এখানে সবাই যার যার মতামত প্রকাশ করেন এবং সর্বসম্মতভাবে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। স্ট্যান্ডিং কমিটিতে আলোচনা হয়েছে, ভিন্নমত হয়েছে, তর্কবিতর্ক হয়েছে, এ কথাগুলো কিন্তু আপনারা পত্রপত্রিকাতেও তুলে ধরেন।
বঙ্গভবনে এক অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের বিরোধ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছিল আলোচিত বিষয়। তাঁদের একসঙ্গে খুব কমই দেখা গেছে
বঙ্গভবনে এক অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের বিরোধ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছিল আলোচিত বিষয়। তাঁদের একসঙ্গে খুব কমই দেখা গেছেফাইল ছবি: ইউসুফ সা’দ
মতিউর রহমান: দেশের দুই প্রধান নেত্রীর একজন আপনি বিরোধীদলীয় নেত্রী, আরেকজন প্রধানমন্ত্রী। আপনারা দুজনই দুটি বড় ট্র্যাজিক ঘটনার শিকার। দুজনের মধ্যে কি পারস্পরিক সহানুভূতি-সহমর্মিতা থাকতে বা আসতে পারে না, যেখানে আপনারা দুজনে এক হতে পারেন? আপনারা পরস্পরের দিকে একটু তাকালেন কি না, একটু হাসলেন কি না, একটু কথা বললেন কি না, এটা দেখার জন্য কিন্তু দেশ আপনাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
খালেদা জিয়া: বিরোধী দলে থাকার সময়েও আমরাই নিজেদের পক্ষ থেকে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছি। নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে প্রথমেই আমি ৩২ নম্বর গিয়েছি। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের জন্য আমরা মহাখালীতে ওয়াজেদ সাহেবের (শেখ হাসিনার স্বামী এম এ ওয়াজেদ মিয়া) বাসায় গিয়েছিলাম। আমাদের পক্ষ থেকে এ রকম প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তাদের কাছ থেকে আমরা কোনো সহযোগিতা পাইনি। সরকারে যাওয়ার পরও আমরা একসঙ্গে কাজ করতে চাই; সুন্দর একটা রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পরিবেশ তৈরি করতে চাই। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সে জন্য আমি তাদের ইফতার পার্টিতে গিয়েছি। পরে তাঁর মেয়ের বিয়েতেও গিয়েছিলাম। আপনারা হয়তো লক্ষ করে থাকবেন, সেখানে আমার সঙ্গে সাধারণ সৌজন্যমূলক আচরণটুকু পর্যন্ত করা হয়নি। আমি কে সেটা ব্যাপার নয়, দেশের জনগণের নির্বাচিত একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রাপ্য সম্মান ও ব্যবহারটুকু পর্যন্ত আমি তাঁর কাছ থেকে পাইনি। সেখান থেকেই আমাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে।
মতিউর রহমান: তারপরও একজন মানুষ বা একজন নারী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আপনার কোনো সহানুভূতি নেই?
খালেদা জিয়া: সেই জন্যই আপনারা লক্ষ করে থাকবেন, আমি কিন্তু তাঁকে লক্ষ্য করে কোনো সময় ব্যক্তিগত আক্রমণ করি না। আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ করবেন, সংসদে বা সংসদের বাইরে কোনো সুযোগ পেলেই তিনি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ও পারিবারিকভাবে আক্রমণ করে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেন। কিন্তু লক্ষ করবেন, আমি কোনো সময় তাঁকে লক্ষ্য করে বা ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কথাবার্তা বলি না। তাঁর পিতা বা তাঁর পরিবার সম্পর্কে কখনো কোনো আমি কথা বলিনি। আমি মনে করি, এসব বলা ঠিক নয়।
মতিউর রহমান: দেশের মধ্যে এই যে বিদ্বেষ, এই যে সংঘাত, এই যে বিভক্তি—যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, আমি তো মনে করি, এর থেকে বের হওয়ার আশু কোনো পথ নেই। এ রকমই কি চলবে? আপনারা কোনো চেষ্টা, কোনো উদ্যোগ নেবেন না? আওয়ামী লীগ-বিএনপি এসব বাদ দিয়ে একটু চিন্তা করুন। এভাবে তো দেশ চলতে পারে না।
খালেদা জিয়া: আমি সব সময় বলেছি, বিভেদ-বিভ্রান্তির রাজনীতিতে আমি বিশ্বাস করি না, আমি বিশ্বাস করি উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রের রাজনীতিতে। সে প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখা এবং জোরদার করার জন্য আমাদের পক্ষে কিছু করার থাকলে আমি সেটি করতে প্রস্তুত রয়েছি। কিন্তু সেটি এক পক্ষ করলেই তো হবে না। সরকারে থাকাকালে সেই প্রচেষ্টা আমরা চালিয়েছিলাম। বিরোধী দলে থেকে আওয়ামী লীগ তখন কোনো সহযোগিতা করেনি বলে আমরা সেই কাজগুলো করতে পারিনি। একতরফা চেষ্টা করলে সেটা সম্ভব নয়। এখন সরকারে আছে আওয়ামী লীগ। ফলে বিভেদ-বিভ্রান্তি দূর করতে এবং যে সমস্যাগুলো তারা সৃষ্টি করছে, সেগুলো নিরসন করতে তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। এগিয়ে এলে আমাদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা তারা পাবে।
Monday, September 1, 2025
বিএনপির ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা
শায়রুল কবির খান
একটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস শুধু ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়; এটি জাতির আকাক্সক্ষা, সংকট ও সম্ভাবনারও দলিল। সেই দলিলের একটি উজ্জ্বল অধ্যায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর। যে দিনটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্বাসন ও একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনার সাক্ষী হয়ে আছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির প্রতিষ্ঠা শুধু একটি দলের জন্ম নয়, এটি ছিল একটি বিশেষ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তার ফসল।
স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর, একদলীয় শাসনামল শেষে দেশ যখন একটি রাজনৈতিক ভ্যাকুয়ামে নিপতিত, তখন গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং একটি বিকল্প রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছিল। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ও সংগঠিত বিকল্পের অনুপস্থিতি তখন স্পষ্ট। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীসহ অনেক প্রবীণ নেতা তখনো সক্রিয় থাকলেও সেই শূন্যতা পূরণের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি সুসংগঠিত, সুস্পষ্ট আদর্শভিত্তিক এবং সর্বজনীন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের। এ শূন্যতা পূরণ করতেই আত্মপ্রকাশ করে বিএনপি। এর প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের’ যে তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, তা ছিল একটি জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের সন্ধানে একটি যুগোপযোগী দার্শনিক ভিত্তি। এটি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার পাশাপাশি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সব নাগরিকের সমান অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণা।
এ প্রেক্ষাপটেই আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শুধু একটি দলই গড়ে তোলেননি, বরং ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণার ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্রদর্শন দাঁড় করান। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সংখ্যালঘু নাগরিকদের সমান অংশগ্রহণের রাজনৈতিক মঞ্চ হিসাবে বিএনপি জন্ম নেয়।
স্বাধীনতার ঘোষক থেকে রাষ্ট্রনায়ক : ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা শুরু হলে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণা তাকে জনমানসে প্রথম পরিচিতি দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী অফিসার হিসাবে তাকে স্বীকৃতি এনে দেয়। নয় মাসের যুদ্ধে তিনি ছিলেন জেড ফোর্সের ব্রিগেড কমান্ডার। স্বাধীনতার পর তিনি দক্ষ সামরিক অফিসার হিসাবে সুনাম অর্জন করেন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে সিপাহি-জনতার বিপ্লব তাকে রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে সামনে নিয়ে আসে। ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া... আপনারা ধৈর্য ধরুন’-এ বার্তা তখনকার সংকটকালে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনে।
রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলা : রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান প্রথমেই সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক পুনর্গঠন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। সামরিক বাজেট বৃদ্ধি, নতুন ডিভিশন গঠন, পুলিশ ও গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করার পদক্ষেপ ছিল তার রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশল। কিন্তু এর চেয়েও বড় পদক্ষেপ ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন। একদলীয় শাসনের সংকট থেকে বেরিয়ে তিনি রাজনৈতিক দল গঠনের বৈধতা দেন। ১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দল বিধি জারি হলে আওয়ামী লীগ, বাম ও ডানপন্থি শক্তিগুলো আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়।
গণতান্ত্রিক ভিত্তি : এ সময়েই জন্ম নেয় বিএনপি। বহুদলীয় রাজনীতির একটি প্রধান শক্তি হয়ে উঠতে জিয়া ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। দেশজুড়ে গণসংযোগে বের হয়ে ৭০টিরও বেশি জনসভায় ভাষণ দেন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু করেন। ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার নির্বাচন জনগণের ভোটাধিকারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ নির্বাচনকে বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপনের অন্যতম মাইলফলক ধরা হয়।
পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান : জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল বাস্তববাদী। ভারতের সঙ্গে বৈরিতা কাটিয়ে সম্পর্ক উন্নয়ন, চীন ও পশ্চিমাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেন। বিশেষত মুসলিম বিশ্বের সংহতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন দৃঢ়।
অর্থনীতি ও সমাজ সংস্কার : অর্থনীতিতে বেসামরিকীকরণ প্রক্রিয়া শুরু করেন তিনি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার আমলে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য আসে।
সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী : ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদে পঞ্চম সংশোধনী পাশ হয়। এর মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রণীত সব আইন-ঘোষণা সাংবিধানিক বৈধতা পায়। এ সংশোধনীতে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিতেও পরিবর্তন আসে। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র পরিবর্তে যুক্ত হয় ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’। জাতীয়তাবাদ নতুন সংজ্ঞা পায় ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। বহুত্ববাদী সমাজে জাতীয় পরিচয়কে নতুন মাত্রা দেয় এ ধারণা। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়।
ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়ক ও উত্তরাধিকার : ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নিহত হন জিয়াউর রহমান। মাত্র সাড়ে চার বছরে তিনি যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, তা এখনো প্রাসঙ্গিক। তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারে বেগম খালেদা জিয়া একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ৩১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে বাংলাদেশকে মানবিক কল্যাণরাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন।
বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা : তবে বিএনপির যাত্রা কখনোই মসৃণ ছিল না। ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দলটি বড় আঘাত সহ্য করেছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জটিলতা, নেতৃত্বের ওপর দমননীতি, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস, সবকিছু মিলিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে। তারপরও ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ধারাবাহিক আন্দোলন প্রমাণ করেছে, বিকল্প শক্তি হিসাবে বিএনপি এখনো জনগণের প্রত্যাশার জায়গায় রয়েছে। বিশেষত নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন করে তারা গণতন্ত্রের প্রশ্নে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরতে পেরেছে।
ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ সংগঠনকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংযুক্ত করা, গণআন্দোলনকে ভোটে রূপান্তর করা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা। বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ লক্ষ্যগুলোতে সফল হয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বিএনপি আবারও জাতীয় রাজনীতির প্রধান স্থায়ী শক্তি হয়ে উঠতে পারবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি শুধু একটি দলের নাম নয়, বরং রাষ্ট্রের বিকল্প দর্শন ও গণতন্ত্রের প্রতীক। স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে ৯০-এর গণআন্দোলন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি কিংবা সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান সব ক্ষেত্রেই বিএনপি নেতৃত্ব দিয়েছে। দেশমাতৃকায় গড়ে ওঠা বিএনপি তাই শুধু রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে রচিত ভিত্তি ও তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাষ্ট্র পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য অপরিহার্য।
শায়রুল কবির খান : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী
Sunday, August 31, 2025
বিএনপি: রাজনীতির হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা
অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান
বিএনপি’র প্রতিষ্ঠা ও আজকের রাজনীতি
অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেল
১৯৭১ সালে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছে আমাদের। এমনকি স্বাধীনতার ঘোষণাও দিতে পারেনি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। মেজর জিয়া যখন স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন নিজেকে এবং তাঁর পরিবারকে চরম বিপদের ঝুঁকিতে ফেলে; তখন আওয়ামী নেতৃত্ব আত্মসমর্পণ আর পলায়নে ব্যস্ত। কেউবা বিমানে পাকিস্তানের পথে, কেউবা মেহেরপুরের গন্তব্যে আর তরুণ নেতৃত্ব বুড়িগঙ্গার ওপারে মোস্তফা মহসিন মন্টু’র বাসায় বেতারে মেজর জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা শুনছেন। অন্য দিকে সারাদেশে নিরস্ত্র মানুষের লাশের স্তূপ জমছে- দেশের সকল প্রান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে। সংগঠিত হয়ে এদেশের মুক্তিকামী তরুণেরা গেরিলা যুদ্ধের পাল্টা চোরাগোপ্তা আক্রমণ নিয়ে মাঠে আসতে আসতে মে-জুন অব্দি গড়িয়েছে, যদিও সেই তরুণদের মাঝে আওয়ামী বা ছাত্রলীগ-যুবলীগ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা ছিল নিছকই অপচেষ্টা। তারা তখন জেনারেল উবান-এর ‘ডিম তত্ত্ব’ বাস্তবায়নে নৈনিতাল- দেরাদুনের নাতিশীতোষ্ণ পাহাড়ে মুজিব বাহিনীতে প্রশিক্ষণরত। বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে যুদ্ধ করেছে দেশের সাধারণ ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক এরাই। তারপরেও সবকিছু ভুলে শুধুমাত্র স্বাধীনতার আকর্ষণে দেশের মানুষের অবিশ্বাস্য ঐক্য সম্ভব করেছে ডিসেম্বরের বিজয়। যদিও এ দেশের মাটিতে জন্ম নেয়া একদল সকল সুযোগ থাকার পরেও মুক্তিযোদ্ধার পরিবর্তে স্বাধীনতা বিরোধী আর রাজাকার-আলবদর হওয়ার কালিমা মেনে নিয়েছে স্বেচ্ছায়।
ডিসেম্বরে বিজয়ের মুহূর্তে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ঐক্যকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলো আওয়ামী নেতৃত্ব। তারা উড়ে এসে হঠাৎই স্বাধীনতার একমাত্র দাবীদার হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার সুবর্ণ সুযোগ হেলায় হারালেন। বিজয়ের শুরুতেই এলো বিভক্তি। এমন স্বাধীনতা চাইনি বলে আওয়ামী লীগেরই একাংশ বিভক্তিতে গড়লো ‘জাসদ’। আব্দুর রব আর শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বে- আওয়ামী লীগের তথাকথিত ‘মাস্টার মাইন্ড’ সিরাজুল আলম খান নতুনভাবে ‘মাস্টারমাইন্ড’ হয়ে আবির্ভূত হলেন এই বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহীদের পক্ষে।
অবিসংবাদিত জাতীয় নেতা হবার দূর্লভ সুযোগ হারালেন শেখ মুজিব। একবার রাষ্ট্রপতি, আরেকবার প্রধানমন্ত্রী, তারপর আবারও রাষ্ট্রপতি পদের সাথে যুক্ত হতে থাকলো তার নাম। বিধ্বস্ত বাংলাদেশ তখন এক চরম নৈরাজ্যের অভয়ারণ্য, দেশের মানুষ পাকিস্তানিদের ফুটন্ত কড়াই থেকে আওয়ামী লীগের জ্বলন্ত আগুনে পতিত হলো। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, অভাব আর দুর্ভিক্ষ, রাস্তায় রাস্তায় অনাহারে মৃতদের লাশের স্তূপ। জনতাকে স্তব্ধ করতে মাঠে নামলো কুখ্যাত ‘রক্ষী বাহিনী’ নামের এক আতঙ্ক। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো সম্ভাবনাময় তারুণ্যকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। অসহিষ্ণু সরকার কোনো প্রতিবাদই সহ্য করতে পারছিল না, ভিয়েতনামে যুদ্ধ অবসানের দাবিতে ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে গুলিতে নিহত হলো দু’জন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বাড়ির উদ্দেশ্যে জাসদের মিছিল পরিণত হলো লাশের মিছিলে। অরাজকতার কফিনে শেষ পেরেক হয়ে এলো ১৯৭৫-এর জানুয়ারিতে এক দলীয় ‘বাকশাল’। নিষিদ্ধ হলো সকল রাজনৈতিক দল, কন্ঠরোধ হলো সংবাদপত্রের, বিনা জবাবদিহিতায় সংসদের মেয়াদ বেড়ে গেল পাঁচ বছর। অবশ্য এর আগে ’৭৩-এ সংসদ নির্বাচনে ব্যালট চুরির মহোৎসব দেখার সৌভাগ্য হয়েছে দেশবাসীর।
এলো আগস্ট ১৯৭৫, সপরিবারে নিহত হলেন শেখ মুজিব, ক্ষমতায় এলো তারই বিশ্বস্ত সহযোগী খন্দকার মুশতাক, সংসদের স্পিকার মালেক উকিল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন- “দেশ ফেরাউন মুক্ত হয়েছে”। ইতিহাস আসলেই বড় নির্মম।
আগস্ট পরবর্তীতে বিশৃংখল সেনাবাহিনীতে তখন অভ্যুত্থান আর পাল্টা অভ্যুত্থান ছিল নিত্য সঙ্গী। দেশপ্রেমিক সাধারণ সৈনিক এমন অরাজকতার মাঝে ঘটালো এক অভাবনীয় বিপ্লব। ৭ নভেম্বরে সংঘটিত হলো- ঐতিহাসিক সিপাহী জনতার বিপ্লব। রাষ্ট্রের পাদ-প্রদীপে আবারও এলেন জিয়াউর রহমান জাতির মুক্তির দূত হয়ে। দায়িত্ব পালনের সংক্ষিপ্ত সময়ের মাঝেই ঘটালেন অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। দুর্ভিক্ষের বাংলাদেশ পরিণত হলো- খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে, মুক্ত হল অবরুদ্ধ সংবাদপত্র, অবারিত হলো রাজনৈতিক চর্চা। দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল- এমন একটি রাজনৈতিক দলের যাঁরা যার আদর্শে হবে উদার মধ্যপন্থী, দৃঢ় থাকবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে, মর্যাদা দেবে ধর্মীয় বিশ্বাসকে, ঐক্যবদ্ধ করবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সকল মানুষকে, মর্যাদা দেবে নারীদের, কর্মসংস্থান করবে যুবকদের, সমমর্যাদার সম্পর্ক থাকবে সকল রাষ্ট্রের সাথে, অগ্রাধিকার পাবে যোগ্যতা আর দেশপ্রেম, শূন্য সহনশীলতা থাকবে অনিয়ম আর দুর্নীতির প্রশ্নে। জিয়া জণ-প্রত্যাশাকে অসম্মান করেননি, গড়েছেন তাদেরই প্রত্যাশার রাজনৈতিক দল “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি”। ১৯৭৮ সালে ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরায় ঐতিহাসিকভাবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী দল হিসেবে। যে দল সকল মতাদর্শের মানুষকে ধারণ করতে পারে। তিনি শুধু বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেননি, একই সাথে শেখ মুজিবের হাতে মৃত আওয়ামী লীগেরও পুনর্জন্ম দিয়েছেন। তারপর ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় বিএনপি’র নেতৃত্বে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, উৎপাদন, সকল ক্ষেত্রেই এসেছে অপ্রত্যাশিত সাফল্য, প্রবর্তিত হয়েছে স্বাধীনতা-একুশে পদক। নির্মিত হয়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, তারপরেও মুক্তিযোদ্ধার দল বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র দাবীদার হয়ে ওঠেনি। যেমনভাবে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযুক্ত করেও বিএনপি এ দেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীকে ধর্মের নামে ব্লাক মেইলিং-এর সস্তা পথে হাঁটেনি। জিয়া শহীদের মর্যাদায় প্রয়াত হয়েছেন, জনগণ তাকে অন্তিম বিদায় জানিয়েছে সর্ববৃহৎ জানাযার মাধ্যমে ।
পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া দলের দায়িত্ব নিয়েছেন এক কঠিন সময়ে- দলকে করেছেন সুসংহত, স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছিলেন সম্মুখ নেতৃত্বে, আপোষহীন ইমেজে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়, তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, সকল আসনেই বিজয়ী হবার এক অনন্য রেকর্ড গড়েছেন, শিকার হয়েছেন এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের, কারাবরণ করেছেন মিথ্যা মামলায়, নির্জন কারাগারে আক্রান্ত হয়েছেন দুরারোগ্য ব্যাধিতে। তারপরেও পরম সহিষ্ণুতা আর সংযম তাকে আজ দেশনেত্রীর চাইতেও উচ্চতর আসনে বসিয়েছে। আজ তিনি কোন দলের নন, আজ তিনি এই দেশের সবচাইতে সম্মানিত ব্যক্তি। সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে দেশের মানুষের বিশ্বাস আর আস্থার অভিভাবক।
কারারুদ্ধ হবার পর বিএনপি’র শীর্ষ দায়িত্বে আসেন জনাব তারেক রহমান, এক-এগারোর ষড়যন্ত্রকারীদের রোষানলে নির্যাতনের তীব্রতায় প্রায় পঙ্গুত্বকে জয় করে আট হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও দলকে পরিচালিত করেছেন পরম দক্ষতায়। যার ফলশ্রুতিতে গত সতের বছরের নির্যাতন, হত্যা, গুম, জেল-জুলুম, মামলা-হামলায় জর্জরিত হয়েও লক্ষ কোটি নেতা-কর্মী সমর্থকেরা পরিচয় দিয়েছেন এক অবিশ্বাস্য ঐক্য আর আনুগত্যের। শত নির্যাতনেও তারা ছিলেন- অনড়, একজনও আদর্শচ্যুত হয়ে দলত্যাগ করেননি, সতের বছর ধরে উত্তপ্ত প্রতিবাদের লাভা মহা-বিস্ফোরণে উদগিরিত হয়েছে চব্বিশের আগস্টে, এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ।
আজ আমরা এক নির্বাচনের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে দেশের মালিকানা দেশের মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেবার অপার সম্ভাবনার অপেক্ষায়, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অপেক্ষমান জাতির সামনে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, সেই প্রত্যাশার মেঘমুক্ত নীল আকাশে ভীতির মেঘের ইতস্তত আনাগোনা শংকিত করছে দেশের মানুষকে। অর্থহীন পি.আর পদ্ধতির অবাস্তব দাবী তুলে জামায়াতে ইসলামী যেমন গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির সুযোগ করছে, ঠিক তেমনি আরেক পক্ষ অপ্রয়োজনীয় গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি তুলে গণতন্ত্রের পথযাত্রাকে অনিশ্চিত করার প্রেক্ষাপট রচনা করছে। সাধারণ মানুষ এসবের কোনটাই পছন্দ করছে না।
গত কয়েক মাস ধরে ঐক্যমত কমিশনের এতো দীর্ঘ আলোচনার পর এমন বিভক্তি সাধারণ মানুষকে শুধু বিরক্তই করছে মাত্র। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে এমন বিভক্তি কেনো মেনে নেবে সাধারণ মানুষ? তাদের চাওয়া একটাই, দেশের মালিকানা সাধারণ মানুষের কাছে ফেরত দিতে হবে, জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তারা তাদের পছন্দের সরকার নির্বাচিত করতে চায়, কারণ তারা জানে দীর্ঘ মেয়াদের অনির্বাচিত সরকার যে-কোনো গণতান্ত্রিক দেশের জন্য সম্মানজনক নয়, তারা এটাও জানে আগামী ফেব্রুয়ারিতে গণতন্ত্রে উত্তরণ কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হলে আবারও অনিশ্চিত সময়ের জন্য এদেশের মানুষ ফ্যাসিবাদের বন্দীতে অবরুদ্ধ হবে।
এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর বোধোদয় অপরিহার্য। গুটিকয়েক উচ্চাভিলাসী প্রজ্ঞাহীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের হঠকারিতায় দেশের ১৮ কোটি মানুষ আবারো কারারুদ্ধ আর বাকরুদ্ধ হবেন এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি কেনো মেনে নেবে সাধারণ মানুষ?
তারা কি এই সরল সত্যটা বোঝেন না যে, পলাতক স্বৈরাচার এখনো পরাজয় মেনে নেয়নি, এখনো অনুতপ্ত নয় তারা, দেশের মধ্যে থাকা তাদের অবিবেচক আর অন্ধ অনুসারীরা এখনো সুযোগের সন্ধানে। তারা কি বোঝেন না যে- পি.আর পদ্ধতির নামের এই বিভক্তি আর গণ-পরিষদের দাবিতে বিপরীত অবস্থানের অনৈক্যের সুরে পাশের দেশে লুকিয়ে থাকা স্বৈরাচারের মলিন মুখে হাসির রেখা ফুটে ওঠে! তারা কি বোঝেন না ভিপি নূর রক্তাক্ত হলে কিংবা যমুনামুখী ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্রদের মিছিল অবরুদ্ধ হলে সেই হাসি অকর্ন বিস্তৃত হয়। তারা কি বোঝেন না এদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন আস্ফালন করে বলে, ফেব্রুয়ারি নির্বাচন প্রতিহত করা হবে, তারা যখন নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান- তখন স্বৈরাচারের হাসি অট্টহাসিতে পরিণত হয়?
প্রবাদ আছে ‘নিজের নাক কেটেও অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করার’। আপনারা নিজেদের নাক কাটুন সমস্যা নেই, কিন্তু জনগণের প্রত্যাশার গণতন্ত্রে উত্তরণের সুবর্ণ সুযোগ আগামীর নির্বাচনের যাত্রা নির্বিঘ্ন করুন, দয়া করে গনতান্ত্রিক উত্তরণের যাত্রা ভঙ্গ করবেন না। একজন চিকিৎসকের ভুলে একজন রোগীর মৃত্যু হতে পারে, একজন প্রকৌশলীর ভুলে একাধিক মানুষের প্রাণ যেতে পারে, একজন পাইলটের ভুলে শত মানুষের মৃত্যু হতে পারে কিন্তু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভুলে ১৮ কোটি মানুষের অধিকারের মৃত্যু হতে পারে। আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বিঘ্নিত হলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রের ভবিষ্যৎ কতো দীর্ঘ সময় মহাকাশের কালো গহ্বরের আড়ালে অন্তরীণ হয়ে থাকবে, সেটা হঠকারী রাজনৈতিক নেতৃত্ব উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলেও সাধারণ মানুষের কাছে সেটা দূর্বোধ্য নয়। আর তেমন হলে ইতিহাস তাদের কি পরিনতি নির্ধারণ করবে সেটা ইতিহাসের জন্য তোলা থাক কিন্তু জনগনের শিক্ষা কেমন হতে পারে সেটা নিশ্চয়ই বলে দেয়ার প্রয়োজন নেই। অন্য দিকে রাজনৈতিক দল গুলোর সামনে আগামী ফেব্রুয়ারিতে এক মহিমান্বিত গনতান্ত্রিক উত্তরণে মহানায়ক হবার দূর্লভ সুযোগ। এখন সিদ্ধান্ত আপনাদেরই নিতে হবে, আগামীতে তারা মহানায়ক হিসাবে নন্দিত হবেন, নাকি আস্তাকুঁড়ের আবর্জনায় নিন্দিত হবেন।
লেখক : অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেল
আহ্বায়ক, বিএনপি মিডিয়া সেল
Monday, August 11, 2025
আরাফাত রহমান কোকো: এক নিভৃতচারী অমর ক্রীড়াশিল্পী
আরাফাত রহমান কোকো। পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন ১৯৬৯ সালে। বাবার কর্মস্থল কুমিল্লায়। জন্মের পরপরই আসে একাত্তর। মুক্তিযুদ্ধে চলে যান বাবা। চট্টগ্রাম থেকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেন। ঘোষণা দেন স্বাধীনতার। তারপর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। একটি স্বাধীন দেশ, একটি লাল-সবুজের পতাকা। যুদ্ধকালে মা ও বড়ভাই তারেক রহমানের সাথে পাকসেনাদের হাতে বন্দি হওয়ার অভিজ্ঞতা তার শৈশবের আখ্যান। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বন্দিদশার দিনগুলো তার জীবনের অন্যতম বড় ট্রাজেডি হলেও সেগুলো বিস্মৃতি হয়ে যায়। তিনি হয়তো বুঝতে পারেননি বন্দিত্ব কিংবা মুক্তির আনন্দ। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই দেশ ও দেশের মানুষ তার একান্তই আপন। একটি সদ্য জন্ম নেওয়া দেশের সকল ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন আর আধুনিকায়ন প্রয়োজন। তাইতো নিভৃতচারী কোকো বেছে নিয়েছিলেন ক্রিড়া জগতকে। একজন রাজপুত্র, যিনি কিনা চাইলেই ক্ষমতার ভেতর থেকে আরাম-আয়েশে জীবন কাটাতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি বেছে নিয়েছিলেন রাষ্ট্র সংস্কারের পথ। দেশের ক্রিড়াঙ্গণকে তিনি ঢেলে সাজিয়েছিলেন একজন সুদক্ষ ক্রীড়াশিল্পীর মতো।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ সন্তান আরাফাত রহমান কোকোর জীবনটা ছিলো বৈচিত্রময়। তার মা ও ভাইয়ের সঙ্গে যখন মুক্তি পান তখন তার বয়স মাত্র দুই বছর চার মাস চার দিন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর সিপাহী বিপ্লবের সময় তার বাবা জিয়াউর রহমান বন্দি হন এবং আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন তখনো তিনি মাত্র ছয় বছরের শিশু! এমনকী ১৯৮১ সালে বাবা জিয়াউর রহমান যখন শহীদ হন তখন আরাফাত রহমান কোকো মাত্র ১১ বছরের কিশোর! এই অল্প সময়ের মধ্যে কোকোর জীবনে যতগুলো ঘটনা ঘটেছে তার বেশিরভাগই বিয়োগান্তক। যার তার মনোজগতে বিরুপ প্রভাব ফেলে। যদিও তিনি এসবের কিছুই সেভাবে কখনোই প্রকাশ করেনি।
অবুঝ শৈশবেই ১৯৭১-এ পাক-হানাদার বন্দিশালায় আটক হওয়ার পর দ্বিতীয় বার ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বন্দি হন। ২০০৮ সালের ১৭ই জুলাই মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। ২০১৫ সালের ২৪শে জানুয়ারি মালয়েশিয়াতে মাত্র ৪৫ বছর বয়সেই তার জীবনাবসান ঘটে।
আরাফাত রহমান কোকো ব্যক্তিগত জীবনে খুবই সাধারণ ও অন্তর্মুখী স্বভাবের ছিলেন। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ঐতিহাসিক অবদান রাখলেও তিনি ছিলেন সর্বদা প্রচার বিমুখ। কোকো ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে থাকাকালীন ক্রিকেট রাজনীতিমুক্তকরণ যেমন করেছেন, তেমনি বিরোধীদলীয় নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর সাথে কাজ করে স্থাপন করেন অনন্য নজির।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের অধিকাংশই সরাসরি ক্রিকেট খেলোয়াড় ছিলেন না। কিন্তু কোকো ডিওএইচএস ক্লাবের হয়ে দ্বিতীয় বিভাগে ক্রিকেট খেলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হিসেবে দ্বিতীয় বিভাগে খেলাটা পারিবারিক শক্তি না দেখানোর মতো বিনয়! এ ধরনের বিনয় তার পুরো ক্রীড়া সংগঠক জীবনে লক্ষ্য করা যায়।
যেমন ক্রিকেট বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী সরকার যাকে ইচ্ছা তাকেই বোর্ড সভাপতি করতে পারতো। কাজেই ক্ষমতার চূড়ান্ত ব্যবহার করলে বোর্ড সভাপতি হতে পারতেন তিনি। কিন্তু কোকো তা না হয়ে বোর্ডের অধীনে ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আমুলে বদলে ফেলেছেন বয়সভিত্তিক ক্রিকেটকে। তিনি কখনো তার অধিকারের বাইরে বাড়তি কোনো হস্তক্ষেপ করেননি। ডেভলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে হাই পারফরমেন্স ইউনিটের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটার তৈরির পাইপলাইনের সূচনা হয় তার হাত দিয়ে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে সফল সাকিব, তামিম, মুশফিক, শুভ, এনামুল জুনিয়র প্রমুখ ক্রিকেটার হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের মাধ্যমেই প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়। খেলোয়াড় তৈরির ধারাবাহিক পাইপ লাইন তৈরি হয়েছিল এই ডেভেলপমেন্ট কমিটির মাধ্যমে। যার মূল কারিগর ছিলেন কোকো।
আবহাওয়াজনিত কারনে বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে ক্রিকেট খেলা হতো না। ক্রিকেট খেলোয়াড়রা এইসময় অলস বসে থাকতেন। এই সমস্যা দূর করতে ২০০৪ সালে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কাছ থেকে ক্রিকেটের জন্য বরাদ্দ নেন কোকো। এটিকে পূর্ণাঙ্গ ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে রূপান্তর করতে ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ সিস্টেম তৈরির মাধ্যমে মিরপুর স্টেডিয়ামকে আধুনিকায়ন করেন কোকো। মিরপুর স্টেডিয়ামকে হোম অব ক্রিকেট দেখিয়েই ২০১১ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বাগতিক দেশের মর্যাদা লাভ করে বাংলাদেশ।
শুধু তাই নয়, দেশের ক্রিকেটকে বিকেন্দ্রীকরণে ভূমিকা রাখেন কোকো। তিনি ক্রিকেটকে মিরপুর ও চট্টগ্রামে কেন্দ্রীভূত না করে সিলেট, খুলনা, বগুড়া ও রাজশাহীতে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। এছাড়া ক্ষমতা থাকার পরও বগুড়ার একমাত্র আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামে না করে মুক্তিযোদ্ধা শহীদ চান্দু নামে নামকরণ করে অনন্য নজির স্থাপন করেন।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়ান কোচ, ট্রেনার, ফিজিও আনার ট্রেন্ড চালু করেন কোকো। বোর্ডের প্রফেশনাল কাজেও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সাপোর্ট পাওয়া যেত। ক্রিকেট বোর্ডকে করেছিলেন রাজনীতিমুক্ত। কাজটি করতে গিয়ে জনপ্রিয়তা বা বাহবা কুড়াতে যাননি কোকো। প্রেসকে ডেকে কভারেজের আয়োজন করেননি। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হওয়া সত্ত্বেও সব মতের সংগঠকেরাই ছিলেন তৎকালীন ক্রিকেট বোর্ডে।
২০০৪ সালে প্রথম অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপের আয়োজনের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ কোকোর ক্যারিশম্যাতেই। সে সময় তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগ এত বড় আয়োজনের উৎসবে পানি ঢেলে দেওয়ার জন্য সারাদেশে হরতাল ডেকেছিল। সেই প্রতিকূল অবস্থাতেও একদিনে পনেরটি প্র্যাকটিস ম্যাচ আয়োজন করে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় বাংলাদেশ। সফল এই আয়োজনের নেপথ্য কারিগর ছিলেন কোকো। তিনি ছিলেন, নির্লোভ, নির্মোহ, অরাজনৈতিক ক্রীড়া সংগঠক।
এক এগারোর পরবর্তী সরকারের আমলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তির রোষানলে পড়ে জিয়া পরিবার। তিনি ও তার ভাই তারেক রহমানের ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। দেশ ছেড়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাতে হয় তাকে। সেখানে ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মামলাগুলো মাথায় নিয়ে তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর খবরে সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। ২৭ জানুয়ারি সরকারবিরোধী কর্মসূচির সময় দেশে কর্তৃত্ববাদী সরকারের প্রায়-কারফিউ অবস্থার মধ্যে বায়তুল মোকাররমে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ি সেদিন বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়াম, মহানগর নাট্যমঞ্চ, গোলাপ শাহ’র মাজার থেকে জিপিও মোড় পর্যন্ত সড়কে অবস্থান নেয় মানুষ। অন্যদিকে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে পল্টন মোড়, দৈনিক বাংলা মোড় ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এলাকায় লাখো মানুষ সমবেত হয়। ঢাকা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর থেকে অসংখ্য মানুষ জানাজায় অংশ নেন। একজন প্রচার বিমুখ, সাদাসিধে কোকোর শেষ বিদায়ে লাখ লাখ মানুষ সেদিন ডুকরে কেঁদেছিলো। পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মতো কোকোর জানাজাও বাংলাদেশের ইতিহাসে ছিলো বিস্ময়কর। একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে সকল ভয় আর প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে সেদিন সাধারণ মানুষ চোখের জলে বিদায় জানায় এই অমর ক্রীড়াশিল্পীকে।
লেখকঃ অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান