Search

Thursday, February 10, 2022

নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুরকান্ডের কি তদন্ত হবে!



গত কয়েকটি সংসদ অধিবেশনের প্রায় প্রতিটিতেই কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন উত্থাপিত হয়েছে। দেশের সব জেলায় কমপক্ষে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সরকারের লক্ষ্য। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য কারা হবেন, কারা পাঠদানে নিযুক্ত হবেন, গবেষণায় কী পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হবে, সেসব বিষয়ে সরকারের খুব একটা মাথাব্যথা নেই। মেগা প্রকল্পের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ এসব বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মুখ্য উদ্দেশ্য বলেই মনে হয়।

গত কয়েক বছরে শিক্ষার মান যেখানে নেমেছে, আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে আমাদের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অবস্থান, দেশে তথাকথিত শিক্ষায় শিক্ষিত বেকারের যা পরিসংখ্যান, তাতে এটা স্পষ্ট, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্দেশ্য মানসম্পন্ন শিক্ষার প্রসার যতটা না, তার চেয়ে অনেক বেশি অবকাঠামো নির্মাণ বাবদ কিছু লুটপাট আর দলীয় লোকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। প্রতিটি আইনই তড়িঘড়ি করে পাস করা, যেখানে বিরোধী দলের ক্ষীণ কণ্ঠ খুব বেশি শোনা যায়নি, ব্রুট মেজরটির সংসদে আইনগুলো নিয়ে আলোচনারও খুব একটা সুযোগ ছিল না।

তেমনই একটি বিশ্ববিদ্যালয় ‘চাঁদপুর বিশ্ববিদ্যালয়’। সম্প্রতি এই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছের লোকদের দুর্নীতির খবরে গণমাধ্যম পূর্ণ হয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য সরকার ভূমি অধিগ্রহণের অনুমোদন দেওয়ার পর মাঠপর্যায়ে জমির অস্বাভাবিক মূল্য দেখে জেলা প্রশাসন ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ১৩ সদস্যের কমিটি করে দেয়। সেই কমিটি নির্ধারিত মৌজার জমি বেচাকেনার দলিল পর্যালোচনা করে ১৩৯টি দলিল পায় ‘অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে’ (২০ গুণ বেশি দামে) রেজিস্ট্রি করা। এসব দলিল হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরুর পর। ওইসব দাগের বাইরে একই মৌজায় একই সময়ে সম্পাদিত ৪০টির বেশি জমি কেনাবেচার দলিল পাওয়া গেছে, যার মূল্য সরকারি মৌজা দরের কাছাকাছি। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য যে জায়গাটি ঠিক করা হয়েছে, কেবল ওইসব দাগের জমির দলিলে অস্বাভাবিক দাম দেখানো হয়েছে। আর ওইসব জমি কিনেছেন শিক্ষামন্ত্রীর আপন বড় ভাইসহ তার কাছের লোকজন।

দেশের বিরোধী দলের উত্থাপিত কোনো অভিযোগ মানেই সরকারের দৃষ্টিতে ‘নির্লজ্জ মিথ্যাচার’। এমনকি দেশের প্রতিষ্ঠিত মিডিয়ায় প্রকাশিত সমালোচনামূলক সংবাদকেও পাত্তা না দেওয়ারও প্রবণতা আছে সরকারের। তা ছাড়া যেকোনো কিছুতে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খোঁজা সরকারের পুরনো স্বভাব। মজার ব্যাপার হচ্ছে এবারকার এই দুর্নীতির ক্ষেত্রে অভিযোগের তীর দেগেছে শিক্ষামন্ত্রীর নিজ দলের লোকজন।

চাঁদপুর-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মুহম্মদ শফিকুর রহমান দেশের একটি প্রতিষ্ঠিত অনলাইন পোর্টালে রীতিমতো কলাম লিখে এই দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ হাজির করেছেন। ‘অনৈতিহাসিক : চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য’ শীর্ষক কলামে তিনি লিখেছেন, ‘অনেক দিন থেকেই প্রস্তাবিত চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চাবিপ্রবি) প্রতিষ্ঠা নিয়ে নানান গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে পাঁচ-ছয়শ কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছিল অবাধে। এর পেছনে যেহেতু খোদ শিক্ষামন্ত্রীর ক্ষমতা ও তার ভাই-বেরাদর জড়িত তাই কেউ মুখ খুলছিল না।’

শিক্ষামন্ত্রীর নিজ জেলা চাঁদপুর আওয়ামী লীগের সভাপতিও একটি অনলাইন চ্যানেলের সঙ্গে আলাপচারিতায় একেবারে বিস্তারিতভাবে জানিয়েছেন, এই দুর্নীতির সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর আপন বড় ভাই, মামাতো ভাই এবং তার সবচেয়ে কাছের রাজনৈতিক কর্মীরা জড়িত। আওয়ামী লীগের সভাপতি জানান, চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক ভূমি মন্ত্রণালয়ে এই অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করে রিপোর্ট দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি দাবি করেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা সেই রিপোর্ট তার সংগ্রহে আছে।

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি যথারীতি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কিন্তু যেটা লক্ষণীয় তা হলো এসব অভিযোগ এসেছে তার নিজ দলের ভেতর থেকে। একই রকম ঘটনা আমরা দেখেছি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময়।

কিছুদিন আগে শেষ হওয়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন বরাবরের মতোই সেখানকার দুই প্রভাবশালী পরিবারের দুই সন্তান শামীম ওসমান এবং সেলিনা হায়াৎ আইভীর ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ হয়ে উঠেছিল। এবারের নির্বাচনেও বরাবরের মতো শামীম ওসমানকে ‘গডফাদার’ তকমা দিয়ে তীব্র আক্রমণ করেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। এই শব্দটি ব্যবহার নিয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখান জনাব ওসমান। এর জন্য আইভীকে পরবর্তীকালে সাংবাদিকদের কাছে এই শব্দটি ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করতে হয়। বলাই বাহুল্য, তিনি তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি।

প্রশ্ন হচ্ছে, আইভী যদি সঠিক হন, তাহলে নারায়ণগঞ্জের একটি সংসদীয় আসনে ক্ষমতাসীন দল দফায় দফায় একজন ‘গডফাদার’কে মনোনয়ন দিয়ে এমপি বানিয়ে যাচ্ছে। আবার এই অভিযোগ যদি সত্য না হয়ে থাকে তাহলে আওয়ামী লীগের একজন খুবই পরিচিত নেতা এবং সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ভয়াবহ এক মিথ্যা অভিযোগ করেছেন আইভী। এখানে ঘটনা যেটাই সত্য হোক না কেন সেটাই আওয়ামী লীগের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর সত্য প্রকাশ করে। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে হলে হয় ক্ষমতাসীন দলকে ‘গডফাদার’-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে কিংবা মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে আইভীর বিরুদ্ধে।

দুটি সাম্প্রতিকতম ঘটনার উদাহরণ দিলাম মাত্র। কিন্তু নিজ দলের এক প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে অন্য নেতার এই ধরনের অভিযোগ এটাই প্রথম নয়। গত কয়েক বছরের পত্রিকার পাতা উল্টালে উদাহরণ পাওয়া যাবে ভূরি ভূরি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো ঘটনার কোনো তদন্ত হয়েছে বলে শোনা যায়নি। কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা একটি খবরের কারণে ব্রিটেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভীষণ উত্তপ্ত হয়ে আছে। ২০২০ সালের মে মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনার লকডাউন ভেঙে তার সরকারি বাসভবনে পার্টির আয়োজন করেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে এভাবে আইন ভাঙার খবর প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে সে দেশের রাজনীতিতে। তার পদত্যাগের দাবি উঠেছে বেশ জোরেশোরে। মজার ব্যাপার হচ্ছে বিরোধী দল, সাধারণ নাগরিক তো বটেই তার নিজ দলের অনেক সংসদ সদস্যও তার পদত্যাগের দাবি তুলেছেন। এ মুহূর্তে জনসনের সেই ঘটনাটির তদন্ত করছে লন্ডন পুলিশ। এই তদন্ত প্রভাব ফেলবে জনসনের প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা না থাকার ওপর।

কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়, কভিডের সময় লকডাউন ভাঙার মতো (বাংলাদেশের বিচারে অতি তুচ্ছ বিষয়) একটি ঘটনার তদন্ত হচ্ছে ইংল্যান্ডে, যার জেরে প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর পরিস্থিতিতে পড়েছেন একজন প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রী। আমি মূর্খ নই, নই ইতিহাসবোধহীনও। তাই বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় এমনকি কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও এমন কিছু ঘটার দূরতম প্রত্যাশাও আমি করি না। কিন্তু এই বাংলাদেশে আর্থিক কেলেঙ্কারি কিংবা মারাত্মক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের বিচার, এমনকি তদন্তও হবে না? তাও আবার যে অভিযোগ কোনো মিডিয়া বা বিরোধী দল নয়, করেছে একই দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।


লেখক — ব্যরিস্টার রুমিন ফারহানা 
আইনজীবী, সংসদ সদস্য ও বিএনপিদলীয় হুইপ।
দেশ রূপান্তর/ফেব্রুয়ারি ১০,২০২২

No comments:

Post a Comment