Search

Saturday, July 3, 2021

আপনার মত প্রকাশ ফ্যাসিবাদকে যেন শক্তিশালী না করে

--------------------------------------

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা 

--------------------------------------


বাংলাদেশে নির্বাচন বলে যে একটা বস্তু, তা বহু বছর হল নাই। জাতীয় থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত যে কোনো নির্বাচন মানেই সরকারি দলের এক তরফা জয়। অনেকেই বলতে পারেন, বিএনপি নির্বাচনের মাঠে থাকে না, তাদের এজেন্টরা ভোটকেন্দ্রে যায় না, ক্যাডার দিয়ে কেন্দ্র পাহারা দেয় না আর তাই আওয়ামী লীগ একচেটিয়া নির্বাচনের দখল নেয়। গণতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরে দাঁড়িয়ে এই ধরণের কথা শুধু বিস্মিতই না, দুঃখিতও করে। এখনও যদি পেশীশক্তি আর পাহারা দিয়ে কেন্দ্র দখলে রাখতে হয়, ক্যাডার দিয়ে প্রতিপক্ষের মাথা ফাটিয়ে মাঠের দখল নিতে হয়, তাহলে কী ধরণের নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হল দেশে? এমনকি পাকিস্তান আমলেও তো নির্বাচন মানে মল্লযুদ্ধ ছিল না। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই রাজনীতিতে শক্তির প্রয়োগ প্রচলিত এবং বহু পুরানো তাহলেও একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। একটি রাজনৈতিক দল তার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে মোকাবেলা করতে পারে; কিন্তু তাকে যদি বছরের পর বছর পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র মোকাবেলা করতে হয় তখন বিষয়টা কেমন দাঁড়ায়? বাংলাদেশে গত এক যুগের বেশি সময় বিএনপিকে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হচ্ছে।      

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দ্য ইলেক্টোরাল ইন্টিগ্রিটি প্রজেক্ট ২০১৯’ তার রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেখানে নির্বাচনের মানের বিবেচনায় বাংলাদেশের স্কোর ৩৮,যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। সারা পৃথিবীতেই বাংলাদেশের চাইতে খারাপ নির্বাচন হয় মাত্র ২১ টি দেশে।  এই স্টাডিতে বাংলাদেশের শুধু ২০১৪ সালের নির্বাচনকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের তথাকথিত নির্বাচন বিবেচনায় নেয়া হলে বাংলাদেশ সম্ভবত থাকতো বিশ্বের সর্বশেষ অবস্থানে। বলে রাখি, ফ্রিডম হাউজের সর্বশেষ রিপোর্টে ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসির তালিকায় বাংলাদেশ আর নেই, যার অর্থ হচ্ছে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার লেশমাত্র নেই বাংলাদেশে।

বিশ্বের নতুন পাঁচ স্বৈরতান্ত্রিক দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ


ইকনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এর মতে বাংলাদেশে এখন হাইব্রিড রেজিম, ফ্রিডম হাইজের মতে আংশিক মুক্ত, কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশ আসলে একটি স্বৈরতান্ত্রিক দেশ যা ২০১৮ সালেই জার্মান গবেষণা সংস্থা বেরটেলসম্যান স্টিফস্টুং পরিষ্কার ভাষায় ব্যক্ত করেছে।

২০২০ সালে প্রকাশিত এই সংস্থার দেশভিত্তিক বেরটেলসম্যান ট্রান্সফরমেশন ইন্ডেক্স (বিটিআই) এ বিএনপি সরকারের শেষ বছর, ২০০৬ সাল থেকে ২০২০ এর মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন সূচকের তুলনা করলে দেখা যায় নির্বাচন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার সম্পর্কিত ২০ টি সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমাগত নিম্নমুখী।

বাংলাদেশের স্বৈরতান্ত্রিকতার স্বীকৃতি এখন আসছে নানাদিক থেকে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে দেয়া এক যৌথ বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সহ ৭ টি মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানানো হয়। কিছুদিন আগে আবারও একই ধরণের অভিযোগ তুলে জাতিসঙ্ঘসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি পদক্ষেপ নেবার আহ্বান জানিয়েছে ১০ টি মানবাধিকার সংস্থা। 

একটি দেশে যখন কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরতান্ত্রিক সরকার থাকে তখন তার অবশ্যম্ভাবী ফল স্বরূপ সেখানে মানবাধিকার, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমশই সংকুচিত হতে থাকে। ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়, ভিন্নমত রুদ্ধ হতে থাকে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে মানুষ এখন লিখতে ভয় পায়, বলতে ভয় পায়, স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে ভয় পায়, হয়তোবা চিন্তা করতেও ভয় পায়। 

এটা এমন এক সময় যখন বুদ্ধিজীবীরাও সত্য সঠিক কথা বলতে দ্বিধাবিভক্ত হন। যাদের জাতিকে পথ দেখানোর কথা তারা ক্ষুদ্র স্বার্থ আর হিসাব নিকেশ কিংবা স্রেফ ভয়ে সরকারের সুরে কথা বলে অথবা চুপ থাকে। এমিরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন ‘দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী সুবিধাবাদিতায় মুখ গুঁজেছেন’। তার ভাষায় ‘বুদ্ধিজীবীরা চামচাগিরি করছেন, মীরজাফরি করছেন। বুদ্ধিজীবীরা তাদের দায়িত্ব  পালন না করে উল্টো কাজ করছেন’। 

এর মধ্যে যে দুই একজন ভীষণ ব্যতিক্রম আছেন, গনস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ জাফর উল্লাহ চৌধুরী তাদের অন্যতম। সম্প্রতি তিনি শিরোনাম হয়েছেন এই কঠিন দুঃসময় বিএনপির হাল যিনি শক্ত হাতে ধরেছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানকে নিয়ে একটি মন্তব্যের মধ্য দিয়ে। দল হিসাবে বিএনপির সহনশীলতা, দলটির নেতা  কর্মীদের সহনশীলতার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে যদি আমরা ফিরে তাকাই বিএনপির শাসন কাল ১৯৯১-১৯৯৬ কিংবা ২০০১-২০০৬ সালের দিকে। সেই সময় আজকের মত সরকারি গোয়েন্দাদের রক্তচক্ষু, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের শতেক ধারা কিংবা অলিখিত নিয়ম মেনে সরকারের সমালোচনাকারীদের গুমের সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কিংবা তার পরিবার নিয়ে বহু মিথ্যা সমালোচনা এমনকি ভয়ানক প্রপাগান্ডাও বহু তথাকথিত সুশীল, বুদ্ধিজীবীকে করতে দেখেছি। এমন কোনও দিন নাই যেদিন দৈনিক সংবাদপত্রের প্রথম পাতা প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের কার্টুন দিয়ে শুরু না হয়েছে। কই তখন তো শুনিনি কারো নামে মামলা হতে, কোনও পত্রিকা বন্ধ হতে, কোনও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কিংবা কোনও বুদ্ধিজীবীর এতটুকু সমস্যা হতে। এখন তো পরিষদ গঠিত হয়েছে কে, কোথায়, কখন, কোন ফেসবুক একাউন্ট থেকে সরকারের সমালোচনা করছে তা খুঁজে বের করে তার বিরুদ্ধে মামলা করতে। আর সংবাদপত্রের কার্টুন? তার সমাধি হয়েছে ২০১৪ সালেই। 

বিএনপির মত বহুত্ববাদি, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, অতি সহনশীল একটি দলের ছাত্র সংগঠনের একজন নেতা কেন তবে প্রতিবাদ করলেন সেদিন ডঃ জাফরউল্লাহর সমালোচনার?  এর কয়েকটি কারণ আছে বলে আমি মনে করি। প্রথমত, গত ১২ বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে প্রধান বিরোধী এই দলটিকে ধ্বংসের চেষ্টা করা হয়েছে। দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে বিনা অপরাধে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দুই বছর কারাগারে থাকতে হয়েছে। এই বয়সে এসে শারীরিক অসুস্থ অবস্থায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটুকু থেকে বঞ্চিত তিনি। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশে ফিরতে পারছেন না। দলের কেন্দ্র থেকে তৃনমূল পর্যন্ত মামলার পাহাড়। গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন ও খুন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এখন নিত্যদিনের রুটিন। এসব কিছু সরিয়ে বাজেটের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিক ভাবে হঠাৎ করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে নিয়ে কটুক্তি দলের কর্মিদের আঘাত দিতেই পারে।

দ্বিতীয়ত, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে বিতর্কিত করার প্রচেষ্টা এদেশে বহুদিন ধরে চলছে। যে দলটি গত এক যুগে দেশ থেকে ভোট ব্যবস্থা বিদায় করে প্রশাসন আর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করে ক্ষমতার আছে তার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার সাহস বেশির ভাগ গণমাধ্যম আর সুশীল সমাজের নেই। তারা আজকে ঘটা গুমের জন্য ১৪ বছর আগে ক্ষমতা থেকে যাওয়া বিএনপিকে দায়ী করেন। নূন্যতম বিবেক বা লজ্জা তাদের নাই। এর মধ্যে অল্প যে কয়জন সত্য বলার চেষ্টা করেন, প্রতিবাদ করেন ডঃ জাফর উল্লাহ তাদের একজন। তাই তার কাছে মানুষের প্রত্যাশাও বেশি। তিনি যখন অপ্রাঙ্গিকভাবে বিএনপির প্রধানকে আঘাত করেন, তখন সেই আঘাত দলের প্রতিটা কর্মীর বুকে লাগে।

তৃতীয়ত, দুঃসময়ের টিকে থাকা সুসময়ের বিপ্লবের শামিল। দেশি বিদেশি চক্রান্ত  মোকাবেলা করে যেভাবে বিএনপি দেশের কোটি মানুষের একমাত্র আশার আলো হয়ে টিকে আছে কেবলমাত্র সে জন্যই সে অভিবাদন পেতে পারে। 

চতুর্থত, এই মুহুর্তে বিরোধী দল বা মতের যে কোনও সমালোচনাই দিনের শেষে ফ্যাসিবাদি এই সরকারের হাতকে শক্তিশালী করবে। এটা দেশ ও জাতিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হবার সময়, পারষ্পরিক সমালোচনা আর বিভেদের সময় না।

পঞ্চমত, বিএনপি প্রতিটি নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান করে। খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা, চিকিৎসক ডঃ জাফরুউল্লাহ চৌধুরী আমাদের সকলেরই শ্রদ্ধার মানুষ। তিনি চাইলে যে কোনও সময়ই তার পরামর্শ দলকে দিতে পারেন। চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকেও জানাতে পারেন। কিন্তু সেই পরামর্শ দেবার জায়গা প্রেসক্লাব হওয়া এই মুহূর্তে কতটা সমীচীন সে ভার আমি তার উপরই ছেড়ে দিলাম।

নিশ্চিতভাবেই বিএনপি একেবারে নিখুঁত কোনো দল নয়; পৃথিবীতেই 'নিখুঁত দল' বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। এই জাতির ইতিহাসের চরমতম স্বৈরাচারী সময়টাতে বিএনপি তার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এই লড়াইয়ে পদ্ধতিগতভাবে বিএনপি'র আর কোথায় কোথায় উন্নতির জায়গা আছে, সেটা নিয়ে আলোচনা হোক, কিন্তু এমন কোনো অযৌক্তিক সমালোচনা বিএনপি'র হওয়া উচিত না, যেটা প্রকারান্তরে বিএনপির নেতাকর্মীদের হতোদ্যম করে এবং দেশের মানুষকে আশাহত করে। আর সেটা হওয়া মানেই হল এই রাষ্ট্রের উপরে প্রচণ্ডভাবে চেপে বসা ফ্যাসিবাদকে আরও শক্তিশালী করা।

  • লেখক জাতীয় সংসদ সদস্য ও আইনজীবী। 

No comments:

Post a Comment