Search

Saturday, September 4, 2021

বিএনপি এক সামাজিক শক্তি, প্রতিটি পরিবারে তৈরি হয়েছে শুভাকাঙ্ক্ষী

—  শওকত মাহমুদ 



শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম-এর সমাধিসৌধ থেকে সামান্য দূরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আজ বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রমনার বটমূলে জিয়াউর রহমানের দল ঘোষণার পর আজকের তারিখটি হতে পারে বিএনপির নয়া অভিযাত্রার, নব উদ্বোধনের।

‘নানান মানুষ নানান পথ, দেশ বাঁচাতে ঐক্যমত’ স্লোগান তুলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি-এর জাতীয় সম্মেলনকে জাতীয় সম্মিলনীতে বিকশিত করার ‘রংধনু’ প্রয়াস, এ উপলক্ষে তৃণমূল পর্যায় থেকে সাংগঠনিক সজীবতা এবং আয়োজনের প্রাণচাঞ্চল্য যদি বিবেচনায় নেওয়া হয়, নেতাদের বিশ্বাস—বাংলাদেশের সমকালীন লোক-চিন্তায় ও রাজনৈতিক অববাহিকায় এ অনুষ্ঠান সম্ভাবনার তরতাজা পলি ছড়াবে। বিএনপির রাজনীতিকে নেতির নেত্রে পরখ করেন না, এমন অভিজন সমাজের ধারণা হলো, এক-এগারোর পর থেকে রাষ্ট্র যেমন গণতন্ত্রে ও সার্বভৌমত্বে বিপন্ন হয়েছে, উপর্যুপরি দুই আমলের নিগ্রহে বিএনপি ততোধিক বিদীর্ণ। ১৬ বছর পর বিরোধী দলে থেকে এ কাউন্সিলকে সফল করা গেলে বিএনপি নিশ্চিতভাবেই ঘুরে দাঁড়াবে। এর পৌঁছ রাষ্ট্র-রাজনীতিতেও বিস্তৃত হবে, ‘তিমির কাঁপিবে গভীর আলোর রবে’।


মাদার অব ডেমোক্রেসি
বেগম খালেদা জিয়া
ইতোমধ্যে বেগম খালেদা জিয়া আবারও চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়েছেন। উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের পরিসংখ্যান সাক্ষ্য দেবে, দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে একজন রাজনৈতিক নেতার শীর্ষ জনপ্রিয়তা, তিনবারের কাউন্সিলে দলের প্রধান হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকা, দলকে বার বার ভোটে বিজয়ী করা এবং সর্বদা সর্বোচ্চ ভোটে সবচেয়ে বেশি আসনে নিজের নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড নজিরবিহীন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত তিনি রাজপথের আপসহীন আন্দোলনে দলকে গড়ে তুলেছেন। সংসদীয় গণতন্ত্র তিনি ফিরিয়ে এনেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন তাঁর হাতে। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে দলের বিপর্যয়েও বেগম জিয়ার প্রাপ্ত ভোট বরাবরের মতো উচ্চতায় ছিল। অনেকেরই চোখে পড়েনি, আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শেষে বিপর্যস্ত রাষ্ট্রকে সুঠাম করার অভিপ্রায়ে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে জাতীয় ঐক্যের ডাক  দিয়েছিলেন। ২০০৮-এর নির্বাচনের ফল বিএনপির জন্য অপমানজনক হয়েছে বটে, কিন্তু দেশ বাঁচানোর জ্বলন্ত আবেগে সরকারকে তিনি সহযোগিতার অঙ্গীকার দিয়ে রেখেছেন। যা ২০০১-এর ভোটের পর বিরোধী দল করেনি। এ জন্য বোধ করি সরকার-নিন্দার বদলে এই জাতীয় কাউন্সিলের স্লোগানে নানান পথে নানান মানুষের জাতীয় ঐক্যই মূলমন্ত্র। থিম সংটাও তাই বলে, ‘বন্ধু-সাথিরা এক মোহনায়/ মিশেছি সবাই এসে লাখো শহীদের রক্তে/ রাঙানো পবিত্র এই দেশে।’ সম্মেলনের পোস্টারে মাঝখানে সূর্য রেখে চারদিকে সাত রঙের রংধনুর অবস্থান, জমিনজুড়ে সৌভাগ্যের হলুদ রং, ওয়েবসাইট উদ্বোধন নতুন উপলব্ধিরই আবাহন। পার্লামেন্টে না যাওয়া, আপাত দুর্বল বিরোধী দল বিএনপির জন্য এই শোডাউন বড় একটি ঘটনা। বেশ কয়েক দিন ধরে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানসহ বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথোপকথনে মনে হয়েছে, পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলকে তাঁরা শুধু আইনি বাধ্যবাধকতার কাউন্সিল মনে করেন না। তার পরও আইন মেনে কাউন্সিল ও গঠনতন্ত্রের সংশোধনীর ক্ষেত্রে তাঁরা যত্নবান। বরং জাতীয় সমস্যাকে জাতীয় ঐক্যে মোকাবিলার জন্য বিএনপির আদর্শিক পুনরুজ্জীবন, সাংগঠনিক ক্ষেত্রে দলকে সুবিন্যস্ত করার অগ্রাধিকারকেই তাঁরা এ মুহূর্তের কর্তব্য হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। এ বিবেচনায় আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল উল্টো পথে হেঁটেছে। তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়া দেখা যায়নি। 

এখন প্রশ্ন হলো, বিএনপি কীভাবে নতুন করে সাজবে? কাউন্সিলের আম অর্থই হচ্ছে পুনর্বিন্যাস। স্থানীয় পর্যায়ের ৭৫ শতাংশে সফল সম্মেলন হয়েছে। বিএনপির কাউন্সিল অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত থেকে আজ পর্যন্ত বিএনপির নতুন সদস্য হয়েছেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। কম কথা নয়। 

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া হালে প্রায় ঘোষণার মতোই বলেছেন, ‘৮ ডিসেম্বরের পর জনগণ নতুন বিএনপি দেখতে পাবে।’ সময়ের দাবিও অবশ্য নতুন পরিচ্ছন্ন বিএনপি। অন্তত এক-এগারোর বিরোধী চেতনায় দুর্নীতিবাজ বলে যাদের কুনাম আছে, তাদের অপরাধও যেন এ অজুহাতে মুছে না যায়। দলের ভেতর-বাইরে এমন উপলব্ধি প্রবল। বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মী তাঁদের অনুভূতির মূল্যায়ন চান। দলের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত একটা চেইন অব কমান্ড থাকবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় না থাকলে বিএনপি সব সময় অপেক্ষমাণ রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু দলটি যে পারফর্ম করতে পারে, আগের উদাহরণ সামনে এনে নতুন করে সাজিয়ে বিএনপিকে তা-ই দেখাতে হবে। সবার প্রত্যাশা, নতুন রক্তের সংযোগ-সাধন ঘটুক। প্রয়াত জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান, তরুণ রাজনীতিক তারেক রহমানের আশু দেশে ফেরার সম্ভাবনা কম। তিনি পুরোপুরি সুস্থ নন। নির্যাতনে তাঁর মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁকে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হবে বহুদিন। সম্প্রতি লন্ডনে তারেক রহমান এক সাক্ষাতে আমাকে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতির মানদণ্ডে একজন রাজনীতিবিদের যে সীমারেখা, তা আমি কখনো অতিক্রম করিনি।’ বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল যদি বিএনপির নবযাত্রার সূচনা করে, তারেক রহমান হতে পারেন ভবিষ্যতের কান্ডারি। সময় হলেই ফিরবেন তিনি এবং বীরোচিত সংবর্ধনায়। এ প্রত্যাশা বহু মানুষের।

আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রমনার বটমূলে সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি গঠনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। দলের ঘোষণাপত্র তিনি পড়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ দাঁড়াবে নিজের পায়ে, চলবে আত্মশক্তিতে।’ স্বাধীনতার ঘোষক জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন এবং দল ও রাষ্ট্র গঠনের সুবিশাল যজ্ঞ, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তনসহ রাজনৈতিক সংস্কার দেশকে নতুন পরিচিতি, নতুন স্বয়ম্ভরতা দিয়েছিল। বিশ্ব ও দেশবাসীর সামনে থেকে তীব্র দেশপ্রেমে ও আত্মিক সততায় তিনি তাঁর পূর্ব সময়কে পৃথক করতে পেরেছিলেন। ‘The Final test of a leader is that he leaves behind him in other men the conviction and the will to carry on’ — বিলেতি রাজনীতির এই পর্যবেক্ষণ জিয়ার জন্য বেশি প্রযোজ্য। আজকের বিএনপির জন্য জিয়ার দেশপ্রেম, সততা ও নিঃস্বার্থের আদর্শ, দলের ঘোষণাপত্রের চেতনা এবং বেগম জিয়ার উদার গণতন্ত্র হতে পারে নবযাত্রার মূল ভিত্তি। অভিজন সমাজের মতে, ৩১ বছরের যাত্রায় বিএনপি কিন্তু আওয়ামী লীগের পাশাপাশি এক সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি পরিবারে এখন বিএনপির সদস্য, সমর্থক বা শুভাকাঙ্ক্ষী তৈরি হয়েছে।

—  লেখক ভাইসচেয়ারম্যান, বিএনপি। সাবেক সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব ও বিএফইউজে। লেখাটি ২০০৯ সালে রচিত। 

Thursday, August 12, 2021

কোকো ভাই ——— লুনা রুশদী


মা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে আরাফাত রহমান কোকো

সময়টা ১৯৮৮ অথবা ৮৯ সাল হবে। কোকো ভাই যখন মেলবোর্ন এসেছিল লেখাপড়ার জন্য, বেগম খালেদা জিয়া তখন বিরোধী দলের নেত্রী। এরশাদ ক্ষমতায়। তখনও বোধহয় পল কিটিং অস্ট্রেলিয়ার প্রাইম মিনিস্টার হন নাই। সে বছর বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিলো। বন্যার্তদের সাহায্যের জন্য আমরা অস্ট্রেলিয়ায় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। এই অনুষ্ঠানের মহড়ায় তার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়। 

সেই স্মরণীয় দিনে মোনাশ ইউনিভার্সিটির একটি হলরুমে আমাদের মহড়া চলছিলো। সিঁড়িতে উঠে একটা টানা বারান্দা পার হয়ে যেতে হতো সেই হল রুমে। এখান থেকে গানবাজনার শব্দ শোনা যেত, মানুষের কথাবার্তা, হাসাহাসিও। আমি সিঁড়িতে উঠতে উঠতে দেখলাম উপরে রেলিংয়ের উপরে একজন তরুণ বসে আছেন। তাকে ঘিরে ফয়সল ভাই, মিকি ভাই, বাবু ভাই আরো অনেকে বসা। রেলিংয়ে বসা লোকটিই ছিলেন কোকো ভাই। কালো রঙের একটা লেদার জ্যাকেট গায়ে ছিল আর নীল জিন্স।

আমাদের একটা গ্রুপ ছিল, প্রতি মহড়ার পরেই আমরা একসাথে ঘুরতাম। কোকো ভাই, ফয়সল ভাই আর আরো কয়েকজন একটা বাসা শেয়ার করে থাকতেন। এই বিষয়টি নিয়ে ফয়সল ভাই বেশ গর্বিত ছিল, মনে আছে। আমাকে একবার সে বলেছিল, ‘কোকোকে আমি প্রথম দেখছিলাম টিভিতে!’ বলার সময় উনার গলা খুশীতে কাঁপছিল।  প্রথম যখন ওই বাসায় উঠেছে, কোকো ভাই নাকি মেঝেতে বিছানা করে ঘুমাতেন। এটি ছিলো ওনার বড় গুণ। আমার সারাজীবনের স্বভাব সবচেয়ে অপ্রিয় প্রশ্ন করা। আমি একবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি জিয়াউর রহমানের ছেলে?’ মানে আমার মাথায় তখন ঘুরপাক খাচ্ছিল ছোটবেলায় টিভির খবরে দেখা জিয়াউর রহমানের মুখ, একটা কোদাল হাতে, গেঞ্জি পরা ছবি ছিল না উনার? তারপরে যেবার আশুফুপুর বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম কুমিল্লায়, আমার তখন বোধহয় পাঁচ-ছয় বছর বয়স। আমিসহ সবার চোখে অসুখ হয়েছিলো সে বছর। ওই চোখ নিয়েই ফুফু একদিন কোথায় যেন বেড়াতে গিয়েছিলেন। তখন খবর  পেলাম জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে। খবরটা শুনে কেমন অস্থির লাগছিল।

তাই কোকো ভাইকে করা আমার প্রশ্নটা যতই বেমানান হোক, এইটা আসলে একটা অস্বাভাবিকভাবেই করেছিলাম। উনি হাসা শুরু করেছিলেন। তারপরে বলল, ‘হুম, লোকে তো সেইরকমই সন্দেহ করে’। তারপরে স্বভাব-সুলভ ভঙ্গিতে আমার সাথে ঠাট্টা করল, গণ্ডার ডাকল। কারণ উনার সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যাওয়ার এতদিন পরে এই প্রশ্ন আমার মনে আসছে। অনুষ্ঠানের দিন কোকো ভাই মঞ্চে উঠে কিছুক্ষণ কথা বলছিল। কী বলছিল মনে নাই, তবে মঞ্চে উনারে দেখতে অন্যরকম লাগছিল, এমনিতে আমাদের সাথে আড্ডা দেয়ার সময় উনাকে কোকো ভাই ছাড়া আর কিছু মনে হত না, মজার মজার কথা বলত, সবাইকে হাসাত, দাঁত উঁচু ছিল কিন্তু চোখ অনেক সুন্দর থাকায় উঁচু দাঁত খেয়াল করতাম না।

মঞ্চে তাকে একটু একটু জিয়াউর রহমানের মতন লাগছিল। ওইরকম সানগ্লাস ছিল উনার। মঞ্চে কি সানগ্লাস পরা ছিল? না বোধহয়। ও রকম হলে তো হাসি আসত নিশ্চয়ই। তবে প্রথমেই ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলছিল মনে আছে। এটা মনে আছে কারণ, উনি নেমে আসার পরে অনেক মহিলারা উনাকে বলছিল উনি নাকি ঠিক উনার আব্বার মতন করে বক্তৃতা শুরু করেছেন, এতে সবাই খুশি হয়েছিল। কোকো ভাই লাজুক লাজুক হাসতে হাসতে সবার প্রশংসা শুনতেছিল। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরেও আমাদের বন্ধুত্ব ছিল।

কোকো ভাই পার্টটাইম চাকরি করত হান্টিংডেল-এর পিৎজাহাটে। আমাদের বাসার খুব কাছে। মাঝে মাঝে বাসায় আসত। পিৎজাহাটের লাল টিশার্ট আর কালো টুপিতে উনারে দেখা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল আমাদের। গরমের দিনে উনার ডিউটি শেষে বাসায় আসলে মাঝে মাঝে সবাই একসাথে মুভি দেখতাম। মাঝেমাঝে বেশ কয়েকজন মিলে ব্যাডমিন্টন খেলতে যেতাম। দৌড়াতে না পারলে বলত, ‘কীরে দুর্বল লাগে? সাগু খাবি?’ ভালো ড্রাইভ করত। উনি খুব স্বাভাবিক থাকত সবসময়, যে কোনো জায়গাতেই কমফোর্টেবল মনে হত। নার্ভাস ছিল না আবার অ্যারোগেন্টও না। তাই যে কোনো গ্রুপ সিচুয়েশনে উনি চুপচাপ থাকলেও লিডারশিপ উনার কাছেই আসত। আর উনিও এভাবে চালিয়ে নিত যে সহজে তা বুঝা যেত না। মাঝে মাঝে আমাকে বলত, ‘তোরা এত ইনোসেন্ট ক্যান?’ উনার বলার ভঙ্গিতে মনে হত ইনোসেন্ট হওয়াটা বেশ দোষের একটা কাজ।

এরপর বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসলেন। তখন বুঝি নাই, এখন মনে হয় সেইটা বিশাল ঘটনা ছিল আসলে। জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার দশ বছর পরে আবার বিএনপি ক্ষমতায় আসল। কোকোভাইও নিশ্চয়ই এই পরিবর্তন টের পেয়েছিল। অথচ উনার চলাফেরায় বা আমাদের সাথে মেলামেশায় সেইরকম কিছু বুঝতে পারা যায় নাই। আমরা তখনও আগের মতনই ব্যাডমিন্টন খেলতাম, মুভি দেখতাম, বিচে বেড়াতে যেতাম। শুধু বাংলাদেশীদের মধ্যে তার খাতির বেড়ে গিয়েছিল। অনেক দাওয়াত পেত। আর সেইসময় মেলবোর্নে বাংলাদেশি কমিউনিটি এত বড় ছিল না। সবাই প্রায় সবাইকে চিনত। দেখা যেত আমাদের দাওয়াতগুলো কমন পড়ছে। দাওয়াতেও আমরাই আড্ডা দিতাম। আর কোকো ভাইয়ের জনপ্রিয়তা নিয়ে তাকে ক্ষেপাতাম। ততদিনে তিনি পিৎজাহাটের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, প্লেন চালানোর লেসন নিতে শুরু করছিল। মাঝে মাঝে যখন ব্যাডমিন্টন খেলতে যেতাম, তিনি গিয়ে একদম অপরিচিত সাদা লোকেদের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলায় কথা বলতে থাকতেন, ওরা কিছুই না বুঝে হাসত, এমনটা যে কতবার করছে! একবার মনে আছে, খেলার ব্রেকে বাইরের পাবলিক ফোন বুথ থেকে ফোন করছিল। আমিও সাথে আসছিলাম। পিছনে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম। কাকে যেন বলছিল তার এক বন্ধুর কথা। যে কোনো একটা ব্যবসায়ের বিষয়ে দেখা করতে চায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে। কোকোভাই বলেছিল ‘আম্মাকে বলবেন, আমার বন্ধু বলে কোনো স্পেশাল ফেভার করার দরকার নাই।’ আমার মজা লাগছিল দেখতে। একটা মানুষরে দুই রকম দেখছিলাম। সেই সময়টা মনে আছে, আমরা মোনাশের স্পোর্টস অ্যান্ড রিক্রিয়েশন সেন্টারের সামনের উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মানে আমি দাঁড়িয়েছিলাম, আর তিনি তখনও ফোনবুথে, কত মানুষজন আসছিল-যাচ্ছিল, কেউ উনারে চিনে না।

দেশে ফিরে যাওয়ার আগে আমাদের বাসায় যখন বিদায় নিতে আসল কোকো ভাই, আমি জানতাম তাকে বিদায় দেয়া অন্য বন্ধুদেরকে বিদায় দেয়ার মতন না। দেশে গেলে তিনি তো আর কোকোভাই থাকবেন না, আরাফাত রহমান কোকো হয়ে যাবেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাদের সাথে কি আর বন্ধুত্ব হয়? পেপারে খবর পড়তে হয় তাদের নিয়ে। যেমন আজকে পড়ছি তার মারা যাওয়ার খবর। এই মানুষটাকে শুধু এমন একজন মানুষ হিসেবেই চিনতাম তো আমি, তার জন্য ব্যক্তিগত শোকের স্পেস আছে কীনা কে জানে।

  • লেখিকা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি, অসওয়াইড ফাইনান্সিয়াল প্ল্যানিং এ কর্মরত। 
     


রাজনীতির অঙ্ক ওল্টানো একজন ক্রীড়াপ্রেমী — মোস্তফা মামুন


আরাফাত রহমান কোকো
আগস্ট ১২, ১৯৬৯ — জানুয়ারি ২৫, ২০১৫

আরাফাত রহমান কোকোর সঙ্গে প্রথম পরিচয়টা খুব মনে রাখার মতো কিছু ছিল না। ক্রিকেট বোর্ড অফিসে নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘আমি অমুক’। হাত মিলিয়েছিলেন কিন্তু তাতে এমন কোনো আন্তরিকতার ছাপ নেই। হতাশ হওয়ার মতো ব্যাপার। আমাদের দেশে রাজনীতিকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাবান কিন্তু তাদের অনেক দোষ থাকলেও প্রকাশ্যে তারা ভীষণ আন্তরিক। সেদিন বুঝলাম, রাজনীতিক এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। রাজনীতিকদের মনে যাই থাকুক, মুখে থাকে হাসি। সন্তানদের ক্ষেত্রে বিষয়টা সেরকম নয়। তারা দেখানোর জন্যও কাউকে খুব পাত্তা দিতে রাজি নন। এরপর আর তার কাছ ঘেঁষার প্রশ্ন নেই। যথাসাধ্য দূরত্ব রক্ষা করেই চলেছি।

কয়েক মাস পর অস্ট্রেলিয়া সফর। ডেভ হোয়াটমোরের বাংলাদেশ দলের সঙ্গে সেই সফরে গিয়ে শুনলাম আরাফাত রহমানও এসেছেন। নিজে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করেছেন বলে সেই জায়গাটা নিয়ে বাড়তি আগ্রহও আছে। ডারউইন বা কেয়ার্নসে একদিন মাঠেও এলেন। সঙ্গীদের নিয়ে ছবি-টবি তুললেন। এটাও অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার না। আমাদের কর্তারা বিদেশে গেলে ব্যক্তিগত অ্যালবামের ঐশ্বর্য বৃদ্ধির চেষ্টা করে থাকেন। ম্যাচ শেষে প্রেসবক্সে লিখছি, এই সময় তার একজন সঙ্গী এসে জানালেন, ‘কোকো ভাই আজ রাতে দলের জন্য একটা ডিনার দিচ্ছেন। তিনি চান, সাংবাদিকরাও সেখানে থাকুন। আপনাদের সবার আমন্ত্রণ।’

অস্ট্রেলিয়া পত্রিকার সাংবাদিকদের জন্য খুব সুবিধাজনক একটা জায়গা। খেলাটা বাংলাদেশ সময় দুপুরের মধ্যে শেষ হয়ে যায় বলে লেখার অনেক সময়। সুযোগ থাকে লেখা শেষ করে দাওয়াত রক্ষার। আমরা প্রেসবক্সে আলোচনা করে ঠিক করে ফেললাম, যেহেতু দাওয়াত দিয়েছেন তাই যাওয়া উচিত। আর তাছাড়া খেলোয়াড়দেরও একসঙ্গে পাওয়া যাবে। পরদিনের স্টোরির জন্যও রাতের খাবার আদর্শ জায়গা।

যেতে আমাদের দেরি হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের প্রায় আধ ঘণ্টা পর। আর গিয়ে যা দেখলাম তাতে চমকে উঠলাম। প্রথম পরিচয়ে উন্নাসিক মনে হওয়া, ক্ষমতাবানসুলভ অহমিকা দেখানো মানুষটা তখনও না খেয়ে বসে আছেন। আমরা যেতেই উঠে এগিয়ে এলেন। সবার সঙ্গে এমনভাবে হাত মেলালেন যেন আমরা না যাওয়া পর্যন্ত অনুষ্ঠান পূর্ণতা পাচ্ছিল না। আর তাতে দূরত্বের দেয়ালটা ভেঙ্গে গেল যেন। ঢাকায় যা হয়নি সেই দূর অস্ট্রেলিয়ায় সেটা হলো। তার সঙ্গে বেশ লম্বা সময়ের আড্ডা। সেখানে পারিবারিক পরিচয়ের আবহ ছেড়ে যে কোকো বেরিয়ে এলেন তার চোখে ক্রিকেট নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন। আর চোখে ঝলমল করা সেই স্বপ্নে তাকে আর প্রধানমন্ত্রীর ছেলে মনে হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল শুধুই একজন নিবেদিতপ্রাণ ক্রিকেট সংগঠক। রাজনীতি বা ক্ষমতার শক্তি নয়, ক্রিকেট ভালোবাসাই তার একমাত্র শক্তি।

এটা ঠিক যে রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবাদেই তিনি ক্রিকেট বোর্ডে এসেছিলেন। কিন্তু সেটা কে আসে না! এখনও যে বা যারা ক্রিকেট বোর্ডে আছেন তাদের পরিচয়ও তো রাজনৈতিক। কিংবা ব্যবসায়ী। কাজেই সেই জায়গা দিয়ে বিবেচনা করলে প্রায় সবাইকে বাদ দিতে হয়। বিবেচনার পরিবর্তিত মানদণ্ড তাই তিনি কীভাবে এসেছেন সেটা বড় কথা নয়, এসে কী করলেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর এই জায়গাটাতে আরাফাত রহমান অন্য অনেকের চেয়ে আলাদা হয়ে গেছেন। তখনকার নিয়ম অনুযায়ী সরকার যাকে ইচ্ছা তাকেই বোর্ড সভাপতি পদে মনোনয়ন দিতে পারত। কাজেই ক্ষমতার চূড়ান্ত চর্চা করলে বোর্ড সভাপতি হতে পারতেন। হননি। দায়িত্ব পালন করেছেন ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে, সেটা বোর্ডেরই অধীন একটা কমিটি। পরে অনেকের কাছে অনেক কথা শুনেছি বটে কিন্তু সেই সময় মাঠে-ঘাটে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেও তার বলয়ের বাইরে বাড়তি কোনো হস্তক্ষেপের কথা শুনিনি। এমন কিছু দেখিনি যাতে মনে হয়, তিনি শক্তি খাটানোর চেষ্টা করছেন। বরং দেখা গেছে, দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে অন্য অনেক লোভনীয় জায়গা বাদ দিয়ে তিনি ডেভেলপমেন্ট কমিটির মতো একটা প্রায় থ্যাংকসলেস কমিটিকে বেছে নিয়েছেন। আর তাতে হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ক্রিকেটার তৈরির দারুণ একটা পথ তৈরি করেছেন। অস্বীকারের উপায় নেই, আজকের সাকিব-মুশফিকরা সেই দূরদর্শী হাই পারফরম্যান্সেরই ফল। মোটের উপর পরের কয়েক বছরের সাপ্লাই লাইনটা তৈরিই হয়েছিল এই কমিটির মাধ্যমে। কমিটির প্রধান হিসাবে মূল কৃতিত্বটা তারই পাওনা।

কেউ কেউ তবু বলবেন, ঐ তো হলো! প্রধানমন্ত্রীর ছেলে বলেই তো...। তাদের জন্য একটা উত্তর আছে। বোর্ডে যারা ক্ষমতার জোরে আসেন তাদের মধ্যে কতজন পাওয়া যাবে যারা মাঠে ক্রিকেট খেলেছেন! হ্যাঁ, তিনি ডিওএইচএস ক্লাবের হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলেছেন। দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট আর এমন কী ক্রিকেট! এই প্রশ্নও আসবে জানি। কিন্তু মা যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট খেলাটা তো একইসঙ্গে পারিবারিক শক্তি না দেখানোর মানসিকতারও প্রকাশ। ১৯৯১-৯২ সালে খেলেছেন ক্রিকেট, যখন রাজ্যপাঠ পুরো তার পরিবার এবং দলের দখলে। এসবই প্রমান করে, অন্য ক্ষেত্রে যত কথা বা আলোচনাই থাক খেলার মাঠের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল পুরনো। ভালোবাসাটা ছিল খাঁটি।

বুঝতে পারি এখন যারা তার কীর্তিকে স্মরণীয় করতে এই বই প্রকাশের চেষ্টা করছেন তাদের খুব ঝামেলা হচ্ছে। লেখা দিতেও সম্ভবত চেনা অনেকেই রাজি হচ্ছেন না। কিন্তু আবার দেখবেন, সময় বদলে গেলে এরাই তার নামে ঢোল বাজাতে বাজাতে ফাটিয়ে ফেলবেন। আরাফাত রহমান বা রাজনৈতিক পরিবারের মানুষের এই একটা সমস্যা তারা না চাইলেও অনেক অঙ্কের মধ্যে ঢুকে পড়তে হয়। রাজনৈতিক বিরোধী শক্তি তো ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করবে, সঙ্গে নিজেদের মানুষদের বেশি বড় করার চেষ্টাও তাদের অর্জন প্রশ্নের মুখে ফেলে। অথচ কী জানেন আরাফাত রহমানের মোটেও সেটা প্রাপ্য নয়। তিনি তো আমাদের খেলার জগতে রাজনৈতিক হিসাব ভেঙ্গে দেয়ার নায়ক। কীভাবে?

কাছের মানুষদের তথ্য অনুযায়ী তিনি ছিলেন আবাহনীর সমর্থক। আবাহনীর প্র্যাকটিস দেখতে ধানমণ্ডি ছুটে যেতেন বলে জানা গেছে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে। সেই আবাহনী, যার প্রতিষ্ঠাতার নাম শেখ কামাল। যে ক্লাবের সঙ্গে তার প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িয়ে সেই ক্লাবকে নিজের ক্লাব করতে একটুও অসুবিধা হয়নি। খেলা তার কাছে এত বড় ছিল যে রাজনীতির অঙ্ক পাত্তাই পায়নি।

তাই যদি হয় তাহলে তো হাইপারফরম্যান্স-ডেভেলপমেন্ট কমিটি এসবের চেয়েও এটা বড় ব্যাপার। খেলায় রাজনৈতিক বিভক্তি আর শক্তি ব্যবহারের কালো ছায়ার বিপরীতে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন বিভেদমুক্তি আর ভালোবাসার সৌন্দর্য নিয়ে।

 

  • লেখক উপ সম্পাদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ এবং সভাপতি, বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতি,  ২০১৬-২০১৯ । বর্তমানে তিনি দৈনিক দেশরূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক।   

 


Monday, July 26, 2021

বাংলাদেশের ভবিতব্য ও তারেক রহমান

 ---------------------------------------------------
শামা ওবায়েদ
---------------------------------------------------



বাংলাদেশের মানুষ এক দুঃসহ সময়ের মধ্যে বসবাস করছে। করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণের মাত্রা দিনে-দিনে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষের মৃত্যুতে ভার হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। শুরু হয়েছে অপরিকল্পিত লকডাউন--- যেখানে জীবিকা আর প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে মানুষের নাভিশ্বাস সংগ্রাম। রাষ্ট্রজুড়ে বর্তমান আওয়ামী লীগের বিনা নির্বাচিত সরকারের দুর্গতিসম্পন্ন ব্যবস্থাপনা।

এই রকম পরিস্থিতির মধ্যে দেশের প্রধানতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা, সাবেক তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এক-এগারোর মামলায় সাজা দেওয়া হচ্ছে। অথচ একইসময়ে করা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেই মামলাগুলো নেই। এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসা বঞ্চিত করছে সরকার। অথচ, এক-এগারোর সময় বেগম খালেদা জিয়াই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিকিৎসার জন্য সোচ্চার ছিলেন।

দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয়, নেতৃত্বদানকারী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রধান, সাবেক নির্বাচিত তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেক্টর ও ফোর্সেস কমান্ডারের সম্মানিতা স্ত্রী, বেগম খালেদা জিয়া গুলশানের ফিরোজায় ব্যক্তিগত ও হাসপাতালের চিকিৎসকদের সমন্বিত বোর্ডের অধীনে আছেন। তার মুক্তিকে যেমন বাধাগ্রস্ত করে রাখা হয়েছে, তেমনি মানুষের স্বাভাবিক জীবনকেও আটকে রেখেছে সরকার।

সব মানুষের মনে ক্ষোভ, জীবনবঞ্চনার হাহাকার। চরিত্রহীন একটি রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতর দিয়ে স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে দেশ পরিচালনায় রয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে ‘খারাপ সরকার’টি।

‘নিখোঁজ গণতন্ত্র’ এ অধ্যাপক আলী রীয়াজ লিখছেন, ‘২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হলো একটি হেজিমনিক ইলেকটোরাল অথরিটারিয়ান শাসনব্যবস্থা বা আধিপত্যশীল নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদী শাসন।’

একইভাই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ‘বাৎসরিক রিপোর্ট: বাংলাদেশ ২০২০’ তেও বাক স্বাধীনতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ নানা বিষয়ে এই দেশের উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সামনে এসেছে। আর ক্ষুণ্ণ হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি। সর্বশেষ ৮ জুলাই প্রকাশিত যুক্তরাজ্যের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই প্রতিবেদনেও এসেছে নারী ও শিশু নির্যাতন, গণমাধ্যমের উপর ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের চাপ প্রয়োগসহ নানা বিষয়।

আইন ও শালিস কেন্দ্রের একটি প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে ইতিহাসের বর্বরতম সরকারের চিত্র। প্রতিষ্ঠানের একটি তথ্য বলছে, ‘২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত অপহরণের শিকার হওয়া ৩১০ জনের মধ্যে মাত্র ৩৩ জন ফিরে এসেছেন।

ফিরে আসাদের সংখ্যা নিয়ে বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যের পার্থক্য থাকলেও যারা ফিরে আসেন, তারা যেন স্বাভাবিক থাকতে পারেন না। একটা ভীতি, একটা ভীরু পরিবেশ বজায় থাকে চারপাশে। সংবাদপত্রে দেখি, তারা কেউ কথা বলতে চান না।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বিপরীতে দলান্ধ, দুর্নীতিগ্রস্থ রাখার মধ্য দিয়ে এই ভীরু পরিবেশ স্থায়ী রাখার ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, মূল্যবোধ, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা ।

ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের ভীতি সারাদেশে ছড়িয়ে স্বৈরশাসনের সবরকম প্রতিবাদ রুখে দেওয়ার পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। আর এই ভীতির সাম্রাজ্যে একমাত্র হুমকি তারেক রহমান-- যার নেতৃত্বে বাংলাদেশের আসন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছে মানুষ।

সুদূর লন্ডনে বসে করোনাভাইরাসের শুরু থেকেই দেশের মানুষের সেবায় নিয়োজিত হয়েছেন তারেক রহমান। তার নেতৃত্বাধীন বিএনপির নেতাকর্মীরা সারাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিপন্ন মানুষকে তার নেতৃত্ব, নির্দেশনায় দেওয়া হয়েছে ত্রাণ, খাবার, নিত্যপণ্য। পুরো দল সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করে দেশের মানুষের সঙ্গে লড়াই করেছেন। আর এই বেঁচে থাকার কঠিন সময়েও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে আহত হয়েছেন অনেক সহকর্মী। নিমর্মভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন ত্রাণ কার্যক্রম। তবুও, মানুষের পাশেই আছে বিএনপি। তারেক রহমানের আবারও নির্দেশনা, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর।

পলিমাটির এই দেশের সাধারণ মানুষমাত্রেই জানেন আসন্ন ভবিষ্যতের নির্মাণ শুরু হবে তারেক রহমানের হাত ধরে। তারা জানেন যে খাল কেটে, বস্ত্র রপ্তানি করে, সার্ক গঠন করার মতো অগণিত উদ্যোগ ও নেতৃত্ব বাংলাদেশকে স্বাবলম্বী করে তোলার অবিচ্ছেদ্য রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের ছেলেও সেই সাধারণ মানুষের মায়ামমতায় আশ্রিত। বহু দূরে বসে স্বদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

বাংলাদেশে একদিকে ঝকঝকে উন্নতির ফানুস, আড়ালে লুটপাট আর জোর-জুলুম--এমন পরিস্থিতিকে আরও শাণিত করতে, রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদি সংঘের অন্যায়, অবাধ অপশাসনের যাত্রা আরও অব্যাহত রাখতেই; এই বিক্ষুব্ধ মানুষের, জনমানুষের নেতা তারেক রহমানকে টার্গেট করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি বাংলাদেশবিরোধী শক্তি তার রাজনৈতিক জীবনের উন্মেষের সময় থেকেই তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এসেছে, রাজনীতিতে থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন মেজর জিয়াউর রহমান ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে, আবার যখন বাংলাদেশকে হারিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র প্রায় ঘনিয়ে এসেছিলো-- সিপাহী-জনতার সমন্বিত প্রতিরোধের মুখে তাদের বিজয়ী করেন জিয়াউর রহমানই। এরপর তাকে শহীদ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আবারও হারানোর চক্রান্ত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষার বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে নেতৃত্বে এসেছেন বেগম খালেদা জিয়া। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে দেশের মধ্যাহ্নে নিয়ে এসে নির্বাচিত সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। অবিচল আপোষহীনতার মূর্ত প্রতীক বেগম খালেদা জিয়ার সেই সংগ্রামের পথ ধরেই বাংলাদেশকে জেতাবেন তারেক রহমান।

দেশে ভোট নেই, মানুষের অধিকার নেই, নারীর নিরাপত্তা নেই, প্রত্যেক মানুষকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে রেখে ‘ফ্যাসিবাদি রাষ্ট্রের’ পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার চক্রান্তকে কেবলমাত্র তার নেতৃত্বই নস্যাৎ করতে পারে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে ‘ব্যর্থ’ করে রাখার যে চক্রান্ত অব্যাহত আছে, তার শুরুটা মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই। সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে টার্গেট করা হয়েছে।

এক-এগারোর সময় নির্যাতন করে তাকে মেরে ফেলার অপচেষ্টাও হয়েছে। ওই সময় আমার বাবা, বিএনপির সাবেক মহাসচিব কেএম ওবায়দুর রহমান ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ওই সময় টিভিতে সংবাদ দেখে বলেছিলেন-- ‘মা দেশনেত্রী; দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বাবা মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, তাদের সন্তানের সাথে এভাবে আচরণ করছে, এইটা ফেস করতে হবে, ভাবিনি। তার বাবা তো দেশ স্বাধীন করেছেন।’

বাংলাদেশের জন আকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল ও দলের সর্বস্তরে এখন অটুট ঐক্য। কেবল জাতীয়তাবাদী আদর্শবাদীরাই নয়, তিনি নতুন প্রজন্মেরও প্রত্যাশার প্রতীক। যিনি তারুণ্যকে ভাস্বর করে হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের ভাবী রাষ্ট্রপ্রধান। এইসব দেশপ্রেমের নৈকট্য আওয়ামী লীগ মেনে নিতে পারে না-- যাদের হাতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ হয়, যাদের হাতে বিনাবিচারে বিনাকারণে মানুষ গুম হয় আর যারা উন্নয়নের আড়ালে দেশবিক্রি করে দেয়। পৃথিবী বহুবার স্বৈরশাসনের অবসান দেখেছে। জনগণ ক্ষিপ্ত, জীবন বিপন্ন। এই ব্যর্থতায় ক্ষমতাহারানোর ভয়ে বিচলিত হয়ে পড়েছে শাসনকক্ষ। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে যে ষড়যন্ত্রমূলক অপ্রচারণা চলছে, সেগুলো একছকে বাঁধা। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও এই ‘সংঘবদ্ধ ছকে’ই মঞ্চায়িত হয়েছে বাংলাদেশকে ব্যর্থ করে দেওয়ার সব ষড়যন্ত্র। আর বারবারই বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী শক্তি তা পরাজিত করেছে।

— লেখক বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি'র সাংগঠনিক সম্পাদক 

বাংলাদেশে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম সংস্কারক শহিদ জিয়া

 

-----------------------------------------

ওয়াসিম ইফতেখার 

-----------------------------------------



'নারীরা দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী' — তাঁদেরকে কর্মহীন রেখে দারিদ্র বিমোচন ও সমৃদ্ধি অসম্ভব। নারীর সক্ষমতাকে বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁদেরকে দেশ বিনির্মাণের হাতিয়ারে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তা প্রথম উপলব্দি করে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করেন  শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম। তিনি বিশ্বাস করতেন যে নারীদেরকে উন্নয়ন উৎপাদনে সম্পৃক্ত করাই আধুনিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত। আর এইভাবেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব ও ভবিষ্যতমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে  শহীদ জিয়া হয়ে ওঠেন ‘আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি’। 

ঐতিহাসিকভাবে রক্ষণশীল বাংলাদেশে নারীরা সাধারণত ঘরেই অবস্থান করতেন এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁদেরকে সম্পৃক্ত করার কোন উদ্যোগই ছিলনা। নারীদের সচেতন করে তাঁদেরকে ঘর থেকে বের করে পড়ালেখায় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। সেই কাজটি করেছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম। সেই লক্ষ্যে তিনি আইন প্রণয়ন  ও কর্মসূচি গ্রহণ করেন। আর এভাবেই বাংলাদেশে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম সংস্কারক শহীদ জিয়া। 

পরবর্তীতে স্বৈরাচার এরশাদশাহীর আমলে শহীদ জিয়া প্রণীতসব যুগান্তকারী উদ্যোগের মতো নারীউন্নয়নের কর্মসূচিও থেমে যায়। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-২০০৬ পর্যন্ত সময়কালে জিয়া প্রণীত 

নারীউন্নয়ন কর্মসূচিকে বৈপ্লবিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যান।  

দেশের উন্নতিতে নারীদের গুরুত্ব তুলে ধরতে শহীদ জিয়ার উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে। 

তিনি বলেন  — 

“দুটি সবল হাত থাকলে একটা কাজ যত সহজে করা যায়, একহাত সে কাজ অসম্ভব হতে পারে। পুরুষ এবং মহিলা সমাজের দুটি হাতের মতন। দেশকে মনের মত গড়তে হলে দু’টি হাতেরই দরকার এবং দুটোকেই সবল হতে হবে।” 

সূত্র —  দৈনিক দেশ/ জানুয়ারি ৩০, ১৯৮১। 



নারীদের চাকুরীর ব্যবস্থা করতে শহীদ জিয়া বিশেষ পদক্ষেপ নেন। যেমন —   নারীদের জন্যে সরকারি চাকরিতে শতকরা ১০ ভাগ পদ নির্ধারিত করে নির্দেশ জারি করেন। শিক্ষকতাসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে যতদিন না মহিলাদের কোটা পূরণ হয় ততদিন কেবল মেয়েদেরই নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ জারি করেন। ফলে মেয়েদের কোটা পূরণ হতে বেশি সময় লাগেনি।

১৯৭৮ সালে প্রথম  মহিলা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এবং মহিলা মন্ত্রী নিয়োগ করেন।

প্রথম মহিলা কর্মজীবী হোস্টেল নির্মানের ব্যবস্থা করেন । অনেক কর্মজীবী মহিলারা এতে উপকৃত হয়েছেন এবং চাকরিকালে তাঁদের বাসস্থানের সমস্যা অনেকাংশে দূর হয়।

তিনি নারী সমাজকে স্বনির্ভর করতে চেয়েছিলেন। তিনি বুঝতেন যে মেয়েরা নিজেরা যদি উপার্জনক্ষম হয়, তাহলে সেই পরিবারের সকলের কাছে তাঁর মর্যাদা বেড়ে যাবে এবং নারীদের উপর অযথা হয়রানি ও অত্যাচার কমে যাবে।

তিনি বুঝতেন মেয়েরা শিক্ষিত হলে সেই পরিবারের ছেলেমেয়েরাও শিক্ষিত হবে। মেয়েদের আত্মবিশ্বাস এবং সমাজে মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তিনি মেয়েদের গ্রামপ্রতিরক্ষা দলেও অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর সময়েই গ্রামপ্রতিরক্ষা বাহিনীতে ৩৫ লাখ মহিলা সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয়।

প্রেসিডেন্ট জিয়া বিশ্বাস করতেন পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীতে নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তাঁদেরকে এগিয়ে নিতে হবে।

আনসার, পুলিশ বাহিনীতে নারীদের নিয়োগ দেন জিয়া। 

তিনি অনুধাবন করেছিলেন ক্রমবর্ধমান অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রনে ও নারীর ক্ষমতায়নে প্রশাসনের মূলধারাতে নারীদের অংশ গ্রহণ সমাজকে এগিয়ে দেবে। 

বর্তমানে সেনাবাহিনীতে নারীরা যোগ দিচ্ছেন। শুধু ডাক্তার বা নার্স হিসাবে নয়, সরাসরি যোদ্ধা হিসাবে, গোলন্দাজ বা কমিউনিকেশন ইউনিটে অফিসার হচ্ছেন। এই সিদ্ধান্ত কিন্তু ১৯৮০ সালেই জিয়াই নিয়ে ছিলেন। উনি খুব স্পষ্ট ভাষাতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন —  ‘ভবিষ্যৎ সেনাবাহিনীর জন্য মেয়েদের প্রস্তুত হতে হবে।’ 

প্রতিটি জনসভাতেই তিনি মেয়েদেরকে শিক্ষিত হতে বলতেন। তাঁদেরকে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করতেন যেন তারা স্বাবলম্বী হয়, কোন না কোন কাজ করে যেন তারা সংসারের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে সেইসব পরামর্শ দিতেন।

তাঁর ভাষাতে — 

“আপনারা জেগে উঠুন; আপনারা আমাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। আপনারা  সক্রিয়ভাবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করুন, আপনাদের স্বামীদেরকেও বাধ্য করুন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অবলম্বনের জন্য।” 

পরিবার পরিকল্পনার কথা এই দেশে এক সময় ভাবাই যেতো না। অথচ জিয়া আগামীর সমস্যা সবাইকে বুঝিয়ে এই দেশে পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্প হাতে নেন। মিশরের গ্রান্ড ইমামকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছিলেন দেশে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ কেন নাজায়েজ নয়, তা বিস্তারিত বুঝিয়ে ছিলেন অতি রক্ষণশীলদের।

চট্টগ্রামের মত রক্ষণশীল এলাকাতেও তিনি এমনি ভাবেই কথা বলতেন এবং মেয়েরাও তাঁর কথাতে প্রাণ পেতো, উল্লসিত হতো, তিনি যে মেয়ের মনের কথাগুলিই বলতেন তা বোঝা যেতো মেয়েদের উল্লাস মুখর আর আন্তরিক হাততালির ধ্বনি থেকে।

মহিলাদের মধ্যে আত্মসচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস তিনি জাগাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন পুরুষ ও মহিলা সব্বাইকে দেশের উন্নয়নের কাজে শরিক করতে। 

তাঁর কথায় — 

“সেই জন্য আমাদের পার্টিতে মহিলা অঙ্গ দল, যুব মহিলা অঙ্গ দল আছে এবং জাতীয়তাবাদের যে চেতনা রয়েছে,আমাদের যে আদর্শ রয়েছে তাতে আমরা সকলকে অন্তর্ভুক্ত করেছি। আমাদের ধর্মও বলে যে কাজের বেলাতে পুরুষ ও মহিলা সব সমান।”

মেয়েদেরকে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাতে সম্পর্কে সচেতন হতে তিনি সব জনসভাতেই সর্বদা পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলতেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা একই সূত্রে গাঁথা। পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে স্বাস্থ্য থাকবে না। তাঁর আগে আর কোন নেতা মহিলাদের স্বাস্থ্য রক্ষার ব্যাপারে কোন সক্রিয় মনোভাব বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নাই। আত্ম-কর্মসংস্থানমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে অগুনতি মহিলা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে জিয়ার আরো একটি কাজ আমাদের জানা থাকা খুব প্রয়োজন। বাংলাদেশে মেয়েদের ফুটবল খেলাকে আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। তাঁর সময় থেকেই মেয়েদের আন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু হয়। 

—  লেখক ব্লগার, ইন্টারনেট এক্টিভিস্ট ও গবেষক   

তথ্য সুত্র ও কৃতজ্ঞতা —  

বিচিত্রা, দৈনিক ইত্তেফাক  

এস আব্দুল হাকিম, সাবেক মহা পরিচালক, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা

Monday, July 19, 2021

করোনা মোকাবিলায় নাগরিক ও রাষ্ট্রের দায়

--------------------------------

শায়রুল কবির খান

--------------------------------



করোনাভাইরাসের এক অদৃশ্য শক্তির মহাসংক্রমণে আজ বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রকেই মহামারীর বিরুদ্ধে এক ধরনের যুদ্ধ-পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কত দিন এ অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে এমন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে সে বিষয়ে কোনোরকম স্পষ্ট ধারণা করতে পারছেন না কেউই। করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে সৃষ্ট এই কভিড-১৯ মহামারী নিয়ে ইতিমধ্যে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে নানারকম বিতর্ক শুরু হয়েছে। চলছে বাকযুদ্ধ। এর দায় কার? আর কীভাবে হবে এর সমাধান?

বাংলাদেশেও করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে দোষারোপের রাজনীতি শুরু হয়েছে। অবশ্য এর একটি যৌক্তিক কারণও আছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। যে রাষ্ট্রটি জিডিপির ৯.০৩ শতাংশ ব্যয় করে জনস্বাস্থ্য খাতে। ৫.৫৫ শতাংশ ব্যয় নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে নেপাল। ভারতের চেয়েও স্বাস্থ্য খাতে শ্রীলঙ্কার ব্যয় বেশি, জিডিপির ৩.৮১ শতাংশ। সেখানে ভারতের ব্যয় ৩.৫৩ শতাংশ। সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা আমাদের বাংলাদেশের। জিডিপির ২.২৭ শতাংশ ব্যয় নিয়ে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাত চলছে। আর পাকিস্তানের ব্যয় এ খাতে জিডিপির ২.৯০ শতাংশ।

আমাদের সরকার বছর বছর লাখ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে। মন্ত্রী-এমপিরা গলার আওয়াজ উঁচু করে বলে বেড়ান গত বছর এত লাখ কোটি টাকার বাজেট ছিল। এ বছর আমরা এত লাখ কোটি টাকার বাজেট দিয়েছি। এই হলো আমাদের উন্নয়ন। বিগত ১৩ বছরে উন্নয়নের আওয়াজ যত পাওয়া গেছে তার বিপরীতে গুণগত পরিবর্তন সামান্যই। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ বর্তমান মহামারীতে নাগরিকরা উপলব্ধি করেছেন। গেল বছর ডেঙ্গু মশার সংক্রমণে চিকিৎসাব্যবস্থার নাজুক ও ভঙ্গুর অবস্থাও দেখেছেন দেশবাসী।

নাগরিকদের যে কটি মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রের রক্ষা করার দায়দায়িত্ব এর মধ্যে অন্যতম খাদ্য ও চিকিৎসা। খাদ্যের অভাবে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় আর চিকিৎসাসেবার অভাবে রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে মহামারী দেখা দেয়। করোনাভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসা নিয়ে নানাভাবে দোষ দেওয়া হচ্ছে ডাক্তারদের, নার্সদের। অথচ মূলত এ দায় রাষ্ট্রের অর্থাৎ সরকারের ব্যবস্থাপনার। ২৭ এপ্রিল বিবিসি বাংলার অনলাইন সংস্করণের প্রধান সংবাদ শিরোনাম ছিল ‘সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশে এত বিভ্রান্তি কেন’। তারপরও এখনো সময় আছে, এই সংকট মোকাবিলায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর দমনপীড়ন বাদ দিয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার।

রাষ্ট্রের যে সংকটই আসুক না কেন, তা ঘনীভূত হওয়ার আগেই মোকাবিলা করতে সমাধানের লক্ষ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্যের বিকল্প নেই। একটি সংকট জন্ম নেওয়ার পর থেকে সংকট ঘনীভূত হওয়া পর্যন্ত আমাদের দেশের সচেতন নাগরিক সমাজের নেতৃত্ব বেশিরভাগ সময়ই প্রধান দুই দলের মতাদর্শগত সংঘাতে যেন বিভক্ত হয়ে পড়ে।

এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। যা এখন অতীব জরুরি। সরকার আর বিরোধী দলের মতাদর্শিক সংঘাতের মধ্যেও কিন্তু যৌক্তিক কথাটা তুলে ধরতে পারেন নাগরিক সমাজের নেতারা। সামগ্রিক সংকট মোকাবিলায় জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা সবার মনোযোগের কেন্দ্রে থাকার কথা হলেও সেটা দেখা যাচ্ছে না। জনগণের ন্যায্য অধিকারের বিষয়গুলো প্রধান প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাছে কতটুকু গুরুত্ব পাচ্ছে? ক্ষমতাসীন দল জাতীয় সংকটের মধ্যেও বিরোধী দলকে দমনপীড়ন ও দোষারোপের চক্রে রেখে ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশলে ব্যস্ত।




ফিরে দেখা যায়, ২০২০ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে করোনা সংক্রমণ প্রকাশ হওয়ার পর থেকে ছুটি-লকডাউন-কঠোর লকডাউন-শাটডাউন-কড়াকড়ি শাটডাউন এসবের মধ্যে দিয়েই দেশ অতিবাহিত হচ্ছে। কিন্তু মহামারী মোকাবিলায় আমরা কতটুকু এগোতে পেরেছি। টিকা সংগ্রহ ও বিতরণ নিয়েও দেখা গেছে নানা বিতর্ক। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ যেমন আছে, তেমনি সাফল্যের বিপরীতের ব্যর্থতার অভিযোগও আছে। যেখানে টিকা সংগ্রহ করা দরকার ২৬ কোটি ডোজ সেখানে নিজস্ব ক্রয় ও অনুদান বাবদ প্রায় ২ কোটি ডোজও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

আর দফায় দফায় লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধ চললেও সেটা যথাযথভাবে কার্যকর করা যাচ্ছে না। লকডাউন হচ্ছে আবার লাখ লাখ মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে, গ্রাম থেকে শহরে আসা-যাওয়ায় বাধ্য হচ্ছে। কে কোথায় কেমন করে যাবে, যাতায়াত ভাড়া কত পড়বে তার কোনোরকম ধারণা ছাড়াই সে পথে নামতে হচ্ছে মানুষকে। বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা, হেঁটে, ট্রাকে গাদাগাদি করে কোনোরকমে বাড়ি পৌঁছাতে গিয়েও মানুষকে গুনতে হচ্ছে পাঁচ থেকে সাত-আটগুণ ভাড়া। এভাবে বারবার জীবিকার তাগিদে গার্মেন্টসকর্মীসহ অন্যান্য পেশার শ্রমজীবী আর নিম্ন আয়ের মানুষদের দফায় দফায় ছুটোছুটি করতে হচ্ছে রাজধানী আর বড় বড় শহর থেকে গ্রামে আর গ্রাম থেকে পুনরায় শহরে। এতে করোনার সংক্রমণও দফায় দফায় ছড়িয়ে পড়ছে।

সে ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতির দায় আসলে কার? সাধারণ মানুষের নাকি সাধারণ নাগরিকদের ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ রাষ্ট্র পরিচালকদের?

আমাদের সমাজে যারা নাগরিক সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা হয় সরকারের অনুগত, তা না হলে রাজনৈতিক দলের লেজুড়ে পরিণত হয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম ব্যবসায়ী সমাজ। সাংবাদিক সমাজ। শিক্ষক সমাজ। চিকিৎসক সমাজ। আইনজীবীসহ প্রায় সব স্তরেই দেখা যাচ্ছে প্রায় একই পরিস্থিতি। নাগরিক সমাজের নেতারা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে আসবেন না হয়তো, আসতেও চান না। তারা রাষ্ট্রের অসংলগ্নতাগুলোকে তুলে ধরবেন এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু জাতীয় সংকটের সময়েও তারা যথাযথভাবে ভূমিকা পালন না করায় সাধারণ জনগণ আজ অসহায়।

এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। তবেই সাধারণ নাগরিকরা হয়তো আশার আলো দেখতে পাবেন। সময় খুব দ্রুততার সঙ্গে যাচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর কোনো বক্তব্য সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে দৃশ্যমান নয়। আর সরকার নৈতিকভাবে পরাজিত হয়েও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে রাষ্ট্র পরিচালনা করে যাচ্ছে।

মহামারী মোকাবিলা আর লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকার যদি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে একটা জাতীয় পরামর্শক কমিটি গঠন করে সর্বসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করত তবে তা এই সংকটকালে জাতিকে অনেকটাই ভরসা দিতে পারত।

  • লেখক বিএনপি চেয়ারপার্সন এর মিডিয়া উইং এর সদস্য ও সাংস্কৃতিককর্মী 


Saturday, July 3, 2021

প্রেস সচিব কাফি খানের দৃষ্টিতে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম

--------------------------------------

সৈয়দ আবদাল আহমেদ 

--------------------------------------

কাফি খান 


আমার চোখে তিনি একজন গ্রেট স্টেটসম্যান। অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব। যাকে মুহূর্তের জন্যও খাটো করে দেখা যায় না। উঁচু দৃষ্টিতেই দেখতে হয়। সততায় তিনি নজিরবিহীন। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সত্ মানুষ। আমার ৮২ বছরের জীবনে এমন সত্ মানুষের সাক্ষাত্ কখনও পাইনি। তাকে নির্দ্বিধায় বলব, Workaholic বা কাজপাগলা একজন মানুষ। বছরের ৩৬৫ দিনই তিনি কাজ করতেন। রাতে চার ঘণ্টার বেশি ঘুমোতেন না। কী করে যে তার ব্যাটারি রিচার্জ হতো, সে রহস্য আজও জানি না। তার সব কাজই অসাধারণ। দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করা এমনি তার একটি অসাধারণ কাজ। হ্যাঁ, আমি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কথা বলছি।

প্রেস সচিব কাফি খান এভাবেই তুলে ধরলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি জিয়ার প্রেস সচিব ছিলেন তিনি। এই চার বছর তিনি তার সান্নিধ্যে থেকেছেন। তাকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। দেখেছেন তার কাজ।

অনন্য গুণাবলী

কাফি খান বললেন, জিয়া অসাধারণ একজন মানুষ। এমন একজন মানুষ, যার কাছে গেলে মনে হয়, তিনি খুব কাছের মানুষ। আবার এমন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, একেবারে কাছে যেতেও ভয় ভয় হয়। মানে তাকে খাটো করে দেখা যায় না। বয়স যতই হোক। ওই সময় তার বয়স আর কতই বা ছিল—৪১ বছর। তার দিকে উঁচু দৃষ্টিতেই তাকাতে হয়। আমার কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি তার যে গুণাবলী আমি দেখেছি, এক কথায় তা অতুলনীয়। তার কাজগুলো এখনও আমার চোখে ভাসে। প্রকৃতই দেশপ্রেমিক একজন মানুষ তিনি। দেশকে ভালোবাসা, দেশের জন্য কাজ করা, স্বজনপ্রীতিকে প্রশ্রয় না দেয়া, মানুষকে আপন করে নেয়া, দিন-রাত কাজ করা, সততার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করা, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করা, দূরদর্শিতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা—এসব গুণাবলী আমাকে মুগ্ধই করেনি, মনে হয়েছে বাংলাদেশে তার মতো যদি এমন আরও কয়েকজন মানুষ পাওয়া যেত, তাহলে দেশের চেহারাটাই পাল্টে দেয়া যেত।

কাফি খান একজন প্রখ্যাত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। স্বাধীনতার আগে এবং পরে বহু বছর তিনি ভয়েস অব আমেরিকায় (ভোয়া) কাজ করেছেন, খবর পড়েছেন। দেশের রেডিও-টেলিভিশনেও খবর পড়ার ক্ষেত্রে তিনি পরিচিত মুখ ও কণ্ঠ। সূর্যকন্যা, সীমানা পেরিয়েসহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। বহুমুখী প্রতিভার সুদর্শন এই মানুষটি লেখালেখির সঙ্গেও জড়িত। নিজের একটি অ্যাডভার্টাইজিং ফার্মও গড়ে তুলেছিলেন তিনি। এখন তার অবসর জীবন। পরিবার-পরিজন নিয়ে ওয়াশিংটনে থাকেন। সম্প্রতি বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলেন। আমার দেশ-এর পক্ষ থেকে তার সাক্ষাত্কার চাইলে তিনি সানন্দে রাজি হন। তার অভিনয় জীবন সম্পর্কে এরই মধ্যে একটি সাক্ষাত্কার আমার দেশ-এ ছাপা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি খুব খুশি হন। বলেন, আমার জীবনের একটি শ্রেষ্ঠ সময় আমি কাটিয়েছি রাষ্ট্রপতি জিয়ার সঙ্গে। এটাকে এক ধরনের সৌভাগ্যই বলতে পারেন। সেই দিনগুলোর আনন্দিত স্মৃতিচারণ করলেন তিনি।

গুণীর কদর

বললেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি মহৎ গুণ ছিল তিনি দেশের ভালো ভালো লোকদের তার পাশে জড়ো করতে পেরেছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক মুহম্মদ শামসউল হক, ড. এমএন হুদা, সাইফুর রহমান, শাহ আজিজুর রহমান, ড. ফসিহউদ্দিন মাহতাব—এমন অনেক লোকের সমাগম ঘটেছিল তার সরকারে ও দলে। দূরদর্শী চিন্তাভাবনার লোকের খোঁজ পেলেই তাকে তিনি বঙ্গভবনে চায়ের আমন্ত্রণ করেছেন এবং কোনো না কোনোভাবে কাজে লাগিয়েছেন। আমার কথাই ধরুন। হয়তো তিনি রেডিও-টেলিভিশনে খবর পড়া দেখে আমার বিষয়ে চিন্তা করেছেন ওকে দিয়ে আমার প্রেস সচিবের কাজটা হবে।

সেই স্মৃতিচারণ করে কাফি খান বললেন, রাষ্ট্রপতি জিয়ার সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় ছিল না। স্বাধীনতার আগে ভয়েস অব আমেরিকায় কাজ করতাম। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে প্রবাসে থেকে আমরাও দেশের পক্ষে কী করা যায় চিন্তা করি। শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে হালকা পরিচয় ছিল। সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী হলে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি লিখেছিলাম। তিনি তার উত্তরও পাঠিয়েছিলেন। সেটি এখনও আমার সংরক্ষণে আছে। মরহুম এনায়েত করিম, এসএএমএস কিবরিয়া, আবুল মাল আবদুল মুহিত, ড. জিল্লুর খান, আশরাফউজ্জামান খান, ড. মোহসেন—আমরা মিলে ইস্ট পাকিস্তান লীগ অব আমেরিকা ওয়াশিংটন চ্যাপ্টার নামে সংগঠন গড়ে তুলি। বাংলাদেশের পক্ষে নানাভাবে জনমত গড়ে তোলার কাজ করি। আমি এ সংগঠনের ট্রেজারার ছিলাম। বর্তমান অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব তখন দূতাবাসে চাকরি করতেন। তার বাসায় একটি বা দুটি মিটিং হওয়ার পর তিনি বললেন, আমার বাসায় আর মিটিং করা যাবে না —

অসুবিধা আছে। পরে আমার ছোট বাসাতেই মিটিং হয়। বাংলাদেশের মনোগ্রাম লাগিয়ে আমি ভয়েস অব আমেরিকার অফিসে যেতাম। এ নিয়ে আমাকে অনেক বিড়ম্বনা সইতে হয়েছে। যাই হোক, সীমিত পর্যায়ে এভাবেই তখন আমরা আমেরিকায় বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে দেশে চলে আসি।


কাফি খান

দেশে এসে রেডিও-টেলিভিশনে সংবাদ পাঠ করি। নিজের একটি ছোট্ট ব্যবসা শুরু করি—ইন্টারস্প্যান অ্যাডভার্টাইজিং ফার্ম। এভাবে কেটে যায় কয়েকটি বছর। ১৯৭৭ সাল। রাষ্ট্রপতি জিয়া তখন ক্ষমতায়। হঠাত্ একদিন বঙ্গভবন থেকে একটি ফোন পাই। রাষ্ট্রপতির এপিএস ফজলুর রহমান ফোন করে জানান, জিয়াউর রহমান সাহেব আমার সঙ্গে কফি খেতে চান। আমি বললাম, আমার সঙ্গে তো উনার কোনো পরিচয় নেই। ফজলুর রহমান বললেন—আমি তো স্যার কিছু জানি না, আপনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত্ করুন, কবে পারবেন? সেটা আমি বললে তো হবে না, রাষ্ট্রপতির সিডিউল অনুযায়ীই হতে হবে। দু’দিন পর বেলা ১১টায় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমার সাক্ষাতের সময় নির্ধারিত হলো। আমি বঙ্গভবনে গেলাম। এডিসি আমাকে নিয়ে রাষ্ট্রপতির কামরায় ঢুকতেই জেনারেল জিয়া চেয়ার থেকে উঠে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে আমাকে রিসিভ করলেন। পাশের সোফায় নিয়ে গিয়ে বসালেন। বললেন—কি খাবেন চা না কফি। বললাম, একটি হলেই চলবে। কফি এলো। কী জন্য ডেকেছেন কিছুই বললেন না। শুধু কি করছেন, আমেরিকা থেকে কবে এসেছেন, ছেলেমেয়ে ও পারিবারিক অবস্থা এবং ভয়েস অব আমেরিকার চাকরির কথা জানতে চাইলেন। বললেন, একাত্তরে আপনারা তো আমেরিকায় বাংলাদেশের পক্ষে অনেক কাজ করেছেন? আমি বললাম, সীমিত পর্যায়ে করেছি। আমেরিকান সরকারের চাকরি করতাম। পাকিস্তানের সঙ্গে তখন আমেরিকার সুসম্পর্ক ছিল। তারপরও যতটুকু পেরেছি, আমরা করেছি। জিয়া বললেন—হ্যাঁ, আমি সব শুনেছি। এরপরই বললেন, দেশের জন্য এখন তো আপনাদের মতো লোকদের কিছু করা দরকার। আমি বললাম, আপনারা তো দেশের কাজ করছেনই। তারপরও দেশের প্রয়োজনে যখন যা প্রয়োজন, অবশ্যই করব।

এভাবেই শেষ হলো সাক্ষাত্। কেন ডেকেছেন কিছুই বুঝতে পারলাম না। সালাম দিয়ে বঙ্গভবন ত্যাগ করি। এর প্রায় দু’মাস পর শামসুল হুদা চৌধুরী আমাকে ডাকলেন। গেলাম তার কাছে। ১৯৫১ সাল থেকেই তাকে চিনি। তাকে হুদা ভাই বলে ডাকতাম। দেখা হতেই হুদা ভাই হেসে হেসে বললেন—রাষ্ট্রপতি সাহেব তোকে তার প্রেস সচিব বানাইতে চায়। আমি বললাম—প্রেস সচিবের জন্য তো দরখাস্ত করিনি। তিনি বললেন, না রাষ্ট্রপতি সাহেবের প্রেস সচিব দরকার। যাই হোক, দু’দফায় এ নিয়ে আলাপ আলোচনার পর জয়েন্ট সেক্রেটারি স্ট্যাটাসে ৩ হাজার টাকা বেতনে প্রেস সচিব হতে রাজি হলাম। তখন সচিবদের বেতন ছিল তিন হাজার টাকা। আমাকে বেতন হিসেবে আড়াই হাজার টাকা এবং অন্যান্য এলাউন্স বাবত পাঁচশ টাকা দেয়া হলো। আর একটি বাড়ি ও একটি গাড়ির সুবিধা।

অমায়িক ভদ্রলোক

সব ঠিক হওয়ার পর ১৯৭৭ সালের ১২ কিংবা ১৩ নভেম্বর হবে, বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যাই। সালাম দিয়ে দেখা হতেই বুলেটের মতো প্রশ্ন—কবে জয়েন করছেন? স্যার, কবে মানে? তিনি বললেন, না আমার অত সময় নেই। আমি বললাম, ছোটখাটো একটি ব্যবসা আছে। সেটি গুছিয়ে আসতে কয়েকটা দিন লাগবে। বললেন, না অতো সময় নেই। ১ ডিসেম্বর থেকে জয়েন করুন। আমি আজই বলে দিচ্ছি, নোটিফিকেশন হয়ে যাবে। এভাবেই ১৯৭৭ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে প্রেস সচিব হিসেবে যোগ দিই। কাছাকাছি গিয়ে ভদ্রলোক মানুষটাকে দেখলাম—একজন অমায়িক মানুষ। তার ব্যবহার, তার কাজ কোনো কিছুরই তুলনা হয় না। আমি প্রেস সচিবের চাকরিতে যোগ দেয়ার পরপরই একটি বিদেশ সফর এলো। ঢাকা-কাঠমান্ডু, কাঠমান্ডু-দিল্লি, তারপর ঢাকায় এসে আবার পাকিস্তান। ওই সফরে গেলাম। প্রচণ্ড জ্বরে পড়ে গেলাম। রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত চিকিত্সক ডা. নওয়াব আলী জ্বর কমার ট্যাবলেট দিলেন। কাঠমান্ডুতে কোনোভাবে কাটিয়ে দিল্লি গেলাম। জ্বর আরও বেড়ে গেল। ফলে আজমীর শরীফে যেতে পারলাম না, অশোকা হোটেলেই রয়ে গেলাম। দিল্লি সফর শেষ করে ঢাকায় ফিরছি এফ-২৭ ফকার বিমানে করে। রাষ্ট্রপতি যে আসনে বসেছেন, তার থেকে কয়েকটি আসন পরেই আমি বসেছি। কোনাকুনিভাবে রাষ্ট্রপতি আমাকে দেখতে পান। আমার সিটের পাশে একটি সিট খালি। আমি জড়োসড়ো হয়ে বসে আছি। বিমানের পার্সার এসে জুস খেতে দিলেন। আমি জুস খাচ্ছি। এ সময় রাষ্ট্রপতি জিয়া আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—‘কী প্রেস সেক্রেটারি সাহেব, আরও স্ট্রং কিছু খান।’ এভাবে তিনি হিউমারও করতেন।

দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা

বাংলাদেশের প্রতি রাষ্ট্রপতি জিয়ার ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা। এই দেশকে কীভাবে স্বনির্ভর করবেন, এটা ছিল তার সব সময়ের স্বপ্ন। জিয়া সব সময় বাংলাদেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান, আহরণ এবং তা দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণের উপর জোর দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, আমাদের গ্যাস যখন আছে, তখন তেলও পাওয়া যাবে অবশ্যই—শুধু খুঁজে বের করার অপেক্ষা। বড়পুকুরিয়ার কয়লা ও মধ্যপাড়ার কঠিন শিলা তার সময়েই আবিষ্কৃত হয়। তিনি বলতেন, আমাদের বাংলাদেশের অনেক সমস্যা আছে। একে স্বনির্ভর করতে হবে। স্বনির্ভর হতে হলে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে। ফসল ফলাতে হবে। কৃষকদের সেচের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সেচের জন্য খাল খনন করতে হবে। দেশজুড়ে তার খাল খনন কর্মসূচি বাংলাদেশকে স্বনির্ভর করার জন্যই তিনি নিয়েছিলেন। তার হাজামজা নদী, খাল ও জলাশয়গুলোর সংস্কারের কাজে স্বেচ্ছাসেবী তরুণ সমাজ সোত্সাহে এগিয়ে এসেছিল। আরও বহু লোক এসেছিল জিয়ার ‘খাদ্যের বিনিময়ে কাজ’ কর্মসূচি অনুযায়ী। খরার সময় সেচের জন্য যথেষ্ট পানি ধরে রাখা আর বর্ষায় বন্যার পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার পথ করে দেয়া ছিল খাল খনন কর্মসূচির উদ্দেশ্য। এ কর্মসূচিতে দেশজোড়া অবর্ণনীয় উত্সাহ দেখা দিয়েছিল। জেলায় জেলায় প্রকল্প তৈরি করে ওই প্রকল্প জিয়া নিজে উদ্বোধন করতেন। কোদাল হাতে প্রথম ঝুড়ি মাটি কাটতেন জিয়া নিজে। এভাবেই তিনি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন।

চষে বেড়িয়েছেন সারাদেশ


তিনি সারাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। আজ চট্টগ্রাম তো কাল সিলেট। দুর্গম এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টারে করে গেছেন। ঢাকার বাইরে প্রতি মাসে আট দশ দিন কাটাতে হতো। বিভিন্ন জায়গায় মাইলের পর মাইল হাঁটতে হতো। এমনকি একটানা চার-পাঁচ মাইল পর্যন্ত হাঁটতে হতো। রোজার দিনেও পায়ে হেঁটে বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে আমাদের জিভ বেরিয়ে গেছে। কিন্তু ওই লোকটার কোনো ক্লান্তি নেই। তার ব্যক্তিগত চিকিত্সক ছিলেন ডা. মাহতাবউল ইসলাম। তিনি ডিহাইড্রেশন থেকে বাঁচাতে আমাদের লেবু দিয়ে লবণ পানি খাইয়েছেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের ডিহাইড্রেশনের বালাই নেই। তাকেও ডা. মাহতাবউল ইসলাম ওই শরবত খেতে পরামর্শ দিতেন। কিন্তু তিনি বলতেন, ওইসব আমার লাগবে না। তার সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে আমরা ঘামতে ঘামতে হয়রান হয়ে গেছি। সমান তালে হাঁটতে না পেরে অনেক পেছনে পড়ে যেতাম। দেখা গেছে, অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাওয়ার পর আমরা সেখানে পৌঁছেছি। তিনি বলতেন, কি ব্যাপার, আপনাদের আসতে এতো দেরি কেন? আমি বলতাম, স্যার, আপনার তো লেফট-রাইট করার অভ্যাস। আমাদের তো একটু দেরি হবেই। তিনি মুচকি হাসতেন।

মানুষের কাছাকাছি

বিরামহীন গণসংযোগে তিনি মানুষের একেবারে কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের কাছে তার ছিল ‘রাজার’ আসন। সাধারণ মানুষ তাকে ‘রাজাই’ বলত। একটা ঘটনা শুনুন। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় খুলনা থেকে জগন্নাথগঞ্জঘাট এলাকায় আমরা ট্রেনে গণসংযোগে বেরিয়েছি। মাঝে মধ্যে পথসভা-জনসভা হচ্ছে। এমনি একদিন বিকালে একটি স্টেশনের কাছে জনসভা শেষ করে ট্রেনে উঠছি। এ সময় গায়ে ফতুয়া ও লুঙ্গি পরা একজন বৃদ্ধ এসে বললেন, মিটিং তো শেষ—‘রাজারে দেখবার পায়াম না’ অর্থাত্ তারা তাকে রাজাই মনে করতেন। যদিও জিয়াউর রহমান এ শব্দগুলো পছন্দ করতেন না।

স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে

কাফি খান বললেন, স্বজনপ্রীতি শব্দটা রাষ্ট্রপতি জিয়ার অভিধানে ছিল না। দুর্নীতি সংক্রান্ত কোনো কাজকে তিনি কখনও প্রশ্রয় দেননি। রাষ্ট্রপতির মতো এত বড় একটি পদে থেকেও তিনি অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তার কৃচ্ছ্রতা সাধন করার দৃষ্টান্ত বিরল। নিজের পরিবারের জন্য তিনি কিছুই করেননি। নিজের জন্য তো করেনইনি। আত্মীয়স্বজনদের কেউ কোনো তদবিরের জন্য বঙ্গভবনে বা তার বাসভবনে সাক্ষাত্ করতে আসবেন, সেটা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার। তেমন সাহস কারও ছিল না। অসত্ কাউকে তিনি তার কাছে ঘেঁষতে দিতেন না। প্রেস সচিব হিসেবে বঙ্গভবনে আমার অফিস থাকলেও মাঝে মধ্যে আমাকে কাজের স্বার্থে রাষ্ট্রপতির বাসভবনেও অফিস করতে হতো। সেখানে তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে একদিনের জন্যও আমি দেখিনি। তিনি ছিলেন একেবারেই অন্তপুরবাসিনী। অফিসের ধারেকাছেও আসতে পারতেন না। তিনিও আসতেন না। তাকে একমাত্র দেখা যেত রাষ্ট্রপতি জিয়া কোনো রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশে গেলে সেখানে তার সফরসঙ্গী হিসেবে। তাও সব সফরে নয়। যেসব রাষ্ট্রীয় সফরে প্রটোকলের প্রয়োজনে যেতে হতো, সেগুলোতেই। এছাড়া কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান বাংলাদেশে সফরে এলে রাষ্ট্রীয় ভোজে বেগম জিয়া অংশ নিতেন। সেটাও প্রটোকলের স্বার্থে। আর দুই ঈদে নামাজ পড়ার পর বঙ্গভবনের রেওয়াজ অনুযায়ী অতিথিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য তাকে আসতে হতো।

অতুলনীয় সততা

জিয়ার সততার তো তুলনাই হয় না। তিনি যে বেতন পেতেন, তা আর কত? তিন চার হাজার টাকার মতো। আমি নিজে তার বেতনের কাগজ দেখেছি। সেখান থেকে ১৫০ টাকা রাষ্ট্রপতির রিলিফ ফান্ডে জমা দিতেন। বাকি টাকাটা দিয়ে সংসার চালাতেন। জিয়া খুব পরিমিত খাবার খেতেন। তার বাড়ির হাঁড়িতে অতি সাধারণ খাবার হতো। একটা তরকারি, একটা ডাল, একটা সবজি। মন্ত্রীদের দেখেছি তার বাসায় খেতে বললে রাজি হতো না। কারণ এতটুকু খেয়ে তো তাদের পোষাবে না। রাষ্ট্রপতি জিয়া বলতেন, এর বেশি তো এফোর্ট করতে পারি না। ঢাকার বাইরে গেলে ডিসিরা খাবারের আয়োজন করত। সেখানেও কড়া নির্দেশ ছিল—একটা ভাজি, একটা ডাল, একটা মাছ বা মাংস। এর বেশি খাবার করা যাবে না।

জিয়া মিষ্টি খুব পছন্দ করতেন। খাবারে মিষ্টি থাকলে খুশি হতেন। না থাকলে আপত্তি করতেন না। তার সততার আরেকটি দৃষ্টান্ত শুনুন। তার ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে পড়ত। ওই স্কুলের প্রিন্সিপাল আমার পরিচিত। তার কাছে শুনেছি, কোকো তার কাছে পড়তে আসত। তার পায়ে ছিল ছেঁড়া জুতো। একদিন প্রিন্সিপাল কোকোকে বললেন, ওই ছেঁড়া জুতো বদলাচ্ছো না কেন? কোকোর উত্তর—বাবাকে বলেছিলাম, তিনি বলেছেন কয়েকদিন পরে কিনে দেবেন। একজন রাষ্ট্রপতি তার ছেলের এক জোড়া জুতো কিনতেও হিমশিম খাচ্ছেন। একটা পুরনো হাতঘড়ি ছিল তার। ঘড়িটি খুব দামিও ছিল না। অনেকে বলত, ওটা স্যার অনেক পুরনো হয়ে গেছে। ওটা বাদ দিয়ে একটা ভালো ঘড়ি কিনুন। কারণ ওটা আর আপনার হাতে মানায় না। জিয়া শুনে শুধু মুচকি হাসতেন। একবার এক জনসভায় ভাষণ দিতে যাবার পথে দর্শকদের ভিড় ঠেলে তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে মেলাতে এগুনোর সময় অথবা জনসভায় ভাষণ দিয়ে ফেরার পথেও হতে পারে—ঠিক মনে নেই আমার, ঘড়িটা জিয়ার হাত থেকে খুলে পড়ে যায় অথবা খোয়া যায়। সে জন্য তার যে কি আফসোস—ঘড়িটার শোক তিনি অনেক দিন ভুলতে পারেননি।

দুর্নীতি প্রশ্রয় দিতেন না

কাফি খান বললেন, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরকালে প্রাপ্ত সব উপঢৌকন বা উপহার সামগ্রী তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বলে গণ্য করতেন। সেসব তিনি বঙ্গভবনে তোষাখানায় পাঠিয়ে দিতেন। এমনকি তার সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া যে অল্প কয়েকবার তার সফরসঙ্গী হন, তিনিও যেসব উপহার সামগ্রী পেয়েছেন, তা ব্যবহার করতে পারেননি। তোষাখানায় জমা দিতে হয়েছে। এই লোকটাকে সত্ বলব না তো কাকে বলব? দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেয়ার আরেকটি উদাহরণ আপনাকে দিই। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা টিমে ছিলেন কর্নেল আনিস নামে একজন কর্মকর্তা। রাষ্ট্রপতি বিদেশে গেলে কর্নেল আনিস বিদেশ থেকে ইলেকট্রনিক পণ্য নিয়ে আসত। রাষ্ট্রপতির টিমে থাকার কারণে এগুলো বিমানবন্দরে চেকিং হতো না। ফলে ডিউটিও দিতে হতো না। কর্নেল আনিস এগুলো বাইরে বিক্রি করত। এই অভিযোগ রাষ্ট্রপতি জিয়ার কানে গেলে তিনি বিদেশ থেকে আসার সময় তার টিমের সব সদস্যের ল্যাগেজ চেকিং করার নির্দেশ দিলেন। চেকিংয়ের পর কর্নেল আনিসের ল্যাগেজে চোরাই ইলেকট্রনিক পণ্য পাওয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলো।

গ্রেট স্টেটসম্যান



জিয়াউর রহমান সত্যিই একজন গ্রেট স্টেটসম্যান। বিদেশে তিনি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন। বিদেশে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে তিনি ইক্যুয়াল লেভেলে কথা বলতে পারতেন। আমি দেখেছি। যুগোস্লাভিয়া তখন ভাগ হয়নি। যুগোস্লাভিয়ার রাষ্ট্রপতি মার্শাল টিটোর তখন দুর্দান্ত প্রতাপ। টিটোর সঙ্গে জিয়া এমনভাবে কথা বলছেন—মনেই হয়নি তৃতীয় বিশ্বের একজন নেতা মার্শাল টিটোর মতো একজন স্টেটসম্যানের সঙ্গে সমানতালে বৈঠক করছেন। জিয়া ধূমপান করতেন না। মার্শাল টিটো ঘন ঘন ধূমপান করতেন। টিটো জিয়াকে সিগারেট এগিয়ে দিলে তিনি তা নিয়েছেন, এবং দু’টান দিয়েছেন। কিউবার রাষ্ট্রপতি ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সঙ্গেও তাকে এভাবে ইক্যুয়াল লেভেলে বৈঠক করতে দেখেছি। নর্থ কোরিয়ার ৩০তম স্বাধীনতাবার্ষিকীতে জিয়াকে প্রধান অতিথি হিসেবে দাওয়াত করা হয়েছে। ওই অনুষ্ঠানে অনেক দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান উপস্থিত ছিলেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি মধ্যস্থতা করেছেন। তার ওপর দুই দেশের জনগণ এবং সরকারেরই গভীর আস্থা ছিল। যুদ্ধ বন্ধে তিনিও সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। আমি শুনেছি, তার শাহাদাতের পর ইরাকের লোকজন বলেছেন, আমাদের যুদ্ধটা মনে হয় থেমে যেত, জিয়ার মৃত্যুতে এখন এটা অনিশ্চিত।

ভিশনারি রাষ্ট্রনায়ক

রাষ্ট্রপতি জিয়াকে একজন ভিশনারি রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উল্লেখ করে কাফি খান বলেন, আমি কাছে থেকে তার এই দূরদর্শিতা লক্ষ্য করেছি। দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরাম— সার্ক, তারই ভিশন। যদিও এই সার্কের জন্মটা তিনি দেখে যেতে পারেননি। তিনি বেঁচে থাকলে সার্ক আরও শক্তিশালী ফোরাম হিসেবে গড়ে উঠত। বাংলাদেশের ইমেজ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া জিয়ার আরেক ভিশন। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ তিনি ঘুচিয়ে দিয়ে গেছেন। তাকে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা সমীহ করতেন। জিয়ার ছিল আলাদা একটা ক্যারিশমা। মরহুম শেখ মুজিবেরও ক্যারিশমা ছিল। মজার কথা হলো শেখ সাহেব সম্পর্কে কোনো দিন কোন নেতিবাচক মন্তব্য বা তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করার মতো কোনো উক্তি জিয়ার মুখ থেকে আমি শুনিনি। আজকাল যদিও উল্টোটা দেখি। জিয়াউর রহমানের নামটা মুছে দিলেই যেন তাকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয়া যাবে। কিন্তু তার আসন তো মানুষের হৃদয়ে।

বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন



আমি আগেই বলেছি, তার সব কাজই অসাধারণ। তার অসাধারণ কাজই হলো দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করা। দেশে বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর একদলীয় শাসন চলছিল। ওই মিলিটারি লোকটাই তো গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনলেন। জিয়াকে বলা হয় তিনি নাকি ষড়যন্ত্র করেছেন। তিনি কখন ষড়যন্ত্র করলেন? ষড়যন্ত্র তো করেছেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। তিনি তো অন্তরীণ ছিলেন। অন্তরীণ অবস্থা থেকে তাকে বের করে এনে ক্ষমতায় বসানো হয়। তার বড় এচিভমেন্ট তিনি দেশকে গণতন্ত্রের পথে নিয়ে গেছেন, সঠিক রাস্তায় নিয়ে গেছেন। লাইনচ্যুত গাড়িটাকে লাইনে তুলেছেন। মিলিটারি লোক হলেও তার মুখেই আমরা শুনেছি। তিনি বলছেন, সামরিক শাসন কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না।

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ


বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ জিয়াউর রহমানের আরেকটি ভিশন। অনেক বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা শুনলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। জিয়া বলতেন—আমরা বাঙালি তো বটেই, যেহেতু বাংলাদেশ হয়ে গেছে, সেখানে তো আমাকে দেশের পরিচয় দিতে হবে। সেটাই তো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। আমরা বাংলাদেশ করেছি, বাংলাদেশী পরিচয় দিতে অসুবিধা কোথায়? ওই বুদ্ধিজীবীদের কথা অনুযায়ী বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বা বাংলাদেশী পরিচয় দিলে যেন বাঙালিত্ব খারিজ হয়ে যায়। আসলে বেশি বাঙালি হতে গিয়ে বাংলাদেশী পরিচয়কে আমরা গৌণ করে ফেলছি। জিয়া ছিলেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চেতনায় বিশ্বাসী একজন খাঁটি নির্ভেজাল দেশপ্রেমিক। তার প্রিয় একটা গান ছিল—প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, যেটা পরবর্তীকালে তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি তাদের দলীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করে। ক’দিন আগে দেখলাম, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সমাবেশে এই দেশের সংস্কৃতির বিকাশে অবদান রাখার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিন দশকেরও বেশি কাল আগে রাষ্ট্রপতি জিয়া শুধু যে সেটা ভেবেছিলেন তাই নয়, তার বাস্তব রূপও দিয়েছিলেন। এসবেরই নিদর্শন শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জন্য টেলিভিশনে নতুন কুঁড়ি অনুষ্ঠানের আয়োজন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী প্রতিষ্ঠা, জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রবর্তন, জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার প্রবর্তন, স্বাধীনতা ও একুশে পদক প্রবর্তন এবং জিয়ার নির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতায় চালু হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও সুস্থধারার ছবি নির্মাণ। উত্সাহিত করার জন্য চালু হয় অনুদান প্রথা।

বিএনপি প্রতিষ্ঠা

আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মনে করতেন, বিকল্প দল না হলে গণতন্ত্র স্থায়ী হবে না। বিএনপিকে ক্যান্টনমেন্টের দল বলা হয়। ক্যান্টনমেন্টেই বলেন আর যাই বলেন, বিএনপি একটি বিশাল রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে, এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। এরশাদ তো ৯ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তিনিও তো দল করেছেন। তার দল তো এতো বিশাল হতে পারেনি। আজ এ কথা বলতে দ্বিধা নেই জিয়ার সাড়ে তিন বছরের রাজনীতিই আওয়ামী লীগের ৫০ বছরের রাজনীতিকে মোকাবেলা করছে।

দৈনন্দিন কর্মসূচি

রাষ্ট্রপতি জিয়ার দৈনন্দিন কর্মসূচি কেমন ছিল—জানতে চেয়েছিলাম। কাফি খান বলেন, রাষ্ট্রপতির দিনের কাজ শুরু হতো সকাল সাতটায়। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দু’টা হয়ে যেত। কিন্তু ভোরে ওঠে নামাজ পড়েই অফিসের জন্য তৈরি হতেন। তার দৈনন্দিন কর্মসূচি বা নির্ঘণ্ট তৈরি করতেন মিলিটারি সেক্রেটারি। সকাল ৭টার মধ্যেই তিনি অফিসে চলে আসতেন। আমি অফিসে আসতাম সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে। একটানা কাজ। দুপুরে তিনি খাওয়া ও নামাজ পড়ার জন্য এক ঘণ্টার বিরতি নিতেন। মাগরেবের নামাজের পর বিভিন্ন পেশা ও স্তরের লোকজনের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি কথা বলতেন। রাজনীতির সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা ছিল না। ফলে ওইসব বৈঠকে আমি থাকতাম না। তবে সমাজের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ে দেশের কল্যাণের বিষয়টিই সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে। দু’টায় বাসায় ফিরলেও খুব ভোরেই তিনি ঘুম থেকে উঠে যেতেন। ফজরের নামাজ পড়ে নাস্তা সেরে অফিসের জন্য তৈরি হতেন। চার ঘণ্টার বেশি ঘুমোতেন না। কী করে যে তার ব্যাটারি রিচার্জ হতো, সে রহস্য আজও জানি না। বঙ্গভবনে ব্যক্তিগত স্টাফ কিংবা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাকে কখনও কোনো খারাপ ব্যবহার করতে দেখিনি। গাফিলতি দেখলে কিছুটা উত্তেজিত হতেন। 

 

  •  লেখক সাংবাদিক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক 


আপনার মত প্রকাশ ফ্যাসিবাদকে যেন শক্তিশালী না করে

--------------------------------------

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা 

--------------------------------------


বাংলাদেশে নির্বাচন বলে যে একটা বস্তু, তা বহু বছর হল নাই। জাতীয় থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত যে কোনো নির্বাচন মানেই সরকারি দলের এক তরফা জয়। অনেকেই বলতে পারেন, বিএনপি নির্বাচনের মাঠে থাকে না, তাদের এজেন্টরা ভোটকেন্দ্রে যায় না, ক্যাডার দিয়ে কেন্দ্র পাহারা দেয় না আর তাই আওয়ামী লীগ একচেটিয়া নির্বাচনের দখল নেয়। গণতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরে দাঁড়িয়ে এই ধরণের কথা শুধু বিস্মিতই না, দুঃখিতও করে। এখনও যদি পেশীশক্তি আর পাহারা দিয়ে কেন্দ্র দখলে রাখতে হয়, ক্যাডার দিয়ে প্রতিপক্ষের মাথা ফাটিয়ে মাঠের দখল নিতে হয়, তাহলে কী ধরণের নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হল দেশে? এমনকি পাকিস্তান আমলেও তো নির্বাচন মানে মল্লযুদ্ধ ছিল না। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই রাজনীতিতে শক্তির প্রয়োগ প্রচলিত এবং বহু পুরানো তাহলেও একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। একটি রাজনৈতিক দল তার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে মোকাবেলা করতে পারে; কিন্তু তাকে যদি বছরের পর বছর পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র মোকাবেলা করতে হয় তখন বিষয়টা কেমন দাঁড়ায়? বাংলাদেশে গত এক যুগের বেশি সময় বিএনপিকে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হচ্ছে।      

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দ্য ইলেক্টোরাল ইন্টিগ্রিটি প্রজেক্ট ২০১৯’ তার রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেখানে নির্বাচনের মানের বিবেচনায় বাংলাদেশের স্কোর ৩৮,যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। সারা পৃথিবীতেই বাংলাদেশের চাইতে খারাপ নির্বাচন হয় মাত্র ২১ টি দেশে।  এই স্টাডিতে বাংলাদেশের শুধু ২০১৪ সালের নির্বাচনকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের তথাকথিত নির্বাচন বিবেচনায় নেয়া হলে বাংলাদেশ সম্ভবত থাকতো বিশ্বের সর্বশেষ অবস্থানে। বলে রাখি, ফ্রিডম হাউজের সর্বশেষ রিপোর্টে ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসির তালিকায় বাংলাদেশ আর নেই, যার অর্থ হচ্ছে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার লেশমাত্র নেই বাংলাদেশে।

বিশ্বের নতুন পাঁচ স্বৈরতান্ত্রিক দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ


ইকনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এর মতে বাংলাদেশে এখন হাইব্রিড রেজিম, ফ্রিডম হাইজের মতে আংশিক মুক্ত, কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশ আসলে একটি স্বৈরতান্ত্রিক দেশ যা ২০১৮ সালেই জার্মান গবেষণা সংস্থা বেরটেলসম্যান স্টিফস্টুং পরিষ্কার ভাষায় ব্যক্ত করেছে।

২০২০ সালে প্রকাশিত এই সংস্থার দেশভিত্তিক বেরটেলসম্যান ট্রান্সফরমেশন ইন্ডেক্স (বিটিআই) এ বিএনপি সরকারের শেষ বছর, ২০০৬ সাল থেকে ২০২০ এর মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন সূচকের তুলনা করলে দেখা যায় নির্বাচন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার সম্পর্কিত ২০ টি সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমাগত নিম্নমুখী।

বাংলাদেশের স্বৈরতান্ত্রিকতার স্বীকৃতি এখন আসছে নানাদিক থেকে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে দেয়া এক যৌথ বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সহ ৭ টি মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানানো হয়। কিছুদিন আগে আবারও একই ধরণের অভিযোগ তুলে জাতিসঙ্ঘসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি পদক্ষেপ নেবার আহ্বান জানিয়েছে ১০ টি মানবাধিকার সংস্থা। 

একটি দেশে যখন কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরতান্ত্রিক সরকার থাকে তখন তার অবশ্যম্ভাবী ফল স্বরূপ সেখানে মানবাধিকার, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমশই সংকুচিত হতে থাকে। ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়, ভিন্নমত রুদ্ধ হতে থাকে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে মানুষ এখন লিখতে ভয় পায়, বলতে ভয় পায়, স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে ভয় পায়, হয়তোবা চিন্তা করতেও ভয় পায়। 

এটা এমন এক সময় যখন বুদ্ধিজীবীরাও সত্য সঠিক কথা বলতে দ্বিধাবিভক্ত হন। যাদের জাতিকে পথ দেখানোর কথা তারা ক্ষুদ্র স্বার্থ আর হিসাব নিকেশ কিংবা স্রেফ ভয়ে সরকারের সুরে কথা বলে অথবা চুপ থাকে। এমিরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন ‘দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী সুবিধাবাদিতায় মুখ গুঁজেছেন’। তার ভাষায় ‘বুদ্ধিজীবীরা চামচাগিরি করছেন, মীরজাফরি করছেন। বুদ্ধিজীবীরা তাদের দায়িত্ব  পালন না করে উল্টো কাজ করছেন’। 

এর মধ্যে যে দুই একজন ভীষণ ব্যতিক্রম আছেন, গনস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ জাফর উল্লাহ চৌধুরী তাদের অন্যতম। সম্প্রতি তিনি শিরোনাম হয়েছেন এই কঠিন দুঃসময় বিএনপির হাল যিনি শক্ত হাতে ধরেছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানকে নিয়ে একটি মন্তব্যের মধ্য দিয়ে। দল হিসাবে বিএনপির সহনশীলতা, দলটির নেতা  কর্মীদের সহনশীলতার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে যদি আমরা ফিরে তাকাই বিএনপির শাসন কাল ১৯৯১-১৯৯৬ কিংবা ২০০১-২০০৬ সালের দিকে। সেই সময় আজকের মত সরকারি গোয়েন্দাদের রক্তচক্ষু, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের শতেক ধারা কিংবা অলিখিত নিয়ম মেনে সরকারের সমালোচনাকারীদের গুমের সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কিংবা তার পরিবার নিয়ে বহু মিথ্যা সমালোচনা এমনকি ভয়ানক প্রপাগান্ডাও বহু তথাকথিত সুশীল, বুদ্ধিজীবীকে করতে দেখেছি। এমন কোনও দিন নাই যেদিন দৈনিক সংবাদপত্রের প্রথম পাতা প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের কার্টুন দিয়ে শুরু না হয়েছে। কই তখন তো শুনিনি কারো নামে মামলা হতে, কোনও পত্রিকা বন্ধ হতে, কোনও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কিংবা কোনও বুদ্ধিজীবীর এতটুকু সমস্যা হতে। এখন তো পরিষদ গঠিত হয়েছে কে, কোথায়, কখন, কোন ফেসবুক একাউন্ট থেকে সরকারের সমালোচনা করছে তা খুঁজে বের করে তার বিরুদ্ধে মামলা করতে। আর সংবাদপত্রের কার্টুন? তার সমাধি হয়েছে ২০১৪ সালেই। 

বিএনপির মত বহুত্ববাদি, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, অতি সহনশীল একটি দলের ছাত্র সংগঠনের একজন নেতা কেন তবে প্রতিবাদ করলেন সেদিন ডঃ জাফরউল্লাহর সমালোচনার?  এর কয়েকটি কারণ আছে বলে আমি মনে করি। প্রথমত, গত ১২ বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে প্রধান বিরোধী এই দলটিকে ধ্বংসের চেষ্টা করা হয়েছে। দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে বিনা অপরাধে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দুই বছর কারাগারে থাকতে হয়েছে। এই বয়সে এসে শারীরিক অসুস্থ অবস্থায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটুকু থেকে বঞ্চিত তিনি। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশে ফিরতে পারছেন না। দলের কেন্দ্র থেকে তৃনমূল পর্যন্ত মামলার পাহাড়। গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন ও খুন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এখন নিত্যদিনের রুটিন। এসব কিছু সরিয়ে বাজেটের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিক ভাবে হঠাৎ করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে নিয়ে কটুক্তি দলের কর্মিদের আঘাত দিতেই পারে।

দ্বিতীয়ত, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে বিতর্কিত করার প্রচেষ্টা এদেশে বহুদিন ধরে চলছে। যে দলটি গত এক যুগে দেশ থেকে ভোট ব্যবস্থা বিদায় করে প্রশাসন আর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করে ক্ষমতার আছে তার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার সাহস বেশির ভাগ গণমাধ্যম আর সুশীল সমাজের নেই। তারা আজকে ঘটা গুমের জন্য ১৪ বছর আগে ক্ষমতা থেকে যাওয়া বিএনপিকে দায়ী করেন। নূন্যতম বিবেক বা লজ্জা তাদের নাই। এর মধ্যে অল্প যে কয়জন সত্য বলার চেষ্টা করেন, প্রতিবাদ করেন ডঃ জাফর উল্লাহ তাদের একজন। তাই তার কাছে মানুষের প্রত্যাশাও বেশি। তিনি যখন অপ্রাঙ্গিকভাবে বিএনপির প্রধানকে আঘাত করেন, তখন সেই আঘাত দলের প্রতিটা কর্মীর বুকে লাগে।

তৃতীয়ত, দুঃসময়ের টিকে থাকা সুসময়ের বিপ্লবের শামিল। দেশি বিদেশি চক্রান্ত  মোকাবেলা করে যেভাবে বিএনপি দেশের কোটি মানুষের একমাত্র আশার আলো হয়ে টিকে আছে কেবলমাত্র সে জন্যই সে অভিবাদন পেতে পারে। 

চতুর্থত, এই মুহুর্তে বিরোধী দল বা মতের যে কোনও সমালোচনাই দিনের শেষে ফ্যাসিবাদি এই সরকারের হাতকে শক্তিশালী করবে। এটা দেশ ও জাতিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হবার সময়, পারষ্পরিক সমালোচনা আর বিভেদের সময় না।

পঞ্চমত, বিএনপি প্রতিটি নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান করে। খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা, চিকিৎসক ডঃ জাফরুউল্লাহ চৌধুরী আমাদের সকলেরই শ্রদ্ধার মানুষ। তিনি চাইলে যে কোনও সময়ই তার পরামর্শ দলকে দিতে পারেন। চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকেও জানাতে পারেন। কিন্তু সেই পরামর্শ দেবার জায়গা প্রেসক্লাব হওয়া এই মুহূর্তে কতটা সমীচীন সে ভার আমি তার উপরই ছেড়ে দিলাম।

নিশ্চিতভাবেই বিএনপি একেবারে নিখুঁত কোনো দল নয়; পৃথিবীতেই 'নিখুঁত দল' বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। এই জাতির ইতিহাসের চরমতম স্বৈরাচারী সময়টাতে বিএনপি তার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এই লড়াইয়ে পদ্ধতিগতভাবে বিএনপি'র আর কোথায় কোথায় উন্নতির জায়গা আছে, সেটা নিয়ে আলোচনা হোক, কিন্তু এমন কোনো অযৌক্তিক সমালোচনা বিএনপি'র হওয়া উচিত না, যেটা প্রকারান্তরে বিএনপির নেতাকর্মীদের হতোদ্যম করে এবং দেশের মানুষকে আশাহত করে। আর সেটা হওয়া মানেই হল এই রাষ্ট্রের উপরে প্রচণ্ডভাবে চেপে বসা ফ্যাসিবাদকে আরও শক্তিশালী করা।

  • লেখক জাতীয় সংসদ সদস্য ও আইনজীবী।