Search

Sunday, December 13, 2020

রোহিঙ্গাদের কি রেখেই দেবে বাংলাদেশ

—  সায়ন্থ সাখাওয়াৎ 

জাহাজে করে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হয়।

তিন বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও বাংলাদেশ একজন রোহিঙ্গাকেও তাদের দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে পারেনি। কিন্তু বারো লাখের বেশি রোহিঙ্গার চাপে পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন কক্সবাজার থেকে গত সপ্তাহে হাজার দেড়েক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশেরই আরেক অঞ্চলের দ্বীপ ভাসানচরে স্থানান্তর করেছে। সেখানে এই রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপত্তা, আবাসন, চিকিৎসা, তাদের শিশুদের জন্য শিক্ষাসহ উন্মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করেছে। সেখানে ইতিমধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে ১ হাজার ৪৪০টি ছাউনি নিয়ে ১২০টি গুচ্ছগ্রাম। প্রতিটি ছাউনিতে ১৬টি রুম। রান্নার জন্য ৮ পরিবারের জন্য এক জায়গায় ৮টি চুলা। সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের জন্য সরকার তো রেশন দিচ্ছেই। আরও আছে ২২টি এনজিওর সাহায্য।

 

আপাতত সেখানে লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বসবাসের জায়গা তৈরি করা হয়েছে। তবে ভাসানচরে যে পরিমাণ জায়গা আছে তাতে পর্যায়ক্রমে প্রায় সব রোহিঙ্গাকে সেখানে হস্তান্তর করা সম্ভব বলে অনেকেই মত দিয়েছেন। কেউ কেউ এমনও বলছেন যে প্রথম পর্যায়ে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গারা ভাসানচরে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে যখন কক্সবাজারে থেকে যাওয়া তাদের স্বজনদের জানাবেন যে নতুন জায়গায় তারা অনেক ভালো আছেন, তখন সব রোহিঙ্গাই ভাসানচরে স্বেচ্ছায় যেতে চাইবেন।

প্রথম দফায় স্বেচ্ছায় স্থানান্তরিত রোহিঙ্গারা ভাসানচরে গিয়ে খুশি বলেই সংবাদমাধ্যমে জানা যাচ্ছে। কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকায় যে পরিবেশে রোহিঙ্গাদের রাখা হয়েছে, তার চেয়ে অনেক সুন্দর খোলামেলা পরিবেশ পেয়ে তাদের খুশি হওয়ারই কথা। সেখানে অনেকটা মুক্ত পরিবেশ পেয়েছেন তারা। তাদের শিশু সন্তানরা খেলাধুলা করতে পারছে, যা কক্সবাজারে পারেনি। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত লাল রঙের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা দেখে হয়তো অনেক বাংলাদেশিও আফসোস করেছেন যে এমন জায়গা পেলে তারাও সেখানে বসবাস করতে চলে যাবেন।

কিন্তু এই চমৎকার জায়গাটিতে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করার মধ্য দিয়ে আমরা বিশ^বাসীকে কী বার্তা দিলাম? বাংলাদেশ কি তবে ধরেই নিয়েছে রোহিঙ্গাদের আর মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না? তাই তাদের জন্য স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে কি সরকার? এই পদক্ষেপের ফলে সরকারের যথাযথ প্রচেষ্টা থাকলে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর যে ন্যূনতম সম্ভাবনাটুকু ছিল তাও কি শেষ হয়ে যাবে না?

এই স্থানান্তর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের আপত্তি আছে। আপত্তি আছে জাতিসংঘেরও। ইতিমধ্যে জাতিসংঘ বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা রোহিঙ্গাদের এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নয়। মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোও এই স্থানান্তরের সমালোচনা করেছে। যদিও জাতিসংঘ বা এসব সংস্থা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে এখনো কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখেনি। আর তাদের আপত্তির উদ্দেশ্যও ভিন্ন। ফলে তাদের আপত্তি কানে তোলা নিষ্প্রয়োজন বলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের যুক্ত থাকা উচিত বলেও বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘উচিত’ আর জাতিসংঘের ‘উচিত’ যে সমান্তরাল হবে এমন তো কোনো কথা নেই। তাই জাতিসংঘ অনড় থেকেছে তার অবস্থানে। আর বাংলাদেশও অটল থেকেছে তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে। কিন্তু এতে বাংলাদেশের লাভ হলো নাকি ক্ষতির মুখে পড়ল সেটা সময় বলবে।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যমে রোহিঙ্গাদের এ স্থানান্তরের বিষয়ে সরকারের প্রশংসা করার প্রতিযোগিতা ছিল লক্ষণীয়। বিশেষ করে টিভি টক-শোতে সরকারপন্থি আলোচকরা এ স্থানান্তরের পক্ষে ব্যাপক ওকালতিতে নেমে পড়েন। একজন সম্পাদক ও একজন সাবেক কূটনীতিক একটি অনুষ্ঠানে বলছিলেন রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বিশ-ত্রিশ বছর লেগে যেতে পারে। মুখে বিশ-ত্রিশ বছর বললেও তাদের চোখেমুখে ছিল অবিশ^াসের হাসি। অর্থাৎ তারা ধরেই নিয়েছেন যে এই রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে গ্রহণ করে নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ বাংলাদেশের সামনে নেই। তারা এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বাংলাদেশে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের আমরা নাগরিকত্ব দিয়েছি। তারা এখন বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা ও ভোটার। সেই উদারতা আমরা দেখিয়েছি। সুতরাং রোহিঙ্গাদের ব্যাপারেও বাংলাদেশের উদারতা দেখানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা। কিন্তু তারা কেউ এ প্রশ্নটি করেননি যে তিন বছরে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে সরকার কী প্রচেষ্টা চালিয়েছে? কেন সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন বাংলাদেশের পক্ষে আনতে? আর এত তাড়াতাড়ি রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিরাপদ নিবাস গড়ে দিয়ে তাদের রেখে দেওয়ার মেসেজটি দেওয়া কতটা সংগত হয়েছে সে প্রশ্নটিও করেননি তারা।

গত বছর ৩১ আগস্ট দেশ রূপান্তরেই লিখেছিলাম সরকারের অনেকগুলো ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে জাতিকে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের প্রথম ভুল, এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি না করা। এর আগে ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান এবং ২০০৩ ও ২০০৫ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার সফল হয়েছিল রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শও নিতে পারত সরকার। তাও নেয়নি। দ্বিতীয় ভুল মিয়ানমারের ফাঁদে পড়া। অনেকেরই হয়তো মনে আছে, যখন বানের জলের মতো বাংলাদেশে ঢুকছিল রোহিঙ্গারা, যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের ওপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিচ্ছিল, তখন চাল আমদানির কথা বলে মিয়ানমার গিয়েছিলেন সরকারের তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী। তখনই গুঞ্জন উঠেছিল যে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাশ কাটিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় যাচ্ছে কারও বুদ্ধিতে। যারা সরকারকে ওই পথে পরিচালিত করেছে তারা কোনোভাবেই বাংলাদেশের বন্ধু না। খাদ্যমন্ত্রীর ওই সফর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তখন যে মেসেজ দিয়েছিল তা বাংলাদেশকে তাদের সহানুভূতির তালিকা থেকে বের করে আনার জন্য ছিল যথেষ্ট।

আজও এ সরকারের জন্য সে একই কথাই প্রযোজ্য। তারা সব সময়ই একলা চলার নীতি অবলম্বন করেছে। বিএনপিসহ ডান, বাম, মধ্য কোনো দলকেই ডাকেনি এ বিষয়ে সমাধানের পরামর্শ নিতে। রোহিঙ্গা ইস্যুটি রাজনৈতিক। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির অংশ রোহিঙ্গা ইস্যুটি। তাই এটিকে সমাধানের পথও হতে হবে রাজনৈতিকই। কিন্তু বাংলাদেশে সহাবস্থানের রাজনীতি নির্বাসনে রেখে দেশ পরিচালনার মতো জাতীয় ইস্যুতেও রাজনৈতিক ঐক্য নিয়ে মোটেই ভাবেনি সরকার।

বাংলাদেশ সরকারের অকৃত্রিম বন্ধু বলে কথিত ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে কেন বাংলাদেশের পক্ষে নেই, তারা কেন জাতিসংঘে এ ইস্যুতে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রইল, সে প্রশ্নের উত্তর নেই। বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে সবচেয়ে বড় অংশীদার চীনও এ ইস্যুতে কেন মিয়ানমারের পক্ষে ভোট দেয়, সে প্রশ্নেরও উত্তর মেলে না।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর আপত্তির উদ্দেশ্য যাই হোক, তাদের আপত্তির মুখে বাংলাদেশ যদি রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর স্থগিত রেখে বলত যে তবে তোমরা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে আমাদের সহযোগিতা করো, সেটাই হতো যুক্তিসংগত। এতে ওই সব সংস্থা একটা চাপের মধ্যে থাকত। কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রভাবশালী দেশগুলোকে পক্ষে আনার চেষ্টা চালাতে পারত। কিন্তু বাংলাদেশের ভূমিকা দেখে মনে হতে পারে যে, সরকার রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে গ্রহণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

সরকারের পক্ষে যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয় সেটা হয়তো তারা ভালো করেই জানে। জানে বলেই তাদের এখন ভাসানচর প্রকল্প ছাড়া আর কোনো পথ নেই। এ সরকারটি গত একযুগ ধরে যে পদ্ধতিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছে তাতে তাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক ফোরামে জোর গলায় কথা বলা মুশকিল। ভোটবিহীন নির্বাচনে যারা ক্ষমতায় আসে তারা একদিকে যেমন থাকে জনবিচ্ছিন্ন, অন্যদিকে সারাক্ষণ থাকে ক্ষমতা হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত। যাদের ক্ষমতায় থাকার জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে সমর্থন ভিক্ষা করতে হয়, তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য কোনো বিষয়ে দরকষাকষি করা। সেটা যত ন্যায্যই হোক না কেন। সে কারণেই হয়তো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এবং বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম দেশগুলো পেয়ে বসেছে বর্তমান সরকারকে। তারা জানে জনবিচ্ছিন্ন একটি সরকারকে খুব বেশি পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই। বরং তারা মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে তাদের ব্যবসায়িক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে চলছে, সেখানে বাংলাদেশের কোনো স্থান নেই।

 






লেখক —  চিকিৎসক ও কলামিস্ট।ইমেইল —  sayantha15@gmail. লেখাটি প্রথম দৈনিক দেশরূপান্তর এ প্রকাশিত হয়েছে। 

 লিঙ্ক —   https://bit.ly/34oN0w7


No comments:

Post a Comment