Search

Thursday, September 16, 2021

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও প্রকট বৈষম্য

মোঃ মিজানুর রহমান



১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর থেকেই স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ২৩ বছর ধরে পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ শাসন, শোষণ, বঞ্চনা অর্থাৎ বৈষম্যের শিকার হয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য, চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য, রাজনৈতিক অসমতা ছিল অন্যতম। বৈষম্যের কিছু উদাহরণ নিম্নরূপঃ ১৯৫৫ সালের হিসেব মতে সামরিক বাহিনীর ২২১১ জন কর্মকর্তাদের মধ্যে বাঙালী ছিল মাত্র ৮২ জন। ১৯৫৬ সালের হিসেব মতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ৪২,০০০ কর্মকর্তাদের মধ্যে বাঙালী ছিল মাত্র ২,৯০০ জন। ১৯৬২ সালের হিসেব মতে পাকিস্তানের মন্ত্রণালয়গুলোতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের ৯৫৪ জনের মধ্যে বাঙালী ছিল মাত্র ১১৯ জন। ১৯৬২ সালের হিসেব মতে বিদেশে ৬৯ জন রাষ্ট্রদূতের মধ্যে ৬০ জনই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের। ১৯৪৭-১৯৭০ সাল পর্যন্ত মোট রপ্তানী আয়ের শতকরা ৫৪.৭ ভাগ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের। রাপ্তানী আয় বেশী করলেও পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আমদানী ব্যয় ছিল মাত্র শতকরা ৩১.১ ভাগ। সকল ক্ষেত্রেই ছিল এ রকম বৈষম্য। 

 

পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী ছিল মোট জনসংখ্যার (প্রায়) ৫৬% এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ছিল হাজার রছরের পুরনো। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে (প্রায়) ৪৫% জনসংখ্যার মধ্যে ছিল বিভিন্ন ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতি বিদ্যমান (দৈনিক ইনকিলাব, ২০১৬)। আবার সে সময় জনসংখ্যার ভিত্তিতে ক্ষমতার বন্টন পূর্ব পাকিস্তানের অনুকুল হওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তান এক ইউনিট তত্ত্ব নামে এক অভিনব ধারণার সূত্রপাত করে ক্ষমতা তাদের দখলে রাখার জন্য । শাসন, শোষণ, বঞ্চনা অর্থাৎ বৈষম্যে থেকে মুক্তি পেতেই জনগণ সংগঠিত হয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক দলের সাথে মিশে আন্দোলন করেন এবং ১৯৭১ সালে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা করেন এবং তার এর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে কৃষক-শ্রমিক, মজুর, যুবক, আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা এবং যুদ্ধকালীন সময়ে সেক্টরসমূহ, ফোর্সগুলো, গেরিলা বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনী যে যার অবস্থান থেকে নয় মাস যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করছেন। শাসন, শোষণ, বঞ্চনা অর্থাৎ বৈষম্যে থেকে মুক্তি পেতেই নয় মাস যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর হয় কাঙ্খিত বিজয়। 

 

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী’র প্রাক্কালে স্বাধীন এই বাংলাদেশে চলমান সময়ে আর্থ-সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের ভাবনা ‘বৈষম্য থেকে কি সম্পূর্ণ মুক্ত’ ? জনগণের ভাবনা এই কারণে যে, জনগণ এখন তার ভোট নিজে পছন্দমতো দিতে পারেন না। ভোট দিতে গেলে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন কেন্দ্রে তাদের দলের লোকজন বা ভোটার ছাড়া অন্য দলের লোকজনদের বা ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেন না, বরং ত্রাসের সৃষ্টি করে কেন্দ্র থেকে বিতারিত করে দেন। আর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যেন সে সময় কাঠের চশমা পড়ে থাকেন এবং নির্বাচন কমিশন যেনো অন্ধ হয়ে থাকেন। যা নির্বাচনকালীন সময়ে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণ ওয়াকিবহাল। বর্তমান সময়ে করোনার প্রভাবে আয় কমে যাওয়ায় মানুষের জীবন-যাপন কষ্টার্জিত। তার উপরে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে যাপিত জীবনে মানুষের নাভিঃশ্বাস উঠে গেছে। তার সাথে ধর্ষণ, ভীতিকর পরিবেশ অব্যাহত আর প্রতিবাদ করলেই মামলা, হামলায় জর্জরিত জনজীবন। ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক তথ্য প্রযুক্তি আইনের ফলে মানুষের কথা বলা ও লেখার স্বাধীনতা সংকুচিত। 

 

এমন পরিস্থিতিতেও জনগণের জীবনের সাথে জড়িত ইস্যুসমূহ, অধিকার, মানবাধিকার, ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়সমূহ রাজপথে ও বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, সভা-সমাবেশ, ভার্চুয়াল সংলাপ এর মাধ্যমে তুলে ধরছেন বিরোধী দল বিএনপি। জনগণের বিষয়সমূহ নিয়ে বিএনপি তাদের কর্মকান্ড চলমান রাখায় ক্ষমতাসীনরা তা স্তব্ধ করে দিতেই বিএনপি নেতা-কর্মী-সমর্থকদের নামে মামলা দায়ের করেন বা করান এবং গ্রেফতার, রিমান্ড, জেল-জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়ন অব্যাহত রাখেন।  বিএনপি’র ৩৫ লাখ নেতা-কর্মীর নামে লক্ষাধিক মামলা (দি ডেইলি স্টার-বাংলা, ২০২০)। এসব দেখে জনমন ভীত-ত্রস্ত। তারপরেও বিএনপি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় থেমে নেই এবং জনগণও মিডিয়া বা গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে জ্ঞাত এবং সজাগ। বিএনপিকে দমাতে পারলেই যেনো প্রতিবাদ করার কেউ নেই ভোটারবিহীন ক্ষমতাসীনদের। তাই বিএনপি’কে দমানোর জন্য ক্ষমতাসীনরা তাদের প্রপাগান্ডা চালাচ্ছেন। প্রথমে তারা সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি তুলে দেন এবং ক্ষমতায় থেকেই তারা জোর, জুলুম, ভীত, ত্রাস পরিবেশ সৃষ্টি করে কেন্দ্র দখল করে নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীদের বিজয়ী করে নেন। বিএনপিকে স্তব্ধ করতেই গণতন্ত্রের মা বিএনপি’র চেয়াপার্সনকে ভিত্তিহীন মামলায় সাজা দিয়েছেন ও তারুণ্যের অহংকার বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকেও সাজা দিয়েছেন এবং এখনো মামলা দেওয়া অব্যাহত রেখেছেন। সেই সাথে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক, স্বনির্ভর ও আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি, উন্নয়নের রূপকার, বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এর দেশ গঠনে ও উন্নয়নে অবদান নতুন প্রজন্ম যেনো জানতে না পারেন এ জন্যই ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ স্থাপনা, প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে জিয়াউর রহমান এর নাম পরিবর্তন করার কাজে লিপ্ত রয়েছেন। তার কিছু উদাহরণ উল্লেখ করা হল-২০১০ সালের মার্চ মাসে বরিশালে শহীদ জিয়াউর রহমান বিশ^বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় নামে সংসদে বিল পাস এবং পরে পরিবর্তন করে ক্ষমতাসীনরা। ২০১০ সালের নভেম্বরে নারায়নগঞ্জের চাষাড়ায় শহীদ জিয়া হলের নাম পরিবর্তন করে টাউন হল করেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রের প্রায় ১২০০ কোটি টাকা খরচ করে ২০১৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ নামফলকে জিয়া নাম খুলে তদ্স্থলে হযরত শাহজালাল (রহ.) নাম তোলেন এবং ইংরেজী ও আরবী ফলকেও নাম পরিবর্তন করেন। ২০১৬ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রত্যাহার এবং প্রত্যাহারের পাশাপাশি জাতীয় জাদুঘর থেকে ওই পুরস্কারের মেডেল ও সম্মাননাপত্র সরিয়ে ফেলার সুপারিশ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং পরবর্তীতে জাতীয় জাদুঘর থেকে স্বাধীনতা পদক সরিয়ে নেয়া হয়। ২০১৭ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার নাম পরিবর্তন করে ইন্দুরকানি করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার এবং পরবর্তীতে গেজেট প্রকাশ করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে রাজধানী শাহবাগে অবস্থিত ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’ নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘শিশু পার্ক’। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের কাজীর দেউরিতে অবস্থিত ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ এর নামফলকের উপর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘরের নামফলকের স্টীকার লাগানো হয়। ২০২০ সালে জুন মাসে বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে ‘গাবতলী শহীদ জিয়া উচ্চ বিদ্যালয়’ এর নাম পরিবর্তন করে গাবতলী পূর্বপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় রাখা হয়েছে এবং ‘সুখানপুকুর শহীদ জিয়াউর রহমান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ এর নাম পরিবর্তন করে সুখানপুকুর বন্দর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় করেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২০ সালে অক্টোবরে জয়পুরহাট শহীদ জিয়া ডিগ্রী কলেজের নাম পরিবর্তন করে জয়পুরহাট ডিগ্রী কলেজ করা হয়। ২০২০ সালেই অক্টোবরের শেষে পুরান ঢাকার মোগলটুলিতে ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়’ নাম পরিবর্তন করে পুরান মোগলটুলি উচ্চ বিদ্যালয় রাখা হয়। অথচ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই বিদ্যালয়ের নাম ছিল ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়’ । 

 

নাম পরিবর্তন করেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের প্রযোজনায় কতিপয় নামহীন কুশিলব দ্বারা ভিত্তিহীন কাহিনী নির্ভর তথ্যসন্ত্রাস প্রপাগান্ডাস্বরূপ ‘ইনডেমনিটি’ নামক নাটক মঞ্চস্থ ও প্রচার করছেন কতিপয় টিভি চ্যানেল ও মিডিয়ার মাধ্যমে যেখানে জিয়াউর রহমান এর ভূমিকা ভিত্তিহীন, উদ্ভট, মিথ্যাচারিতা করে উপস্থাপন করা হয়েছে। যার সাথে বাস্তবতার কোন মিল নেই। এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, নায়ক, গায়ক, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাসসহ বিভিন্ন সংগঠন। মহান স্বাধীনতার ঘোষক বীর মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে নিয়ে তথ্যসন্ত্রাস, কটুক্তি ও নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি জনদৃষ্টি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার জন্য কৌশলে উন্নয়নের প্রকল্প উপস্থাপন করেন ক্ষমতাসীনরা। 

 


নানা প্রকল্পের বাজেট বছরে বছরে বাড়িয়ে তিনগুন বা চারগুন করে নিজেদের পকেট ভরান ক্ষমতাসীনরা। কেননা, জনগণ মিডিয়া বা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জেনে গেছেন ক্ষমতাসীনদের উন্নয়ন প্রকল্পের বাজেট বাড়িয়ে দুর্নীতির কার্যকলাপ। আসা যাক প্রকল্পগুলোর বিষয়ে। উন্নয়নের যেসব প্রকল্পের কথা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বলছেন সেগুলো তো বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময়ে হাতে নেওয়া প্রকল্প। রাজধানীর যানযট নিরসনে মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রথম হাতে নেন বিএনপি সরকার। ২০০৫ সালে ঢাকার জন্য ২০ বছরের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) অনুমোদন করেন এবং এতে যানজট নিরসনসহ ২০২৪ সালের মধ্যে একাধিক মেট্রোরেলসহ নানাপ্রকল্প বাস্তবায়নের পরামর্শ দেয়া হয় (প্রথম আলো,২০১৯)। তারই ফলশ্রুতিতে আজকের এই মেট্রোরেল প্রকল্প। ২০০৪ সালে জুলাই মাসে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা এর সুপারিশ মেনে মাওয়া-জাজিরার মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মানের সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন সরকার (বাংলা ট্রিবিউন, ২০১৭) অর্থাৎ তৎকালীন বিএনপি সরকার। পরে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একনেক বৈঠকে ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ধরে শুরু হয় পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ। আর বর্তমান সরকার ক্ষমতায় জেকে বসে দফায় দফায় পদ্মা সেতু প্রকল্পের বাজেট বাড়ান এবং ২০২০ সালে এসে এই প্রকল্পের বাজেট দাড়িয়েছে প্রথম বাজেটের চেয়ে তিনগুন বেশী ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা । বিএনপি সরকারের সময় অর্থাৎ ২০০৬ সালে ১৯২.৪৮ কিলোমিটার ঢাকা-চট্টগ্রাম চারলেন মহাসড়ক ২ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একনেকে অনুমোদন করেন এবং পরবর্তীতে ব্যয় বৃদ্ধি করে করেন ৩ হাজার ৮১৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা আর ২০১৬ সালে ০২ রা জুলাই ১৯০.৪৮ কিলোমিটার সড়ক উদ্বোধন করেন (৩) আওয়ামী লীগ সরকার । মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার প্রকল্পে প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে তা বাড়িয়ে নির্ধারণ করেন ৭৭২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। সময়মতো তাতেও প্রকল্পটি সম্পন্ন না হওয়ায় পরে ব্যয় বাড়িয়ে নির্ধারণ করেন ১২১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা (২)। অর্থাৎ প্রথম বাজেটের চেয়ে চারগুন বেশী করা হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে । রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে বাজেট ছিল ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা আর ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাড়িয়ে তা করা হয়েছে ১৫ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা । দেখা য়ায় প্রকল্পগুলো বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় শুরু ও সে সময়ের বাজেট ছিল এক রকম এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সময় প্রকল্পগুলোর বাজেট; শুরুর সময়ের তুলনায় তিন বা চারগুন বাজেট বাড়ানো হয়। বাজেটের এই অতিরিক্ত টাকাগুলো ক্রয়ে দেখা যায় বাজার দামের তুলনায় বেশ কয়েকগুন বেশী। তেমনি এক সরকারী ক্রয়খাতে মিডিয়া বা গণমাধ্যমের কল্যাণে জনগণ জেনেছেন এক বালিশের দাম (উঠানোর খরচসহ) প্রায় সাত হাজার টাকা, এক পর্দার দাম ৩৭ লাখ টাকা-যা দুর্নীতির নামান্তর। কেউ বা কোন সংগঠন এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করলে বা লেখালেখি করলে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বলা হয় ওরা স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার ইত্যাদি ইত্যাদি। এক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধারাও হয়ে যান রাজাকার বা স্বাধীনতা বিরোধী। প্রতিবাদ করায় শুধু বিএনপি নেতা-কর্মীরাই নয়; জনসমর্থিত বিএনপি’র চলমান আন্দোলনকে সমর্থন করায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী সাহেবরাও ক্ষমতাসীনদের দ্বারা স্বাধীনতাবিরোধী বা রাজাকার হয়ে যান। বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সময়েও চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা য়ায় বৈষম্য। যা ২০১৪ সালে নভেম্বর মাসে ছাত্রলীগের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম (বর্তমানে মৃত)  এর বক্তব্য থেকেই অনেকটা স্পষ্ট।

 

কিন্তু জনগণ বৈষম্য চান না। কেননা, বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতেই স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১-এ বিজয় অর্জন করেছিল এদেশের জনগণ। অথচ আজ এতো বছর পর স্বাধীনতার সুর্বণ জয়ন্তীর প্রাক্কালে সেই বিজয়ের ফলাফল কি এই যে, চলছে নাম পরিবর্তনের খেলা, তথ্যসন্ত্রাসস্বরূপ ইতিহাস বিকৃত মিথ্যাকাহিনী নির্ভর নাটক প্রচার করা, উন্নয়ন প্রকল্পের বাজেট বাড়িয়ে বাজার দামের তুলনায় বেশী দাম দেখিয়ে টাকাগুলো নিজেদের পকেটে তোলা, ভোটারদের নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে ক্ষমতাসীনদের কর্তৃক বাধা দেয়া-ভয়ভীতি দেখানো বা কেন্দ্রে প্রবশ করতে না দেয়া, ভোটকেন্দ্র থেকে বিরোধী দলের এজেন্টদের বের করে দেয়া, আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী বা নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্ব, মুক্তভাবে লেখার বা কথা বলার অধিকারকে সৃষ্ট তথ্য-প্রযুক্তি আইন দ্বারা দমানো, করোনাকালীন সময়ে গরীব মানুষদের মোবাইলের মাধ্যমে সরকারী সহায়তার টাকা, কাবিখা’র টাকা, বিভিন্ন ভাতা ও উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা ক্ষমতাসীনদের দ্বারা লুটপাট, অনুমতি ছাড়া সভা-সমাবেশ করতে পারবে না বলে প্রশাসনের এমন আদেশ দেয়ার পর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলো ঠিকভাবে সভা-সমাবেশ করতে পারছে না পক্ষান্তরে ক্ষমতাসীনরা দেদারসে রাজপথে থেকে মিছিল-স্লোগান ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে-অর্থাৎ বৈষম্য চলমান। তাই বিভিন্ন বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতেই যেমন নয় মাস যুদ্ধে করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করেছিল এদেশের জনগণ এবং ঠিক তেমন স্বাধীনতার সুর্বণ জয়ন্তীর প্রাক্কালে জনগণের ভাবনা নিপাত যাক আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিকসহ সকল বৈষম্য, প্রতিষ্ঠিত হোক সবার সমান অধিকার, ভোটাধিকার,  মানবাধিকার। প্রতিষ্ঠিত হোক সুশাসন, সুআইন, সুবিচার। 

 

  • লেখক সাংবাদিক ও কলামিস্ট।  


No comments:

Post a Comment