Search

Thursday, September 16, 2021

ওবায়দুল কাদেরের উপহার বাংলাদেশের দুর্নীতিরই চিত্র

ফাইজ তাইয়েব আহমেদ


রোলেক্স ডেটজাস্ট, ডায়মন্ড ডায়াল, দাম ৯,৩৩,০০০ টাকা

একজন মন্ত্রী প্রতিদিন অফিস আওয়ারে ফ্যাশনের নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার চেহারা দেখাতে পারেন না। এই সময়টায় তার কাজ দেখানোর কথা। নিয়ম করে প্রতিদিন এই যে ফ্যাশন শো, তার সাজসজ্জ্বার টাকা আসে কোথায় থেকে?

১। কাদের সাহেবের বেতন কত? তার মাসিক বেতনের টাকায় কয়টা স্যুট কেনা যায়?

২। মন্ত্রী ভিনদেশি রাষ্ট্রের সৌজন্য উপহার ছাড়া কোন ধরণের গিফট আইটেম নিতে পারেননা। ভিনদেশি রাষ্ট্রের সৌজন্য উপহারও রাষ্ট্রের তোশাখানায় জমা দেয়া লাগে। গিফট নিলেই অন্যকে অবৈধ সুবিধা দিবার বিষয় চলে আসে, এতে দুর্নীতি বাড়ে। বাড়ে যোগ্যকে ঠকানো এবং ঠেকানোর বিষয়। এখানে বৈষম্যের বিষয়ও জড়িত। নেত্রা নিউজে অভিযোগ ছিল কাদের সাহেব কন্ট্রাক্টরদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা দামের ঘড়ি নিয়েছেন, তা উনি ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। উপহারের কথা বলে এসব দুর্নীতির বিষয় কার্পেটের নিচে চাপা দেয়া যাবে না। দুর্নীতির টাকা দিয়ে দিনের পর দিন ফ্যাশন শো চলছে, তা কি মহামান্য আদালতের নজরে আসছে না?

রোলেক্স ডে ডেট প্রেসিডেন্ট ঘড়ির, দাম ২৮,৮৬,০০০ টাকা
৩। এইযে গরমের দেশে ব্রিটিশের সাজ সাজার মধ্যে গোলামের স্যার হয়ে উঠার বাসনা, এটা বাংলাদেশের হঠাৎ বড় লোক হওয়া লোকেদের আচরণগত বক্রতা। গণ্ডারের চামড়ার উপর চুরির টাকায় কেনা স্যুট পরলেই চুরি চামারি লুকানো যায় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েকবার দলীয় নেতাদের স্যুট কোট না পরে স্বাভাবিক চলাফেরা করতে বলেছিলেন!

৪। স্যুট ঠান্ডার দেশের ইউরোপীয়দের পোশাক, সেখানে স্যুট পরতে এসিতে থাকা লাগে না। বাংলাদেশে ভাদ্র মাসের তালপাকা গরমে এগুলা পড়ে থাকতে হলে এসি চালাতে হয়। অতিরিক্ত এসি দেশের শহর গুলোর পরিবেশ নষ্ট করছে, তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে। গবেষণা বলছে ঢাকার অভ্যন্তরের তাপমাত্রা ঢাকার বাইরের থেকে অন্তত ৮ ডিগ্রি বেশি। একটা শহরের প্রাণ চক্র এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য এটা এনাফ। মাত্রাতিরিক্ত এসি ঢাকার পরিবেশ বিপর্যয়ে একটা ভূমিকা রাখছে।

৫। কাদের সাহেব একই স্যুটে তার ডজন ডজন ছবি শেয়ার দেয়। এর মানে কি? এক ভঙ্গির ছবি বার বার দেয়ার মধ্যে ছাগলামি আছে, আছে আরেকটা বিষয়। তার তোষামুদে লোকেরা এগুলা দেখে, লাইক শেয়ার দেয়।

প্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয় ব্রাউজিং যে কার্বন এমিশান করে তার উপর বিবিসি ফিউচার প্লানেট এর একটা গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা আছে। সেখেনে দেখানো হয়েছে, প্রতি পৃষ্ঠা ভিউ থেকে যে ডিজিটাল এমিশান (কার্বণ ডাই অক্সাইড নির্গমন) হয় তা আনুমানিক ১.২ থেকে ৩.৬ গ্রাম। আর হ্যাঁ আমাদের বিদ্যুৎ এর ৯৬% ই নবায়ন যোগ্য বিদ্যুৎ নয়।  

লুই ভিতন তাম্বো স্পিন টাইম রিগাতা ঘড়ি, দাম ৩৭,৩১,৫০০ টাকা


৬। কাদের সাহেবের ফ্যাশন শোতে শ্রম ঘন্টা নষ্ট হচ্ছে। এই সময়ে তার রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার কথা।

জার্মান চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেলের অতি সাধারণ  পোশাকের বিষয়টা সবাই নিশ্চয়ই জানেন। ১০ বছরের ব্যবধানে এক সাংবাদিক উনাকে একই সুপারমার্কেটে (পড়েন মুদি দোকান) দেখেছেন। সাংবাদিক বলেছেন, মার্কেল ১০ বছর আগেও আপনাকে এক্সাক্টলি সেইম পোশাকে দেখেছি। মার্কেল বলেছেন, আমি মডেল নই, মানুষের সেবক।

৭। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৭ সালের একটি মতামত জরিপমতে, ১৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৩তম ছিল। গ্লোবাল কম্পেটিটিভ ইনডেক্স ২০১৭ বলছে, এশিয়ার মধ্যে নেপালের পরেই সবচেয়ে খারাপ রাস্তা বাংলাদেশের। কাদের সাহেবের কেতাদুরস্ত পোশাক তার মন্ত্রণালয়ের মানহীন  কাজের মানের সাথে যায় না।

কাদের সাহেব যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রী। হাজার হাজার সেতুর প্রকল্প বাংলাদেশের দুর্নীতির প্রধানতম এক খাত। শত শত সেতু অপ্রয়োজনে তৈরি করা, নদী-খাল-নালা না থেকেও যত্র তত্র টাকা খাওয়ার জন্য সেতু তুলে ফেলে রাখা হয়েছে। দেশের হাওড় বিলের মাঝে রাস্তা ছাড়াই সেতু উঠানো আছে। বহু জায়গায় সেতু আছে রাস্তা নাই। অনেক জায়গায় সেতুতে উঠতে মই লাগে। বাংলাদেশেরর একটা সেতুও মেয়াদ বাড়ানো আর খরচ বাড়ানো ছাড়া সমাপ্ত হয় না। অতি দুর্নীতি মানহীন নির্মান সামগ্রী, কম পাইলিং, কম সিমেন্ট ও কম রড ব্যবহারের কারণে বহু সেতু নির্মাণ কালের অব্যবহতি পরেই ভেঙে পড়ে কিংবা নষ্ট হয়। এমনকি নির্মাণকালেই ভেঙে পড়ার নজিরও আছে বহু। অন্যদিকে সেতু দৈর্ঘ্যে ছোট হয় যা নদী ও খাল হত্যা করে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সেতু গুলোতে লেইনের প্রস্থ চুরির বিষয়ও আছে। বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা খরচ করেও বাংলাদেশের অধিকাংশ রাস্তা ঘাট চলাচলের অনুপোযোগী, খান খন্দ আর গর্ত ভরা।এই সব দুর্নীতি কাদের সাহেবদের জানার বাইরে হয়ে যাচ্ছে ভাবার কোন কারণ নাই। হলেও এসব প্রতিহত করার দায়িত্ব উনাদের। উপহার এসব দায়িত্বের সাথে সরাসরি  কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করে।

মূল বিষয় হচ্ছে, মন্ত্রীর শো ওফের সাথে দুর্নীতির সাক্ষাৎ সংযোগ আছে। ওবায়দুল কাদেরের উপহার বাংলাদেশের দুর্নীতির চিত্র মাত্র। এইসব দুর্নীতি এবং হীন্মান্যতা সেলিব্রেশনের বিষয় নয়, কিংবা হাসাহাসির বিষয় নয়। বরং কিভাবে সমাজে জবাবদিহি আসবে তা ভাবার বিষয়, প্রতিবাদের বিষয়।


  • লেখক টেকসই উন্নয়নবিষয়ক বিশ্লেষক। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশ, বাংলাদেশ: অর্থনীতির ৫০ বছর বইয়ের প্রণেতা। তাঁর ইমেইল অ্যাকাউন্ট faiz.taiyeb@gmail.com 


No comments:

Post a Comment