Search

Sunday, October 10, 2021

দামে দিশাহারা ক্রেতা, এখন সংসার চালানোই দায় — ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সূত্র প্রথম আলো 



দামে দিশাহারা ক্রেতা, এখন সংসার চালানোই দায়। মূল্যস্ফীতি অসহনীয় এবং সরকারের মূল্যস্ফীতির তথ্য ডাহা মিথ্যা।

করোনাভাইরাস মহামারি মাঝামাঝি স্তর পার হবার পর থেকেই আমি বলে আসছি বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি প্রায় দুই অঙ্কের কাছাকাছি। ছবির দুটি তালিকা মিলিয়ে দেখুন, বাৎসরিক হিসেবে মূল্যস্ফীতি সরকার ঘোষিত সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভুত উভয় মূল্যস্ফিতিই ৯% এর উপরে। অর্থাৎ সরকার ও বিবিএস এর মূল্যস্ফীতির (৪,৫% থেকে ৫%) হিসাব মিথ্যা। 

সরকারের অর্থাৎ পরিসংখ্যান ব্যুরো মূল্যস্ফীতি বের করার প্রক্রিয়াটা ভয়াবহ জালিয়াতিতে ভরা।

চালের দাম তিন মাসে কেজি প্রতি ১২ থেকে ১৫ টাকা করে বাড়লে, ভোজ্যতেলের দাম লিটার প্রতি ৩০-৪০ টাকা বাড়লে, এলপি গ্যাসের দাম সিলিন্ডার প্রতি ১৫০-২০০ টাকা বাড়লে, ঠিক কিভাবে খাদ্য ইনফ্লাশন ৫% এর মধ্যে থাকে? 

বাজার দরের যে অবস্থা, অবশ্যই মূল্যস্ফীতি দুই অংকের ঘরে অবস্থান করছে। এখানে দুটা বিষয়। প্রথমত সরকারের মূল্যস্ফীতি নির্ণয়ের কারিগরি পদ্ধতি ভুল। দ্বিতীয় হচ্ছে, সেকেলে যে পদ্ধতিতে মূল্যস্ফীতি নির্ণয় করা হয় তাতে পর্যাপ্ত স্যাম্পল ও পণ্য কোনটাই থাকে না।

মূল্যস্ফীতি পরিমাপের নতুন পুরানো বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। পুরানো-ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) পদ্ধতি থেকে নতুন এভরিডে প্রাইস ইনডেক্স বা ইপিআই পদ্ধতিতে যেতে হবে। এতে গেলে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি দ্বিগুণের বেশি দেখাবে, যা প্রকৃত বাস্তবতা।

আমি মনে করি পুরানো হলেও খোদ সিপিআই ভিত্তিক হিসাবেই বড় জালিয়াতি করে সরকার ও বিবিএস। পুরানো মূল্যস্ফীতি পরিমাপের বাস্কেটেও অনেক পণ্যই সংযুক্ত করা হয়নি। ভ্যাট নীতিমালায় দেখাবেন প্রায় এগারশত পণ্যকে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। অথচ এরা সুবিধামত মাত্র কয়েকটা পণ্য দিয়ে সুবিধাজনক সময়ের আগে পরে (যখন দাম কিছুটা সহনীয় থাকে) শহরের আড়তের কাছাকাছি স্থানের কম দামের জায়গায় গিয়ে কয়েকটা মাত্র স্যাম্পল নিয়ে মূল্যস্ফীতি হিসাব করে ফেলে। অথচ একই পণ্যের খুচরা মূল্য পাড়া গ্রামে কিংবা মফস্বল অঞ্চলে বেশি। এরা এমনভাবে সার্ভে করে যাতে মূল্যস্ফীতি ৫% এর আশেপাশে দেখায় (সিলেকসান বায়াস)। এগুলা ডেটা ম্যানিপুলেটেড। যেখানে ডেটা বাড়িয়ে দেখালে সূচক ভালো দেখায় (জিডিপি, বাজেট, মাথাপিছু আয়) সেখানে এক্সেলে ইনপুট বাড়ায়ে দেখানো হয়। আর যেখানে ডেটা কমিয়ে দেখালে সূচক ভালো হয় (জনসংখ্যা, মূল্যস্ফীতি ইত্যাদি) সেখানে তথ্য চুরি করে সূচক জালিয়াতি করা হয়।

এখন আসেন, মূল জালিয়াতিটা কোথায়? মূল জালিয়াতিটা জিডিপির হিসাবে।

নমিনাল জিডিপি থেকে মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে রিয়েল জিডিপি বের করা হয়। মুলত রিয়েল জিডিপি উপর দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক সূচক ক্যালকুলেশান করা হয়। আপনি যদি দেখেন, ক্যাবের হিসাবে খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভুত উভয় মূল্যস্ফীতিই এক থেকে দুই শতাংশ বেশি থাকে। কিন্তু অতীতে ক্যাবের সাথে সারকারের মূল্যস্ফীতি হিসাবের কখনো ৩% আবার কখনও বা ৭% পার্থক্য ছিল (২০১১ থেকে ২০১৪)। এখন আমরা যদি এক দশকের গড় বের করি তাইলে দেখবেন এই দশকে গড়ে ২,৫ থেকে ৩% মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেখানো আছে। এর মানে হচ্ছে এই দশকে গড়ে জিডিপিও ২,৫ থেকে ৩% বাড়িয়ে দেখানো।

এসব জালিয়াতি নিয়ে দেশের সিনিয়র অর্থনীতিবিদরা কথা বলেন না কেন? উনাদের সমস্যা কোথায়? দুর্বৃত্ত সিস্টেম বুঝায়? নাকি সরকারের হয়রানির ভয়?

এটা বলার সময় হয়ে গেছে যে রেমিটেন্সে দেয়া ২% প্রণোদনা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে সাহায্য করছে। প্রনোদনা ১% এ নামিয়ে আনা উচিৎ। আমি আগে বলেছি, হুন্ডিদের বা পাচার কারীদের কারেন্সি কনভার্শন লস যা হয় তার কাছাকাছি থাকতে পারে প্রণোদনা। মূলত রেমিটেন্স আগমন হুন্ডির মত রিয়েল টাইম করতে পারাটাই মূল কাজ। বাংলাদেশের ব্যাংক গুলোর হাই কোর্ট দেখানোও হুন্ডির অন্যতম কারণ, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সচল হয়ে পড়ায় হুন্ডি চক্রও সচল হয়ে রেমিটেন্স কমে যেতে শুরু করেছে। রেমিটেন্সে দেয়া প্রণোদনা কত শতাংশ হবে এই বিষয়টা গবেষণার বিষয় হয়ে গেছে।

করোনার পরে ক্যাপিটাল মেশিনারির দাম বাড়তে কিছু বেড়েছে। সে হিসাবে নতুন উৎপাদিত খাদ্য বহির্ভুত পণ্যের দাম কিছু বাড়বে। কিন্তু তাতে সংগতি থাকা চাই। আমদানিহীন দেশীয় পণ্যে আন্তর্জাতিক হারের দ্বিগুণ হারে দাম বাড়ার যুক্তি কি?

সরকারের মনিটারি পলিসি অর্থাৎ বাজারে সস্তায় মুদ্রা সরবারহের নীতি এবং করোনা প্রণোদনা প্যাকেজের নামে নতুন টাকা ছাপানোর অভিযোগ মূল্যস্ফীতির লাগামহীনতার মাধ্যমে প্রমাণিত।

যেহেতু প্রণোদনা প্যাকেজ বিনিয়োগে আসেনি, বরং কম সুদের নতুন ঋণের মাধ্যমে উচ্চ সুদের পুরানো ঋণের অদলবদল হয়েছে (তারল্য বেড়েছে)। নতুন ঋণের একটা অংশও পাচারে পড়েছে তাই ঋণের মাধ্যমে নতুন সম্পদ তৈরি হয়নি। ফলে নিশ্চিত ভাবেই এটা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে।

  • লেখক নেদারল্যান্ডসের ভোডাফোনে কর্মরত প্রকৌশলী এবং টেকসই উন্নয়নবিষয়ক বিশেষজ্ঞ। 

No comments:

Post a Comment