Search

Tuesday, September 3, 2019

এফআইআর সংবিধান লঙ্ঘন করতে পারে না


মইনুল হোসেন

মইনুল হোসেন
আগাম জামিন প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাম্প্রতিক এক রায়ে প্রদত্ত নতুন গাইডলাইনগুলো আগের অনমনীয় অবস্থানের সাথে তুলনায় অনেক নমনীয়। গ্রেফতারজনিত হয়রানি এবং জামিন প্রত্যাখ্যানজাত পারিবারিক দুর্ভোগ লাঘবে এই গাইডলাইনগুলো অনেকটাই মানবিক বিবেচনাপ্রসূত। এ ধরনের গাইডলাইনকে অবশ্যই স্বাগত জানাতে হয়।

কিন্তু মৌলিক অধিকারের গুরুত্ব বিবেচনায় রাখলে নিছক এফআইআর-এ আনীত অভিযোগ বাস্তবতার নিরিখে প্রদত্ত দিকনির্দেশনা আরো নমনীয় হওয়া প্রয়োজন। এফআইআর-এ আসামি করা হলেই ব্যক্তিকে আইনত অপরাধী কিংবা ফেরারি বলে বিবেচনা করা অন্যায়। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণকারীকে আইনের প্রতি অনুগত বলে গণ্য করাই বাঞ্ছনীয়। চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিলের আগে কোনো লোককে ‘অপরাধী’ বলা যায় না, বরং তাকে আইনের দৃষ্টিতে নির্দোষ বলে ধরে নিতে হবে। জামিনকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগে দুর্নীতি অনুপ্রবেশের মাধ্যমে মামলার রাজনীতি সহজ হয়েছে। সংবিধান ও আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কিভাবে নিঃশেষ করে দেয়, সেসব বিষয় বিচারপতিদের জানা।

জামিন না পেলে পরিবারের দুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়; বিশেষ করে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি হন। চাকরি হারানো ছাড়া পারিবারিকভাবে অন্যদের জন্য কত ধরনের সমস্যা ও দুর্ভোগ সৃষ্টি হতে পারে, তা আমাদের দেশে অবশ্যই বিবেচনায় রাখার কথা। এসব মানবিক ও সামাজিক বিষয়গুলো বিবেচনায় না থাকা আমাদের বিচারব্যবস্থায় স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবে চলে আসছে।

গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি অপরাধী এবং তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে, এরূপ চিন্তাধারা বিচারকদের অনেকের মধ্যে কাজ করে বলে মনে হয়। বিষয়টির গভীরে যাওয়ার কথা ভাবা হয় না। তা না হলে তাকে আদালতে হাজির করার সাথে সাথেই জামিন না দিয়ে জেলে পাঠানো হতো না। তারপর পুলিশ রিমান্ডে দেয়াও এত সহজ ব্যাপার হতো না। আমাদের দেশে মিথ্যা এফআইআর দেয়া যে কত সহজ, তা ভুলে যাওয়া হয়।

পুলিশকে সহায়তার নামে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির সংবিধানপ্রদত্ত স্বাধীনতা খর্ব করা যায় না। কিন্তু বাস্তবে সেটাই ঘটছে। আমাদের বিচারব্যবস্থায় নির্দোষ ব্যক্তিরা অধিকতর অসহায়। তারা সাধারণ ও সহজ প্রকৃতির এবং যারা সহজ পথকে সঠিক মনে করে, তাদের মধ্যে নীতিবোধ একটু বেশি থাকে। ‘আমি কোনো অপরাধ করিনি, আমার কোনো ভয় নেই’ বলা বাংলাদেশের বাস্তবতায় মোটেও সত্য নয়। আমাদের বিচারব্যবস্থায় পুলিশকে অধিক পরিমাণে বিশ্বাস করা হয়। একবার পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করলেই তাকে তার সব আত্মবিশ্বাস হারাতে হয়। তিনি সম্পূর্ণ অসহায়।

পুলিশনির্ভর রাজনীতির কারণে বর্তমানে পুলিশ সবচেয়ে ক্ষমতাশালী। আর পুলিশের শক্তিবলেই সরকারও সর্বময় ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছে। জনসমর্থনের শক্তির প্রয়োজন হয় না। 

চার্জশিট বা অভিযোগপত্রের আগে কারাগারে রেখে শাস্তি দেয়া পুলিশের বিচার। কারণ, বিচারিক প্রক্রিয়ায় কারাজীবন শুরু হয় বিচারে দোষী প্রমাণিত হলে।

এর আগে আপিল বিভাগের এক রায়ে আগাম জামিন সম্পর্কে কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করা হয়েছে। রায়ে উপলব্ধি করতে চাওয়া হয়নি যে, এফআইআরের ভিত্তিতে আগাম জামিন প্রত্যাশীকে কোনোভাবেই অপরাধী হিসেবে দেখা যাবে না। তাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে এবং রাষ্ট্রপক্ষকে তার অপরাধ প্রমাণ করতে হবে। অর্থাৎ বিচারের জন্য তাকে ‘নিরপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
অপর একটি রায়ে তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বলেন, কারো বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করলেই তিনি একজন পলাতক আসামি। যদিও তার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, তার মতে, কথিত ব্যক্তি একজন ‘ফিউজিটিভ’। তিনি আরো বলেন, একজন পলাতক আসামি যদি হাইকোর্ট বিভাগে আত্মসমর্পণ করে, তবে তাকে হয় জামিন দিতে হবে অথবা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। সংক্ষেপে বলা যায়, মাননীয় বিচারপতি এভাবে আগাম জামিনের ধারণাকে নাকচ করে দিলেন।

পূর্বোক্ত রায়ে বলা হয়েছে, হাইকোর্টের বিচারপতিদের সতর্কতার সাথে এফআইআরের গভীরে না গিয়ে অযৌক্তিকভাবে নিজ বিবেচনা প্রয়োগ করার সুযোগ নেই। তাদের আরো স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়, পুলিশের তদন্ত কাজে যেন বাধা সৃষ্টি না হয়।

অন্য কথায় এফআইআরে একজন লোক সম্পর্কে আনীত অভিযোগের ব্যাপারে পুলিশের তদন্তে কোনো প্রমাণযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে কি যাবে না, জামিন প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে তা কোনো প্রভাব ফেলবে না। কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে অপর কোনো ব্যক্তিবিশেষ অভিযোগ আনলেই তাকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখতে হবে কেন? উভয়েই এ দেশের নাগরিক। যিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন, তাকে বিশ্বাস করা হবে না কেন? মামলা দিয়ে কাউকে অপমান করা আমাদের দেশে খুবই সহজ।

সংবিধানস্বীকৃত ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং বিচারে দোষী প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আসামি যে নির্দোষ, এই সার্বজনীন ধারণা আগেকার দু-দু’টি রায়ে মোটেই আমলে নেয়া হয়নি। পুলিশ রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে নয়, তারপরও পুলিশের শক্তিকে সর্বাধিক গুরুত্ব ও সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি একেবারেই অমানুষ ও অসহায়। অভিযোগ করা হয়েছে, তাই জেলে বন্দী জীবন তার ভোগ করতেই হবে।

পুলিশের তদন্তকার্যে সহায়তার নামে নির্দোষ আসামির কারাবরণ কোনোভাবেই সংবিধানে স্বীকৃত ব্যক্তিস্বাধীনতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ ধরনের চিন্তা অবশ্যই বিচারকসুলভ নয়। এটাও চিন্তা করা প্রয়োজন যে, একবার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়ে গেলে হাইকোর্ট তখন আগাম জামিনের বিষয় বিবেচনা করতে চান না। সুতরাং আগাম জামিন না দিলেও আসামিকে পুলিশের হাতে হস্তান্তর করা জরুরি নয়।

আদালতগুলো ভুয়া ও রাজনৈতিক মামলায় ভরপুর হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, এফআইআরে অভিযোগ করলেই জামিন প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা।

আপিল বিভাগের সর্বশেষ রায়ে আপিল বিভাগের বিচারপতিরা একত্রে আগাম জামিন তথা জামিনের ব্যাপারে অনেক মানবিক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তাদের প্রদত্ত এক গাইডলাইনে তারা বলেন, গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে আবেদনকারীকে হয়রানি ও অপমান করার জন্য অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে কি না, দেখতে হবে। কারণ, গ্রেফতারের সাথে জড়িত থাকে পারিবারিক দুঃখ-বেদনা ও অপমান। গ্রেফতারের পরিণতি শুধু আসামিই ভোগ করে না, পরিবার- এমনকি একইভাবে সম্প্রদায়কেও ভোগ করতে হয়।

আরেক গাইডলাইনে বিচারপতিগণ বলেন, আগাম জামিনের মেয়াদ আট সপ্তাহের বেশি হওয়া উচিত নয় এবং চার্জশিট পেশ করার পর আগাম জামিন অব্যাহত থাকা উচিত নয়।

চার্জশিট পেশ করার আগে তিনি অভিযুক্তই (accused) নন; অভিযোগপত্র পেশের আগে জামিন পাওয়ার প্রশ্নটিকে তার মৌলিক ও আইনগত অধিকারের অংশ হিসেবে দেখাই সুবিচার। গাইডলাইনগুলোতে এ ধরনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। স্বাধীন দেশে শাসনতন্ত্র বা সংবিধান আমাদের মৌলিক অধিকার ভোগ করার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কোর্টের বিচারে শাস্তি হলে অবশ্যই শাস্তি ভোগ করতে হবে। কিন্তু বিচার ছাড়াই জেল খাটা আইন হতে পারে না যদি না দেখা যায় যে, ব্যক্তিটির অতীত কর্মকাণ্ড ভয়াবহ এবং সমাজের নিরাপত্তার জন্য তাকে জেলে রাখা জরুরি।

রাজনীতি যে, পুলিশের মামলার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তা তো সবারই জানা। পুলিশকে কিভাবে ক্ষমতাসীনদের রাজনীতির অঙ্গসংগঠন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাও অজানা কিছু নয়। পুলিশকে জনগণের আস্থা হারাতে হচ্ছে। বিচার বিভাগ ব্যক্তির মৌলিক এবং মানবিক অধিকার রক্ষায় কঠোর হলে পুলিশ রক্ষা পাবে, পুলিশি মামলার রাজনীতি থেকে আদালত চাপমুক্ত হবেন।

এফআইআর-কে গভীরে গিয়ে দেখা এমন কোনো বড় বিষয় নয়। এফআইআরের মাধ্যমে একজনকে মিথ্যাভাবে গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত করে হয়রানি, অপমান এমনকি জেলে আটক রাখা খুবই সহজ। শুধু একটি এফআইআরের তথ্যানুযায়ী, একজনের সাংবিধানিক অধিকার এত সহজে ক্ষুণ্ণ করা যেতে পারে না। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও তার মৌলিক অধিকার রক্ষা করাই আদালতের দায়িত্ব।

অত্যন্ত জোরের সাথে আমরা বারবার মত প্রকাশ করেছি যে, বিচার বিভাগকে রাজনীতিকদের বলয় থেকে অবশ্যই বাঁচানো দরকার। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শত শত রাজনৈতিক মামলা এবং তাদেরকে জেলে পুরে রাখার বাস্তবতা অস্বীকার করলে বিচারব্যবস্থাই একসময় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। তখন দেশে চলবে বিচারবিহীন হিংসাবিদ্বেষের ক্ষমতা দখলের নৈরাজ্য।

এফআইআরের ভিকটিমদের জামিন আদেশ দিয়ে বিচারের জন্য পুলিশকে সাক্ষী-প্রমাণ হাজির করার নির্দেশ প্রদান করলে আদালতে হয়রানিমূলক ও মিথ্যা রাজনৈতিক মামলার বোঝা হ্রাস পাবে। জামিন আদেশ না দেয়ার জন্য আদালতের ওপর সরকারের পক্ষ থেকে খোলাখুলি চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমার নিজেরও সে অভিজ্ঞতা রয়েছে। জামিনযোগ্য মানহানির মামলায় নিম্ন আদালাতের অসহায় অবস্থা দেখে আমার অনেক কষ্ট লেগেছে।

ভুয়া মামলা দায়ের করার জন্য পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ প্রশস্ত করা যাবে না। তখন সরকার আদালতের বাহানা দিয়ে বলে, ‘আদালত জামিন না দিলে সরকারের কী করার আছে? এটাই তো আইনের শাসন।’

অন্যদের রাজনৈতিক ফায়দা লোটার সুযোগ দিয়ে বিচার বিভাগ এভাবে নিজের ধ্বংস নিজে অনিবার্য করতে পারে না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আদালতকে ব্যবহার করার গণবিরোধী প্রবণতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। একমাত্র সুপ্রিম কোর্টই সংবিধানের অভিভাবক ও রক্ষক হিসেবে মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে পারেন। রাজনীতি যে পুলিশিব্যবস্থা নয়, তা প্রতিষ্ঠা করতে সুপ্রিম কোর্টকে সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে। বিচারব্যবস্থার শক্তি যে জনগণ এবং জনগণের প্রদত্ত শাসনতন্ত্র তা স্মরণে না রাখলে বিচারব্যবস্থা টিকে থাকবে না।

সরকার যখন কাউকে ‘আইনের আওতায়’ আনার কথা বলে; তার অর্থ হলো তাকে পুুলিশের হাতে তুলে দেয়া।

সংবিধানের রূপ-চরিত্র যতটুকুই থাকুক না কেন, সংবিধান নামে গণতান্ত্রিক একটি দলিলের অস্তিত্ব যত দিন আছে তত দিন আমাদের অর্থাৎ, বিচারক ও আইনজীবীদের বিচারব্যবস্থা রক্ষায় নিবেদিত থাকতে হবে। আইন ও আদালতকে ব্যবহার করে রাজনীতি করতে দেয়া যাবে না। রাজনীতি রাজনীতির পথে চলবে। বিচারক ও আইনজীবীদের নেতৃত্ব থাকবে বিচারব্যবস্থায়। মৌলিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার জন্য সবাইকে সক্রিয় থাকতে হবে, যাতে নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও রক্তাক্ত সঙ্ঘাতের দ্বারপ্রান্ত থেকে দেশকে ফিরিয়ে আনা যায়।

—  লেখক প্রবীণ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। 

সূত্র —  নয়াদিগন্ত/আগস্ট ২৫, ২০১৯ 
লিঙ্ক —   http://bit.ly/2lBq5d2 

No comments:

Post a Comment