Search

Sunday, December 22, 2019

যে কারণে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত বিদেশি বিনিয়োগ পাচ্ছে না

আবু আহমেদ

আবু আহমেদ

বাংলাদেশ অর্থনীতিতে এখনো সুবাতাস বইছে। তবে এই সুবাতাস ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, অনেকেই এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছে। একটানা এক দশক বা আরো বেশি সময় ধরে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে কয়েকটা উপাদানের উপস্থিতি প্রয়োজন হয়। এক. অব্যাহত বেশি বিনিয়োগ, বিশেষ করে ব্যক্তি খাত ও বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমে। দুই. অব্যাহতভাবে রপ্তানি আয় বাড়তে হবে। তিন. স্থানীয় মুদ্রা ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা থাকতে হবে। চার. ব্যাবসায়িক পুঁজি সরবরাহের জন্য পুঁজিবাজারের সমর্থন থাকতে হবে। সেই সঙ্গে ঋণের জন্য বন্ড বা অন্য ধরনের ঋণপত্রের বাজার সচল থাকতে হবে। পাঁচ. অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিম্ন পর্যায়ে থাকতে হবে। ছয়. সর্বোপরি অর্থনীতিতে একটি আশাবাদের জন্ম হতে হবে এবং তা অব্যাহত থাকতে হবে। 

লোকজনকে বিশ্বাস করতে হবে যে তাদের অর্থনীতি বাড়বে এবং এই অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও ঝুঁকি নেওয়া যায়। তখন বিদেশিরাও এই একই ভাবনায় ভাবতে থাকবে যে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে সহজে ব্যবসা করা যাবে এবং ওই ব্যবসায় লাভ হবে। অন্য আরেকটা সত্য হলো আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং এজেন্সি যেমন বিশ্বব্যাংক, এডিবি ইত্যাদির মতো সংস্থা থেকে ঋণ করে কোনো অর্থনীতিই ওপরে উঠতে পারেনি। এসব সংস্থা ছোট প্রকল্পে অর্থায়ন করে। বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করার জন্য এদের বাজেট নেই। বাংলাদেশ যে ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যর্থ হয়েছে সেটা হলো নিজ উদ্যোগে এই দেশ কোনো মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের সঙ্গে সদস্য হিসেবে যোগ দিতে পারেনি। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে সুবিধাটা বাংলাদেশ পেয়ে আসছে সেগুলো WTO (World Trade Organization) ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমেই পেয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ কোনো বাড়তি সুবিধা অন্য কোনো অর্থনীতি থেকেই পায়নি।

বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে ভালো করছে বলে অন্যত্র অতি প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কারগুলোকে শিকায় তুলে রেখেছে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ জেনেশুনে ভর্তুকি দিয়ে এমন কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আজও চালিয়ে যাচ্ছে যেগুলো স্বাভাবিক বাজার অর্থনীতি নিরিখে এত দিনে বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে কলকারখানা চালানোর অর্থ হলো অর্থের অব্যবহার করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ অলস বসিয়ে রাখা। রাষ্ট্রের অধীনে এখনো হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ আছে, যেগুলো থেকে কোনো আয় প্রবাহ নেই। উল্টো ওইগুলো ব্যক্তি খাত যে ট্যাক্স দিচ্ছে সেই ট্যাক্সের অর্থ হজম করছে। তবে এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সরকারের বিষয়টি অনুভব করবে যখন বাংলাদেশ অর্থনীতি নিম্নমুখী প্রবণতার দিকে গতি নেবে। তখন নীতিনির্ধারকরা ভাবতে থাকবেন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য আর কোথায় কী করা যায়। অর্থাৎ সম্পদ বসিয়ে ভর্তুকি দিয়ে রাষ্ট্রীয় কলকারখানা চালানোর নীতি অন্য অনেক দেশ অনেক আগেই বন্ধ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি সামনের দিনগুলোতে পুঁজি সরবরাহের ঘাটতিতে ভুগবে। কারণ হলো এই দেশ চলনসই এবং বর্ধিত একটা পুঁজিবাজার গঠন করতে কখনোই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এ দেশে যেসব কম্পানি বড় বড় ব্যবসা করছে তার বেশির ভাগই আজও পুঁজিবাজারের বাইরে। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন অন্য অনেক দেশে অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেলেও বাংলাদেশ সেই অর্থায়ন বরং বাড়িয়েছে। ফল হলো ব্যবসাগুলো পুঁজিবাজারমুখী হতে নারাজ এবং সেই একটি কারণে এইখানে কোনো বন্ড (Bond) বা নতুন প্রডাক্টের বাজারও গড়ে ওঠেনি। জনগণের সঞ্চয়কে হয় সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য অথবা জায়গা-ফ্ল্যাট ইত্যাদি কেনার দিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ঝুঁকিবিহীন ব্যবসা থেকে যে অতিরিক্ত লাভ আসছে তার একটা অংশ আবার বিদেশে পাচার হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ চায়, তবে বিদেশি বিনিয়োগের সমস্যা কোথায় হচ্ছে তা বুঝতে নারাজ। বিদেশিরা কখন একটা অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করে। যখন তারা দেখে যে ব্যবসা করতে কোনো বাড়তি ঝামেলা নেই। যখন তারা দেখে যে প্রয়োজনে তারা ব্যবসা বন্ধ করে পুঁজি অন্যত্র সরাতে পারবে। যখন তারা দেখে শুধু স্বচ্ছভাবে ব্যবসা করতে গেলে তাদের বাড়তি কোনো ট্যাক্স বা চাঁদা দিতে হবে না। বিদেশিরা একটা প্রত্যাবর্তন পথ (exit route) চায়। বাংলাদেশে এখন বিদেশিরা তিনভাবে বিনিয়োগ করতে পারে—এক. শতভাগ নিজ মালিকানার, দুই. অন্য কোনো স্থানীয় অংশীদারের সঙ্গে, তিন. শেয়ার বা পুঁজিবাজারের মাধ্যমে। শতভাগ নিজের মালিকানায় ব্যবসা করতে গেলে ঝুঁকির অভাব হতে পারে। ফলে ওই ব্যবসা ছোট হতে থাকবে। ছোট ব্যবসা থেকে লাভ কম হয়। দেশীয় কোনো উদ্যোক্তার সঙ্গে যৌথ মালিকানায় ব্যবসা করতে গেলে স্থানীয় পার্টনারের ওপর বিশ্বাসের ঘাটতি অনুভব করে। তাদের জন্য সবচেয়ে সুবিধা শেয়ারবাজারের মাধ্যমে বিনিয়োগ করা। কারণ হলো শেয়ারবাজারের মাধ্যমে বিনিয়োগ করলে তারা যেকোনো সময় পুঁজি প্রত্যাহার করে নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অতি সহজ নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু সমস্যা হলো শেয়ারবাজারে ভালো কম্পানির অভাব। তারা যে মানের কম্পানির শেয়ার কিনতে চায় সেই মানের কম্পানির সংখ্যা ঢাকার শেয়ারবাজারে অতি অল্পসংখ্যক। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা আজতক বুঝলেন না যে অর্থনীতিতে ৮ শতাংশ বা তার অধিক প্রবৃদ্ধি অর্জনকে ধরে রাখতে হলে শেয়ারবাজারের একটা সমর্থন লাগবে। ভারতের অর্থনীতি খারাপ করছে, কিন্তু ওদের শেয়ারবাজার এখন তুঙ্গে। এর কারণ হলো ভারতীয় শেয়ারবাজারে এমন অনেক কম্পানি আছে, যেগুলোর ছোট সংস্করণও বাংলাদেশ শেয়ারবাজারে নেই। ওদের ওখানে বাজার মূলধনের বিচারে হিন্দুস্তান লিভার (Hindustan Lever) হলো চতুর্থ নম্বরের কম্পানি। আমাদের এখানে বাংলাদেশ Unilever তালিকাভুক্ত আছে কি? করাচির স্টক মার্কেটও এখন চাঙ্গা। মূল কারণ হলো বিদেশিদের বিনিয়োগ। সেই মার্কেটে যেসব কম্পানির শেয়ার কেনার জন্য বিদেশিরা আগ্রহ দেখাচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম হলো নেসেল (Nestle) পাকিস্তান। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বাংলাদেশ নেসেল তালিকাভুক্ত আছে কি?

আসলে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা অন্যদের থেকে কোনো কিছু শিখতে চান না। অন্যরা কী করছে তা জানতে তাঁরা নারাজ। এই তো সেদিন সংবাদমাধ্যমে খবর বের হয়েছে থাইল্যান্ড স্টক এক্সচেঞ্জ (SET) তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ভালো কম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করে যেন আত্মতুষ্টিতে ভুগছি। তবে সত্য হলো আমাদের মতো আরো অনেক অর্থনীতি এ ধরনের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল অনেক আগেই গঠন করেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যদিক হলো, যেসব বিদেশি কম্পানি তালিকাভুক্ত হয়ে বেচা-কেনা-আয়-রোজগারকে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করে তাদের বলা হয় তোমরা আরো বেশি ট্যাক্স দাও। আর যেসব কম্পানি ব্যালান্সশিট তৈরি করে মিথ্যা পরিসংখ্যান দিয়ে, তাদের থেকে ট্যাক্স আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো তৎপরতা লক্ষ করা যায় না। বিদেশিরা আমাদের ব্যাপারে অনেক কিছুই দেখে। তারা আমাদের অর্থনীতিতে কী হচ্ছে, কী হতে পারে এ ব্যাপারে খবর নেয়। তবে তারা মুখ ফুটে কিছু বলে না। তাদের সুবিধা হলো তারা তাদের অর্থ মুক্তভাবে বিশ্বব্যাপী ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু তারা বাংলাদেশ অর্থনীতিতে সমস্যা দেখলে সম্ভাব্য পুঁজি অন্য অর্থনীতিতে ব্যবহার করবে। বাংলাদেশ তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে অত গুরুত্বপূর্ণ নয়। একেক সময়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা এমন অবস্থান গ্রহণ করেন যা বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক ধারণা প্রচার করে। এই যে গ্রামীণফোন (GP) এবং টেলিফোন রেগুলেটরি সংস্থার (BTRC) মধ্যে পাওনা নিয়ে যে বিরোধ চলছে, তা বিদেশি বিনিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই পাওনাসংক্রান্ত বিরোধটা হলো ১৯৯৭-২০১৬ সালের পাওনা নিয়ে। ইঞজঈ বলছে, তারা গ্রামীণফোনের কাছে এত হাজার কোটি টাকা পাবে। আর GP বলছে, এত টাকা নয়, আরো অনেক কম পাবে। তাহলে এই বিরোধের একটা নিরপেক্ষ মীমাংসা হতে পারত একটা নিরপেক্ষ অডিট রিপোর্ট কমিশন করার মাধ্যমে। কিন্তু রেগুলেটরি সংস্থা সেই যুক্তি মানতে রারাজ। উচ্চ মহল থেকে এই বিরোধ মীমাংসার জন্য কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিরোধের মীমাংসা হয়নি। হয়নি কেন তা আমাদের পক্ষে বুঝে আসেনি। GP ও BTRC-র বিরোধের কারণে শেয়ারবাজারে এই কম্পানির শেয়ার মূল্য ৫০০ থেকে পড়ে এখন ৩০০ টাকায় ঠেকেচ্ছে। এই যে GP-র শেয়ার মূল্যের এই পতন, এতে হারছে কারা? হারছে এ দেশের ৪০ হাজার খুদে শেয়ার বিনিয়োগকারী এবং হারছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ICB (Investment  Corporation of Bangladesh) এবং সাধারণ বীমা (সেটাও সরকারি সংস্থা)। তাদের বিনিয়োগ হিসাবগুলোতে লাখ লাখ GP-র শেয়ার কিনে রেখেছে। আজকে তাদের ক্ষতির পরিমাণ কত তা কি সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কেউ খবর নিয়েছে? যে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা BTRC পাবে বলছে তার থেকে অনেক বেশি অর্থ সরকারি সংস্থা দুটো এবং এই দেশের শেয়ারবাজারের হাজার হাজার ব্যক্তি বিনিয়োগকারী ইতিমধ্যে হারিয়েছে। আমরা ব্যবহার করছি ওই ব্যক্তির মতো যে পেনি নিয়ে চিন্তিত; কিন্তু পাউন্ড নিয়ে কোনো খবর নেই। একেই কি বলে Penny wise pound foolish! যাক, বিদেশি বিনিয়োগ লাভ করতে হলে শুধু কথা দিয়ে অনুরোধ করে বাংলাদেশ ওই বিনিয়োগ আনতে পারবে না। বিদেশিরা দেখে এর মধ্যে যারা বাংলাদেশে ব্যবসা করছে তাদের অবস্থা কেমন। বাংলাদেশ যদি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য এতই উপযুক্ত স্থান হবে, তাহলে এই অর্থনীতি থেকে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে কেন ঝেক (GlaxoSmit hKline) এবং সানোফি অ্যাভেনটিসের ((Sanofi-Aventis) মতো বিশ্ববিখ্যাত দুটি ওষুধ কম্পানির ব্যবসা বন্ধ করে দিল? এদের প্রস্থানের কারণ আমাদেরই খুঁজতে হবে।

  • লেখক  —  অর্থনীতির অধ্যাপক
  • কার্টসি  —  কালের কণ্ঠ / ডিসেম্বর ২২ , ২০১৯

No comments:

Post a Comment