Search

Monday, July 16, 2018

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর আবার ছাত্রলীগের হামলা

  • শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা চালায় 
  • হামলার দায় অস্বীকার করেছে ছাত্রলীগ 
  • শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি প্রক্টরের


সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, মামলা ও নির্যাতনের প্রতিবাদে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে আবারও হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। আজ রোববার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নাজেহাল হন।

ছাত্রলীগ হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ছাত্রলীগের বিদায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বলেছেন, তাঁরা শিক্ষক ও মুরুব্বিদের সম্মান করেন। তবে ‘মীমাংসিত বিষয়’ নিয়ে কেউ যেন ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা করতে না পারে, সে জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ আছে।



অন্যদিকে শিক্ষকদের ওপর হামলাকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেছেন, তদন্ত হবে। তদন্তে শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা বহিরাগত যার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনার শুরু বেলা সাড়ে ১১টার দিকে। ছয়-সাত শ শিক্ষার্থীসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে এসে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিপীড়িত শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানার নিয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ২০ গজ দূরত্বে উল্টো পাশে এসে দাঁড়ান এবং মাইকে চিৎকার করতে থাকেন। তাঁরা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবি করতে থাকেন এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জামায়াত-শিবির বলে গালিগালাজ করতে থাকেন। কখনো আবার বামপন্থী রাজনীতি করার জন্যও গালি দেন। শিক্ষকদের বক্তব্যের মাঝখানে তাঁরা স্লোগান দেন, ‘পাকিস্তানের প্রেতাত্মা পাকিস্তানে চলে যা’।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জন্ম নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজিম উদ্দীন খানকে উদ্দেশ করে ছাত্রলীগের এক কর্মী বলেন, ‘এই শিক্ষকের তো চুল পেকে গেছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি।’ তাঁরা বলেন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনারের পবিত্রতা নষ্ট করছেন।

একপর্যায়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের মোর্চা বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানের মা সালেহা বেগম বক্তব্য দিতে শুরু করেন। তিনি কথা বলতে শুরু করামাত্রই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘এই মহিলা জামায়াত-শিবিরের এজেন্ট।’

ছাত্রলীগের হট্টগোল উপেক্ষা করেও শিক্ষকেরা বক্তব্য দেন। তাঁরা নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। বাধার মুখে একপর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জমায়েত জাতীয় সংগীত গেয়ে অবস্থানের ঘোষণা দেয়। জাতীয় সংগীত শেষ হওয়ার পর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা শহীদ মিনারের সামনেই অবস্থান নেন। ছাত্রলীগ সেখানে গিয়ে তাঁদের ওপর চড়াও হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পরে শহীদ মিনার ছেড়ে মিছিল নিয়ে বের হন। বঙ্গবন্ধু টাওয়ারের কাছে ছাত্রলীগ তাঁদের আটকে দেয়। তাঁরা রাস্তায় অপেক্ষা করতে শুরু করেন। এমন সময় ছাত্রলীগ অতর্কিত হামলা চালায়। তারা যেখানে যাকে যেভাবে পেয়েছে সেখানেই চড়-থাপ্পড় মারতে থাকে। তাদের হামলা থেকে মেয়েরাও রেহাই পায়নি। এটিএন নিউজের সাংবাদিক ইমরান সুমনের বুম কেড়ে নেয় এসএম হলের ছাত্রলীগের নেতা সায়েম। মিছিল ছত্রভঙ্গ হওয়ার পর মোটরসাইকেল মহড়া করে শিক্ষার্থীদের খুঁজে খুঁজে পেটায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।

একপর্যায়ে শিক্ষক-ছাত্ররা শহীদ মিনারে ফিরে এলে তাঁদের বেদির কাছে যাওয়ায় বাধা দেন ছাত্রলীগের নেতারা। পরিচয় জানতে চাইলে একজন বলেন, তিনি উৎসুক জনতা। তাঁরা কেন শিক্ষক-ছাত্রদের ঢুকতে দিচ্ছেন না জানতে চাইলে একজন বলেন, ‘আমরা শিক্ষকদের খুবই সম্মান করি। আমরা তাঁদের ইজ্জত পাহারা দিচ্ছি।’

বেলা দেড়টার দিকে শিক্ষক শিক্ষার্থীরা যাঁর যাঁর গন্তব্যে ফিরতে শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক তানজীম উদ্দীন খান তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, হামলাকারীরা তাঁর পিছু নেয়। একই চিত্র দেখা গেছে মেয়েদের হলে ফেরার পথেও। ছাত্রলীগের ছেলেরা ছাত্রীদের পিছু পিছু তাদের হলে যায়। হামলা ও কটাক্ষ থেকে বাঁচতে তাঁরা দলবদ্ধ হয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক আজ যা ঘটেছে তা নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘মারধর করেনি, কিন্তু যা করেছে তা মারধরের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।’

ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায় অস্বীকার 

ছাত্র-শিক্ষকদের সমাবেশে ছাত্রলীগ যখন হামলা করছিল, তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাউকে দেখা যায়নি। পরে প্রক্টরিয়াল টিমের পক্ষ থেকে দুজন কর্মচারী হ্যান্ডমাইকে সবাইকে পথের দুই পাশ থেকে সরে যার যার গন্তব্যে চলে যেতে বলেন। শিক্ষকেরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমালোচনা করেন। 


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রুশাদ ফরিদী বলেন, ‘এখানে শিক্ষকেরা দাঁড়িয়েছেন। উল্টোপাল্টা বক্তব্য দিচ্ছে। কী বিশ্ববিদ্যালয় এটা? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোথায়? বিশ্ববিদ্যালয়কে কোন পর্যায়ে আনা হয়েছে? এটা নজিরবিহীন। এই মুহূর্তে সাধারণ ছাত্ররা জেলে আছে। তারা মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। ওরা ভাড়া করা লোকজন নিয়ে মহড়া দিতে পারে, কিন্তু আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’

উল্লেখ্য, রোববারের সমাবেশে ছাত্রলীগের সঙ্গে বেগম বদরুন্নেসা ও ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত প্রবেশে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই কলেজ বাসে করে ছাত্রীরা আসে।

সমালোচনার জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, ‘নিজস্বভাবে মূল্যায়ন করে আত্মবিশ্লেষণ করে তারপর আমাদের অভিযুক্ত করতে অনুরোধ করেছি।’ যেসব ছাত্ররা শিক্ষকদের নাজেহাল করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রক্টর বলেন, কে কী করছে দেখে ব্যবস্থা নেব। ঘটনা শিক্ষক ঘটাচ্ছে, নাকি শিক্ষার্থীরা ঘটাচ্ছে, না বহিরাগতরা ঘটাচ্ছে—সেটা তদন্তে বের হয়ে আসবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সবার জন্য প্রযোজ্য।


এদিকে ছাত্রলীগের বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বলেন, ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সব সময় মুরুব্বিদের, শিক্ষকদের সম্মান করি। যথোপযুক্ত সম্মান আমরা দিয়ে থাকি। শিক্ষকদের ওপর যদি এমন কিছু হয়ে থাকে, তাহলে আমরা সেটা সমর্থন করি না।’ তিনি বলেন, আমি শুনেছি সেখানে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ ও নিপীড়িত শিক্ষার্থীবৃন্দ এই দুই পক্ষের মানববন্ধন ছিল। তাদের মিছিলটি যখন একসঙ্গে হয়ে গিয়েছিল, সেখানে আমাদের ছাত্রলীগের কেউ ছিল না। 

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা কে করেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে জাকির বলেন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশেই আইন অনুষদ। এই অনুষদে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আছেন। হয়তো তাঁদের কেউ কেউ অতি উৎসাহী হয়ে দুই পক্ষের ছাত্রদের মারামারি থামাতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এখন তাঁদেরই হামলাকারী বলা হচ্ছে। তিনি রোববারের হামলাকে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের বিরোধ বলে দাবি করেছেন।

তবে ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকবে বলে জানিয়েছেন জাকির। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমিটি করে দিয়েছেন। একটি ‘মীমাংসিত বিষয়’ নিয়ে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা করতে না পারে, শান্ত পরিবেশ যেন অশান্ত করতে না পারে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সব ক্যাম্পাসে থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদের ‘ইন্ধনে’ ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন হচ্ছে, তাদের খুঁজে বের করে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানিয়েছেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক।

  • Courtesy: Prtothom Alo/ Jul 15, 2018

No comments:

Post a Comment