Search

Monday, July 30, 2018

গ্রামে উচ্চশিক্ষার প্রসারতা এখনো ২ শতাংশে সীমিত

সুমন আফসার

ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উচ্চপ্রবৃদ্ধি হচ্ছে দেশে। প্রসার বাড়ছে উচ্চশিক্ষারও। তবে শহরে যেভাবে বাড়ছে, গ্রামে সেভাবে বাড়ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, গ্রামে উচ্চশিক্ষার প্রসারতা এখনো ২ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে সীমিত। যদিও শহরাঞ্চলে এ হার ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

উচ্চশিক্ষায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে আর্থিক সক্ষমতার অভাবকেই বড় করে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ধারে-কাছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকাকেও আরেকটি কারণ বলে মনে করছেন তারা। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতায় উচ্চশিক্ষার জন্য বেসরকারি খাতের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বেশি। কিন্তু আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় গ্রামের অনেকের পক্ষেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না।

লক্ষ্মীপুরের মান্দারি ইউনিয়নের রেদওয়ান আহমেদ উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে স্নাতক সম্মানে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। থাকা-খাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চব্যয় বহন করা আর সম্ভব হয়নি। ভর্তির এক বছরের মধ্যেই শিক্ষার যতি টানতে হয় তাকে। এরপর চাষাবাদের জমি বিক্রি করে অর্থের সন্ধানে পাড়ি দিতে হয় সৌদি আরবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, মাধ্যমিকের পর অধিকাংশ শিক্ষার্থীকেই শিক্ষাগ্রহণে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করতে হয়। বেসরকারি শিক্ষা খাতের ব্যয় বহন গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের পক্ষেই সম্ভব হয় না। অভাব-অনটনে পরিবার-সন্তানের পাশে দাঁড়াতে পারে না। উল্টো পড়ালেখা বাদ দিয়ে তারা পরিবারের পাশে দাঁড়ায়। এছাড়া গ্রামে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকলেও কলেজ নেই। ধারেকাছে বিশ্ববিদ্যালয়ও নেই। তাই দূরত্ব ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে মাত্র ৪০টি। পক্ষান্তরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন ১০০-এর মতো। একইভাবে সারা দেশে ৪ হাজার ৪১৯টি কলেজের মধ্যে সরকারি মাত্র ৩২৮টি। বাকি ৪ হাজার ৯১টি কলেজই বেসরকারি।

তবে বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমাদের দেশে অধিকাংশ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ই শহরকেন্দ্রিক। আবার শহরের সঙ্গে গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে।

উচ্চশিক্ষার মতো উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্নেও শহরের তুলনায় অনেক পিছিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। বিবিএসের পরিসংখ্যান বলছে, শহরে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করছে ১১ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ। যদিও গ্রামে এ হার বেশ কম, মাত্র ৬ শতাংশ। শহর ও গ্রামের শিক্ষার এ বৈষম্য আবার নারীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি। শহুরে নারীর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের হার যেখানে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামের নারীদের মধ্যে এ হার মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ।

যদিও প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শহর-গ্রামে পার্থক্য সেভাবে নেই। গ্রামে ১৫ বছরের বেশি বয়সীদের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্নের হার ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। শহরে এ হার ২০ দশমিক ৪ শতাংশ। মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্নের হার শহর ও গ্রামে যথাক্রমে ৩৮ দশমিক ৩ ও ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

বিনামূল্যে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি উপবৃত্তি ও খাবার বিতরণের মতো কর্মসূচির সুবাদে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ এখন প্রায় শতভাগ। মাধ্যমিকেও বিনামূল্যে বইসহ বিভিন্ন প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। এ কারণে শিক্ষার এ দুই স্তরে শহর ও গ্রামের মধ্যে তেমন একটা তফাত থাকছে না।

রাশেদা কে চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রাথমিকের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই সরকারি। বিনামূল্যে বইসহ উপবৃত্তি গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোকে সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে উৎসাহিত করছে। বিনামূল্যে বইসহ প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে মাধ্যমিকেও। এসব কারণেই মূলত গ্রামের শিক্ষার্থীরাও শহরের মতো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সম্পন্ন করতে পারছে। পরে তা আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। মাধ্যমিক-পরবর্তী শিক্ষা থেকেই মূলত শহর ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এরও প্রধান কারণ অর্থনৈতিক।

আর্থিক সক্ষমতার অভাবে মাধ্যমিকের পর আর শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার চড়ানল গ্রামের কামাল হোসেনের। স্থানীয় একটি বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৪ নিয়ে মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পরও কলেজে না গিয়ে পরিবারের হাল ধরতে বিদেশ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে।

ব্যানবেইসের সর্বশেষ প্রকাশিত বাংলাদেশ এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৭ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ছিল ১৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি মাধ্যমিকে। এ ধাপে গিয়ে ঝরে পড়ছে ৩৭ দশমিক ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর উচ্চ মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হার ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

শিক্ষাবিদ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, শহরে শিক্ষার্থী উপস্থিতির বিষয়টিতে খুবই গুরুত্ব দেয়া হয়, নিয়মিত না এলে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না। গ্রামাঞ্চলের কলেজগুলোয় শিক্ষার্থী উপস্থিতির বিষয়টি ততটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হয়ে পার্টটাইম কাজ করে। আবার কেউ কেউ পরিবারকে কৃষি কিংবা ব্যবসায় সময় দিয়ে থাকে। কলেজে না যেতে যেতে একসময় তারা অনিয়মিত হয়ে পড়ে।

  • কার্টসিঃ বনিকবার্তা/ জুলাই ৩০,২০১৮ 

No comments:

Post a Comment