Search

Sunday, November 18, 2018

সরকারি খাতে কর্মসংস্থানের হার সবচেয়ে কম বাংলাদেশে

এশিয়া-প্যাসিফিকের নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে সরকারি খাতে কর্মসংস্থান সবচেয়ে কম বাংলাদেশে। বাংলাদেশে মোট কর্মসংস্থানে সরকারি খাতের অবদান মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল আউটলুক ২০১৮: অ্যাডভান্সিং ডিসেন্ট ওয়ার্ক ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনটি ১৬ নভেম্বর প্রকাশ করেছে আইএলও। এতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ৪৪ কোটি ৬০ লাখ শ্রমিক দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছেন। এছাড়া ৯৩ কোটি শ্রমিক আছেন, যারা ভালনারেবল বা ভঙ্গুর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

প্রতিবেদনে কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত বিভিন্ন তুলনামূলক বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেটের গতিপ্রকৃতিসহ বিশ্লেষিত বিষয়ের মধ্যে আছে মোট বেকারত্ব, যুব বেকারত্ব, শিক্ষার ধাপ অনুযায়ী বেকারত্ব, উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান, ভঙ্গুর কর্মসংস্থান, অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান ও কর্মঘণ্টা।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কর্মসংস্থান ও আয়ের বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। এতে দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট কর্মসংস্থানে পাবলিক সেক্টর বা সরকারি খাতের অবদান ৩ দশমিক ২ শতাংশ। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি কর্মসংস্থানের হার বাংলাদেশেই সবচেয়ে কম। অন্য দেশগুলোর মধ্যে কম্বোডিয়ায় মোট কর্মসংস্থানে সরকারি খাতের অবদান ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এ হার ইন্দোনেশিয়ায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। একই হারে কর্মসংস্থান হচ্ছে লাওসেও।

মোট কর্মসংস্থানে সরকারি খাতের অবদান মঙ্গোলিয়ায় ২২ দশমিক ৪ শতাংশ, মিয়ানমারে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ, পাকিস্তানে ১২ দশমিক ২ শতাংশ, ফিলিপাইনে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, পূর্ব তিমুরে ২২ দশমিক ৬ শতাংশ ও ভিয়েতনামে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতিবেদনটি না দেখে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তবে সাধারণ দৃষ্টিতে বলা যায়, বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের একক বৃহৎ উৎস হলো সরকারি খাত। সরকারি খাতে শিল্প-কারখানাও যেমন আছে, তেমনই সেবা খাতও আছে। সরকারি অফিসকে যত ছোট রাখা যায়— এমন একটি ধারণা এদেশে প্রচলিত আছে। এ ধারণায় দেশের সরকারি শিল্পগুলোও ক্রমান্বয়ে বেসরকারি খাতে চলে গেছে। এমনটাই সঙ্গত। সরকারি সংস্থাগুলোয় লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি আছে। দেখা যায়, মঞ্জুরিকৃত পদ বছরের পর বছর খালি পড়ে থাকে। যদিও এগুলো পূরণ করা উচিত।

নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে বেতনভোগী কর্মীর হারও তুলনামূলক কম বাংলাদেশে। আইএলওর প্রতিবেদন বলছে, বেতনভোগী কর্মীর হার বাংলাদেশে ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ। এ ধরনের কর্মীর হার কম্বোডিয়ায় ৪৪ দশমিক ৪, ইন্দোনেশিয়ায় ৪৮ দশমিক ৮, মঙ্গোলিয়ায় ৫১ দশমিক ৬, মিয়ানমারে ৪০ দশমিক ৪, পাকিস্তানে ৩৮ দশমিক ৬, ফিলিপাইনে ৬২ দশমিক ২, পূর্ব তিমুরে ৪১ দশমিক ৬ ও ভিয়েতনামে ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ।

ভালনারেবল বা ভঙ্গুর কর্মসংস্থানের হার সবচেয়ে বেশি না হলেও তুলনামূলক বেশির দলেই আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে মোট কর্মসংস্থানের ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশই ভঙ্গুর বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এ ধরনের কর্মীর হার কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মঙ্গোলিয়া, মিয়ানমার, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, পূর্ব তিমুর ও ভিয়েতনামে যথাক্রমে ৫৫ দশমিক ২, ৪৮ দশমিক ৮, ৫১ দশমিক ৬, ৪০ দশমিক ৪, ৩৮ দশমিক ৬, ৬২ দশমিক ২, ৪১ দশমিক ৬ ও ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বেতনভোগী কর্মীদের মধ্যে লিখিত চুক্তি আছে এমন কর্মসংস্থানের হার বাংলাদেশে ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ। নিম্ন-মধ্যম আয়ের অন্য দেশগুলোর মধ্যে এ সূচকে পাকিস্তানের কাছাকাছি অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানে বেতনভোগী কর্মীদের মধ্যে লিখিত চুক্তি আছে এমন কর্মসংস্থানের হার ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ। কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে এ হার যথাক্রমে ৫৩ দশমিক ২ ও ৪১ দশমিক ২ শতাংশ।

বেতনভোগী কর্মীদের স্থায়ী চুক্তি আছে এমন কর্মসংস্থানের হার বাংলাদেশে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কম্বোডিয়ায় বেতনভোগী কর্মসংস্থানের ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশের স্থায়ী চুক্তি আছে। মিয়ানমার, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামে এ হার যথাক্রমে ৪৫ দশমিক ৪, ২৯ দশমিক ৬ ও ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অবকাঠামো এবং মূলধনি পণ্যের শিল্পে সরকারি বিনিয়োগ থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক অবকাঠামোয় সরকারকে বিনিয়োগ করতে হবে। সরকারি খাতে কম বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রভাব রয়েছে। কর্মসংস্থানে যে কম দেখা যাচ্ছে তা মূলত বিনিয়োগ কম বলেই। তাই এসডিজির পথকে মসৃণ করার জন্য সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আর এটা স্বাভাবিকভাবে কর্মসংস্থানের সঙ্গেই যুক্ত।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও আইএলও এমপ্লয়মেন্ট সেক্টরের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা ড. রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, আইএলওর প্রতিবেদনটি আমি দেখিনি। তবে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদনের এ চিত্রটির যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি খাতের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যাবে, সত্তরের দশকে অনেক কিছু সরকারি খাতে নেয়া হয়েছিল। তখন সরকারি খাতেই কর্মসংস্থান বেশি ছিল। বছর বছর ধরে এর সবগুলোই আবার বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছে। যার ফলে শিল্প প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি খাতে চলে গেছে।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ভিয়েতনামে বেশকিছু শিল্প এখনো সরকারি খাতে রয়ে গেছে। পাকিস্তানে এক সময় বড় কিছু শিল্প সরকারি খাতের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল। সেগুলো এখনো সরকারি খাতে রয়ে গেছে। এভাবে আরো কিছু দেশের শিল্প সরকারি খাতে রয়ে গেছে। ভারতেও কয়লা ও ইস্পাতের মতো বড় শিল্প এখনো সরকারি খাতেই আছে। অথচ বাংলাদেশে কাগজ, সার, পাটসহ প্রায় সব শিল্পই বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছিল। ফলে এগুলো কিছুই আর সরকারি খাতে নেই। পোশাক খাত তো পুরোপুরিই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। সরকারের নিয়ন্ত্রণে এখন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো কিছু সেবা খাত আছে বলেই এ খাতে এখনো কিছু কর্মসংস্থান দেখা যাচ্ছে। সরকারি কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে অবকাঠামো ও শিল্পে সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে।

  • কার্টসিঃ বনিকবার্তা/নভেম্বর ১৭,২০১৮ 

No comments:

Post a Comment