Search

Thursday, November 29, 2018

গুম, খুন ও গ্রেফতার আতঙ্ক নিয়ে ভোটের মাঠে বিএনপি

মঈন উদ্দিন খান

গ্রেফতার-মামলা-হামলার আতঙ্ক নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমেছে বিএনপি। গতকাল বুধবার সারা দেশে দলের প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। বেশ কিছু আসনে সশরীরে হাজির হয়ে প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিতে পারেননি। কিছু কিছু জায়গায় হামলার ঘটনাও ঘটেছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা জানিয়েছেন, কোনো ধরনের ঝামেলায় না জড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। মনোনয়ন শান্তিপূর্ণভাবে দাখিল করা হয়েছে। তারপরেও বেশ কয়েকটি স্থানে তাদের প্রার্থীরা হামলার মুখে পড়েছেন।

জানা গেছে, সব আসনেই বিএনপি একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন চিঠি দিয়েছে। এ জন্য একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে অর্থাৎ প্রতীক বরাদ্দের চিঠি কে পাবেন, তা নিয়ে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম-স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ফের বৈঠকে বসবেন কয়েক দিনের মধ্যে। 

মনোনয়নের চিঠি পেয়ে দেশের প্রধান দুই দলের প্রার্থীরা এলাকায় গেছেন। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার আগে পরে ভোটারদের সাথে কুশলবিনিময় করছেন। নিজ বাড়িতে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বৈঠক করছেন। নির্বাচনী ছক আঁকছেন। 

মনোনয়ন দাখিল করে বিএনপি অভিযোগ করেছে, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। কয়েকটি জায়গায় সরকারি দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে দলটি। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের ঢাকা-৯ আসনে মনোনয়ন ফরম জমা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। 

৩০০ আসনে প্রায় ৮০০ প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। মনোনীত প্রার্থী তালিকা বিশাল হওয়া প্রসঙ্গে দলের সিনিয়র এক নেতা জানান, গত ১২ বছরে বিএনপি নেতাদের প্রায় প্রত্যেকের নামে একাধিক মামলা হয়েছে। মামলায় অনেকের সাজাও হয়েছে। কেউ কেউ এখনো কারাগারে রয়েছেন। আবার নির্বাচন সামনে রেখে সরকার আদালতকে ব্যবহার করছে, অনেক নেতার নামে থাকা মামলাগুলোর শুনানি পিছিয়ে জামিন বাতিল করা হচ্ছে। ফলে নির্বাচনের আগে কোনো প্রার্থীর সাজা হলে বা কেউ কারাগার থেকে মুক্ত না হতে পারলে, সেখানে বিকল্প প্রার্থীকে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন দেয়া হবে। এ ছাড়া কারও প্রার্থিতা ঋণখেলাপির কারণে বাদ পড়ে যেতে পারে। এসব বিবেচনায় নিয়ে এক আসনে একাধিক প্রার্থীকে প্রাথমিকভাবে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। 

নেতারা আরো বলেছেন, প্রার্থী তালিকা বড় হওয়ার আরেকটি কারণ মন রক্ষা করা। এক যুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির অসংখ্য নেতা আছেন যারা এই সময়ে দলের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন, কিন্তু সংসদ সদস্য হওয়ার মতো যোগ্য হয়ে উঠতে পারেননি। আবার অনেকে দলীয় কাজে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না থাকলেও এমপি হওয়ার মতো যোগ্য। তাই মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে প্রত্যাশী বহু নেতাকে দলীয় মনোনয়নের চিঠি দিয়ে খুশি রাখা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে সবচেয়ে যোগ্য নেতাই পাবেন ধানের শীষ প্রতীক। 

গতকাল বেশ কয়েকটি স্থানে বিএনপির প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন। শরীয়তপুর-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এপিএস মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর ওপর গোসাইরহাট উপজেলা আওয়ামী লীগের নামধারী সন্ত্রাসীরা হামলা করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। হামলায় বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে। এ বিষয়ে মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু বলেন, গোসাইরহাট উপজেলা থেকে ভেদরগঞ্জ উপজেলায় মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাওয়ার সময় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাজাহান সিকদারের নেতৃত্বে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করে ১৫টি মোটরসাইকেল ছিনতাই করা হয়। 

কিশোরগঞ্জ-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী শরিফুল আলম বলেন, প্রতিনিধির মাধ্যমে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি জানান, এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীরা গ্রেফতার আতঙ্কে রয়েছেন। নির্বাচন কমিশনে আমি লিখিতভাবে এলাকার ভীতিকর পরিস্থিতির কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না। 

সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন জমা দিতে গিয়ে হামলার মুখে পড়েছেন বিএনপির প্রার্থী রাকিবুল করিম খান পাপ্পু। বেলকুচি উপজেলার সামনে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতারা এই হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছেন পাপ্পুর সাথে থাকা ছাত্রদল নেতা আরিফ সরকার। পাপ্পু বলেন, আমরা এক ধরনের আতঙ্ক নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমেছি। যদি সুষ্ঠু ভোট হয় তাহলে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত। 

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন মাহমুদুর রহমান সুমন। তিনি বলেন, এলাকায় ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার উঠেছে, যা ক্ষমতাসীনরা মেনে নিতে পারছে না। আর এ কারণেই মামলা-হামলা দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে তারা। 

নোয়াখালী-২ আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন কাজী মো: মফিজুর রহমান। তিনি বলেন, দল চূড়ান্ত মনোনয়ন দিলে তিনি বিজয়ী হবেন। তবে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। মামলা-গ্রেফতার তো আছেই। 

রিজভীর অভিযোগ 

এদিকে গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেছেন ঢাকা-৭ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী মোশাররফ হোসেন খোকন মনোনয়নপত্র দাখিল করে বাসার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর থেকে তার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই তাকে গ্রেফতার করেছে। গত দুই দিন ধরে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের শাহজাহানপুরের বাসা সার্বক্ষণিক ঘিরে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত কয়েকদিন ধরে মির্জা আব্বাসের বাসায় প্রবেশ ও বেরুনোর সময় দুই দিনে ১৯ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, শরীয়তপুর-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু নেতাকর্মীদের নিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিলের উদ্দেশে ভেদরগঞ্জ উপজেলা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের দিকে রওনা হলে অপুর গাড়িবহরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও বিএনপি নেতাকর্মীদের আহত করা হয়। 

এ ছাড়া মহানগর বিএনপি নেতা হাজী আদিল, নাজিবুল্লাহ, তারেক মাহমুদ, শহীদুল্লাহ, সোহেল, আরিফ ও কামাল, হবিসহ আরো অনেককে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

  • কার্টসিঃ নয়াদিগন্ত/ নভেম্বর ২৯,২০১৮ 

No comments:

Post a Comment